শিরোনাম
◈ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের কারণে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি, যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে ইসরায়েল: সিআইএ ◈ বিশ্বের সেরা ৫০০ শহরের তালিকা থেকে বাদ ঢাকা, পিছিয়েছে বাংলাদেশের সব বড় শহর! ◈ সেন্টমার্টিনে বিনামূল্যে খতনা করিয়ে অর্ধশতাধিক শিশুর ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণ ◈ সোলার প্যানেল নাকি মিনি উইন্ড টারবাইন, বাড়ির জন্য কোনটি বেশি লাভজনক? ◈ বৃহস্পতিবার মিরপুর-আগারগাঁওসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ১০ ঘণ্টা গ্যাস বন্ধ থাকবে ◈ মে‌সি ম‌্যা‌জিক, গোল কর‌লেন করা‌লেন, জয়ের মঞ্চে মহাতারকার মহাবিদায়  ◈ টাকার বিনিময়ে কলরেকর্ড, লোকেশন ও এনআইডি তথ্য বিক্রি: ৪ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার ◈ চট্টগ্রাম বন্দরে এবার ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ ঘোষণায় আস্ত BMW ও ৫ খণ্ডিত ইসুজু ট্রাকের সন্ধান! ◈ উয়েফা নেশন্স লিগে  স্পেন ও ইংল্যান্ডের জয় ◈ দুর্গাপূজায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ১৬ দিনের ছুটি, শুরু কবে জেনে নিন বিস্তারিত

প্রকাশিত : ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২৬ দুপুর
আপডেট : ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৪২ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

টাকার বিনিময়ে কলরেকর্ড, লোকেশন ও এনআইডি তথ্য বিক্রি: ৪ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার

টাকা দিলেই এই বাজার থেকে পাওয়া যাচ্ছে যে কোনো মানুষের মুঠোফোনের অবস্থান, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), ক্ষুদেবার্তা (এসএমএস), মুঠোফোনের লেনদেনের আর্থিক বিবরণী, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্টের তথ্য। মুঠোফোনের (মোবাইল ফোন) গোপন তথ্য কেনাবেচাকে ঘিরে অনলাইনে একটি বাজার গড়ে উঠেছে। একাধিক অসাধুচক্র ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে, ওয়েবসাইট খুলে এবং টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এসব তথ্য বিক্রি করে আসছে। সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়

এ ধরনের তথ্য ফাঁস ও টাকার বিনিময়ে বিক্রির সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ৪ পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর রমনা থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। ওই ৪ পুলিশের সঙ্গে আরও কারা কারা জড়িত তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে মাঠে নেমেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগ।

সপ্তাহখানেক আগে ৪ পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করলেও বিষয়টি গতকাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া ৪ পুলিশ সদস্য হলেন— ডেমরা থানার পুলিশ কনস্টেবল (কং/৬৭৪০) সাইমন হোসেন রাশেদ, একই থানার পুলিশ কনস্টেবল (কং/২৭৯৩২) মাসুম মিয়া, ওয়ারী থানার পুলিশ কনস্টেবল (কং/২৬৪৯৭) নিজাম উদ্দীন এবং তুরাগ থানার পুলিশ কনস্টেবল (কং/৩৪১৮) মো. জিহাদ মিয়া। গত ২৯ সেপ্টেম্বর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই আবিদুর রহমান বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধি আইনে মামলা করেন। মামলায় তাদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও প্রতারণার মাধ্যমে বেআইনিভাবে মুঠোফোনের সিডিআর সংগ্রহ করে সামাজিক মাধ্যমে বিক্রি করে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর এবং বেআইনিভাবে নাগরিকের সিম/মোবাইল নাম্বারের কললিস্ট, লাস্ট কল লোকেশন, এনআইডি ইত্যাদি তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে সামাজিক মাধ্যমে হস্তান্তর ও ছড়িয়ে দেওয়ার অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রমনা থানায় মামলা দায়েরের পর ওই ৪ পুলিশ সদস্যকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের পর আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাদের কারাগারে প্রেরণ করেন। মামলার বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগে যোগাযোগ করা হলে তারা এ ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

Advertisement

মামলার বিষয়ে রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইয়াছিন মিয়া জানান, কয়েকদিন আগে ডিবির সাইবার ক্রাইম বিভাগ থেকে একটি মামলা করা হয়েছে। মামলাটি ডিবির সংশ্লিষ্ট বিভাগ তদন্ত করছে।

মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ডিবির সাইবার মনিটরিংয়ের সময় গত ১০ সেপ্টেম্বর ফেসবুকের একটি অ্যাকাউন্ট, একটি হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট এবং একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে বিভিন্ন মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর বিক্রির বিষয়টি নজরে আসে। পরে অনুসন্ধানে একটি বিকাশ নম্বরে সিডিআর বিক্রির টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে ডিবিকে জানানো হয়, ডিবির এলআইসি থেকে সরকারি একটি মুঠোফোন নম্বরের মাধ্যমে তিনটি নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করে পরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর বিষয়টি অনুসন্ধানে নামে গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগ।

মামলার এজাহারের তথ্য বলছে, তুরাগ থানার সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ১১টি মুঠোফোন নম্বরের তিন মাসের সিডিআর ও এনআইডির তথ্য চাওয়া হয়েছিল। আবেদনে তুরাগ থানার একটি জিডি নম্বর এবং একজন এএসআইর নাম ব্যবহার করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই নম্বরের জিডি থানায় নথিভুক্তই হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট এএসআইও এমন কোনো সিডিআর চাননি। এজাহার অনুযায়ী, তুরাগ থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত কনস্টেবল জিহাদ মিয়া থানার ওসির সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ভুয়া জিডির তথ্য দিয়ে সিডিআর সংগ্রহ করেন এবং পরে তা বিভিন্ন ব্যক্তি ও সামাজিক মাধ্যমে পাঠান বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। একইভাবে ডেমরা থানার ওসির সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে চারটি মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর চাওয়া হয়। আবেদনে ডেমরা থানার একটি মামলার নম্বর ও এক এসআইর নাম ব্যবহার করা হলেও অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই মামলা থানায় রুজুই হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট এসআইও ওই নম্বরগুলোর সিডিআর চাননি। এই সিডিআর সংগ্রহের সঙ্গে কনস্টেবল সাইমন হোসেন রাশেদ ও মাসুম মিয়ার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এজাহারে আরও বলা হয়, কনস্টেবল নিজাম উদ্দীন ডেমরা থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত থাকার সময় সিডিআর সংগ্রহ করে সামাজিক মাধ্যমে বিক্রি করতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পরে ওয়ারী থানায় বদলি হওয়ার পরও থানার ওসির ই-মেইল ব্যবহার করে বিভিন্ন নম্বরের সিডিআর সংগ্রহের তথ্য পাওয়া যায়। তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ ও মুঠোফোন পর্যালোচনায় বিভিন্ন নম্বরের সিডিআর আদান-প্রদান এবং টাকা গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

৪ পুলিশ সদস্যের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে থাকা হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে এমন তথ্য পাওয়া গেছে যে, তারা বিভিন্ন সময়ে থানার ওসিদের সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ভুয়া মামলা বা জিডির নম্বর দেখিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের এলআইসি থেকে সিডিআর সংগ্রহ করতেন। পরে এসব তথ্য সামাজিক মাধ্যমে বিক্রি করে অর্থ নিতেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় সরকারি ই-মেইল ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিলেন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্তের প্রয়োজনে মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে নাগরিকের মুঠোফোন ব্যবহারের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। হত্যা, অপহরণ, ছিনতাইসহ বিভিন্ন মামলার তদন্তে সন্দেহভাজন ব্যক্তির সিডিআর বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়। এজন্য থানার কর্মকর্তারা অনেক সময় মোবাইল অপারেটরের কাছে তথ্য চেয়ে সরকারি ই-মেইল বা চিঠি পাঠান। এসব কাজের একটি অংশ অধস্তন সদস্যরা সম্পন্ন করেন। ফলে সরকারি ই-মেইল ও তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের সুযোগ থাকলে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, একজন ব্যক্তি মুঠোফোনে কাকে কল করেন, কে তাকে ফোন করেন, কী কী খুদে বার্তা বিনিময় হয়— এসব তথ্য সংরক্ষণ করে মোবাইল অপারেটরগুলো। মোবাইল অপারেটরদের তথ্যভান্ডারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাসহ ১২টি সংস্থার প্রবেশাধিকার রয়েছে। এ কারণে একটি সংস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বা অসাধু সদস্যের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য পরে বৃহত্তর একটি চক্রের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল র‌্যাব-২। তখন র‌্যাব জানিয়েছিল, ওই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারও যোগসাজশের তথ্য তারা পায়নি। এবার ৪ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় সরকারি ব্যবস্থায় সংরক্ষিত নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, নাগরিকের কললিস্ট, অবস্থান, এনআইডি বা আর্থিক লেনদেনের তথ্য শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয় নয়; এসব তথ্য অপরাধী চক্রের হাতে গেলে প্রতারণা, হয়রানি, চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেলিং এমনকি গুরুতর অপরাধেও ব্যবহার হতে পারে। তাই তথ্য সংগ্রহের প্রতিটি ধাপে কে আবেদন করছেন, কোন মামলা বা জিডির ভিত্তিতে তথ্য চাওয়া হচ্ছে, কে তথ্য গ্রহণ করছেন এবং পরে সেই তথ্য কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে— এসব বিষয়ে শক্তিশালী অডিট ট্রেইল ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (টিজিআই) গত আগস্ট মাসের এক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৩৬টি সরকারি ও ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যভাণ্ডারের তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালেও ৫ কোটি মানুষের এনআইডির তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছিল।

  • সর্বশেষ