রমজান শুধু উপবাসের মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাস। একজন মুমিন সারাদিন পানাহার ও কামনা-বাসনা থেকে বিরত থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেন। কিন্তু অনেক সময় অজ্ঞতা বা অসতর্কতার কারণে এমন কিছু কাজ হয়ে যায়, যা রোজা নষ্ট করে দেয়। তাই রোজা ভঙ্গের কারণগুলো জানা প্রত্যেক রোজাদারের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা কুরআনে রোজার মৌলিক নীতিমালা ঘোষণা করেছেন—
فَٱلۡـَٰٔنَ بَٰشِرُوهُنَّ وَٱبۡتَغُواْ مَا كَتَبَ ٱللَّهُ لَكُمۡۚ وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلۡخَيۡطُ ٱلۡأَبۡيَضُ مِنَ ٱلۡخَيۡطِ ٱلۡأَسۡوَدِ مِنَ ٱلۡفَجۡرِۖ ثُمَّ أَتِمُّواْ ٱلصِّيَامَ إِلَى ٱلَّيۡلِۚ
‘আর এখন তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাস করতে পারো এবং আল্লাহ যা কিছু তোমাদের জন্য লিপিবদ্ধ করেছেন বা দান করেছেন তা আহরণ কর। আর ভক্ষণ করো, পান করো যতক্ষণ না রাতের কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। এরপর তোমরা রাত পর্যন্ত রোজাকে পূর্ণ কর।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৭)
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা রোজা ভঙ্গের মৌলিক নীতিমালা উল্লেখ করেছেন। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসে তা পরিপূর্ণভাবে উল্লেখ করেছেন। এখানে রোজা ভঙ্গের কারণগুলো উল্লেখ করা হলো-
১. স্ত্রী সহবাস করা
রোজা অবস্থায় সহবাস করা সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ। এর ফলে—
> কবিরা গুনাহ হয়; তওবা করতে হবে
> রোজা বাতিল
> দিনের অবশিষ্ট সময় পানাহার থেকে বিরত থাকা
> পরবর্তীতে কাজা
> কাফ্ফারা (দুই মাস একটানা রোজা/একজন দাস মুক্ত/৬০ জন মিসকিনকে আহার) হাদিসে এসেছে—
إِنَّ رَجُلًا وَقَعَ بِامْرَأَتِهِ فِي رَمَضَانَ فَاسْتَفْتَى النَّبِيَّ ﷺ فَقَالَ: هَلْ تَجِدُ رَقَبَةً؟ قَالَ: لَا، قَالَ: هَلْ تَسْتَطِيعُ صِيَامَ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ؟ قَالَ: لَا، قَالَ: فَأَطْعِمْ سِتِّينَ مِسْكِينًا
‘এক লোক রমজানে তার স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ ব্যাপারে ফতওয়া জানতে চাইল? তখন তিনি বললেন: তুমি কি কৃতদাস আজাদ করতে পারবে। সে উত্তরে বললো জ্বি-না। তখন তিনি বললেন, তুমি কি একাধারে দুমাস রোজা রাখতে পারবে। (একাধারে নিরবচ্ছিন্নভাবে সাওম রাখা অন্য রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে) সে বলল: জ্বি-না। তখন আল্লাহর রাসুল বললেন, তাহলে তুমি ৬০ জন মিসকিনকে খাওয়াও।’ (বুখারি ১৯৩৬; মুসলিম ১১১১)
২️. ইচ্ছাকৃত বীর্যপাত ঘটানো
চুম্বন, স্পর্শ বা হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বীর্যপাত হলে রোজা ভেঙে যাবে। হাদিসে কুদসীতে এসেছে—
يَدَعُ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ وَشَهْوَتَهُ مِنْ أَجْلِي
‘(আল্লাহ তাআলা বলেন) রোজা পালনকারী আমার কারণে তার পানাহার ও কামভাব থেকে বিরত থাকে।’ (বুখারি ১৮৯৪)
তবে বীর্যপাত না হলে রোজা ভাঙবে না। আয়েশা (রা.) বলেন—
كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يُقَبِّلُ وَهُوَ صَائِمٌ وَيُبَاشِرُ وَهُوَ صَائِمٌ، وَلَكِنَّهُ كَانَ أَمْلَكَكُمْ لِإِرْبِهِ
‘নবীজি (সা.) রোজা অবস্থায় স্ত্রী চুম্বন করতেন এবং রোজা অবস্থায় তিনি স্ত্রীদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন। কিন্তু তিনি তার কামভাব তোমাদের চেয়ে অধিক নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ছিলেন।’ (বুখারি ১৮৯৪, মুসলিম ১১৫১)
অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত ওমর ইবন আবু সালমা রাসুলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন-
أَيُقَبِّلُ الصَّائِمُ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَلْ هَذِهِ لِأُمِّ سَلَمَةَ فَأَخْبَرَتْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصْنَعُ ذَلِكَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَدْ غَفَرَ اللَّهُ لَكَ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَتْقَاكُمْ لِلَّهِ وَأَخْشَاكُمْ لَهُ
রোজা পালনকারী কি চুম্বন করতে পারবে? তখন আল্লাহর নবী বললেন, একে জিজ্ঞাসা কর অর্থাৎ উম্মে সালমাকে (যিনি রাসুলুল্লাহর সা. স্ত্রী ছিলেন) এরপর উম্মে সালমা বলে দিলেন, আল্লাহর রাসুল এমনটি করতেন। তখন তিনি আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহ কি আপনার পূর্বাপর সব গুনাহ ক্ষমা করে দেননি? নবীজি (সা.) বললেন, শুনে রাখ! আল্লাহর কসম করে বলছি, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের চেয়ে অধিক তাকওয়ার অধিকারী এবং আমি আল্লাহকে অধিক ভয় করি।’ (বুখারি ১৯২৭, মুসলিম ১১০৬)
৩. পানাহার করা
খাদ্য বা পানীয় ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রহণ করলে রোজা ভেঙে যায়। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلۡخَيۡطُ ٱلۡأَبۡيَضُ مِنَ ٱلۡخَيۡطِ ٱلۡأَسۡوَدِ مِنَ ٱلۡفَجۡرِۖ ثُمَّ أَتِمُّواْ ٱلصِّيَامَ إِلَى ٱلَّيۡلِۚ
‘তোমরা পানাহার কর, যতক্ষণ না রাতের কালো রেখা থেকে ভোরের সাদা রেখা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়। এরপর রোজাকে রাত পর্যন্ত পূর্ণ কর।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৭)
নাকে পানি প্রবেশ করানো সম্পর্কেও হাদিস—
وَبَالِغْ فِي الِاسْتِنْشَاقِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ صَائِمًا
‘তুমি অজুর সময় নাকে ভালোভাবে পানি পৌঁছিয়ে দাও অবশ্য রোজা পালনকারী হলে এমন করবে না।’ (মুসনাদে আহমাদ ৪/৩২, ৩৩, ২১১; আবু দাউদ ২৩৬৬; তিরমিজি ৭৮৮; নাসাঈ ১/৮৭)
৪. খাদ্যের বিকল্প বস্তু গ্রহণ
এটা দুই ধরনের হয়ে থাকে—
> রোজা অবস্থায় রক্তপাত কিংবা অন্য কোনো কারণে রক্তে প্রয়োজন হলে যদি রক্ত দেওয়া হয়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। কেননা পানাহারের পুষ্টির চূড়ান্ত পর্যায় হলো রক্ত। রক্ত গ্রহণের মাধ্যমে সে-ই পুষ্টি অর্জিত হয়।
> যেসব ইনজেকশন খাদ্য ও পানীয়ের বিকল্প, তা প্রয়োগ করা হলেও রোজা ভেঙ্গে যাবে। যদিও তা বাস্তবে খাদ্য ও পানীয় নয়, কিন্তু খাদ্য-পানীয়ের বিকল্প। সুতরাং তা খাদ্য ও পানীয়ের বিধান রাখবে।
আর যে ইনজেকশন খাদ্যের পরিপূরক নয়; তা দ্বারা রোজা ভঙ্গ হবে না। যদিও ইনজেকশন মাংসপেশী কিংবা রগে নেওয়া হয়। এমনকি কণ্ঠনালীতেও যদি এর প্রভাব যায় তাহলেও রোজা ভঙ্গ হবে না। কেননা তা খাদ্যও নয় পানীয়ও নয়; তাছাড়া তা খাদ্য বা পানীয়ের অর্থেও পড়ে না। সুতরাং এর দ্বারা খাদ্য বা পানীয়ের বিধান প্রযোজ্য হবে না।
৫. সিঙ্গার মাধ্যমে রক্ত বের করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
أَفْطَرَ الحَاجِمُ وَالمَحْجُومُ
‘সিঙ্গা যে লাগায় ও যে সিঙ্গা গ্রহণ করে— উভয়ের রোজা ভঙ্গ হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ ৫/২৭৭, ২৮০, ২৮২, ২৮৩; আবু দাউদ ২৩৬৭; ইবন খুযাইমাহ ১৯৬২, ১৯৬৩; মুস্তাদরাকে হা