শিরোনাম
◈ ইউরোপের স্বপ্নে দালালের ফাঁদ, ঋণ-প্রতারণায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশিরা ◈ ফের লঘুচাপের আভাস, দেশজুড়ে বাড়তে পারে বৃষ্টি ◈ প্রবৃদ্ধি নামতে পারে ৩.৪ শতাংশে, বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি : বিশ্বব্যাংক ◈ ভিসা-অন-এরাইভালসহ ইন্দোনেশিয়াকে বাংলাদেশের ৫ প্রস্তাব ◈ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার পথ কতটা খোলা? ◈ প্রিজন ভ্যান থেকে পিচ্চি রাজার পালানোর সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেলো ◈ সৌদি-হুতি সংঘাতে পাকিস্তান-তুরস্কের সেনা, কতটা জড়াবে ইয়েমেন যুদ্ধে আর কতদিন থাকতে পারবে পাকিস্তান? ◈ বিশ্বজুড়ে কোথায় কোথায় মার্কিন বোমারু বিমান মোতায়েন থাকে? যা জানাগেল ◈ তিন বছর পর ফের বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত, দিল্লি যাচ্ছেন ১০ কর্মকর্তা: বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে নতুন উদ্যোগ ◈ বাংলাদেশে গাড়ি কারখানা করবে টয়োটা, ২০২৭ সালে শুরু হবে নির্মাণকাজ

প্রকাশিত : ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:১৭ সকাল
আপডেট : ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:১৬ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ইউরোপের স্বপ্নে দালালের ফাঁদ, ঋণ-প্রতারণায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশিরা

ইউরোপে গেলেই জীবন বদলে যাবে। ভালো চাকরি, মোটা বেতন, বৈধ কাগজপত্র, নিজের বাসা, পরে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে নতুন জীবন। বাংলাদেশে বসে এমন রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণ-তরুণী ও পরিবারকে ইউরোপমুখী করছে দালালচক্র। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ অনেকের জন্য পরিণত হচ্ছে ঋণ, প্রতারণা, ভুয়া ভিসা, মানবপাচার, বন্দিত্ব এবং অনিশ্চিত জীবনে। অনুসন্ধানে কথা হয়েছে ইউরোপে অবস্থানরত কয়েকটি বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে। নিরাপত্তার কারণে তাঁদের প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিবেদনে ব্যবহৃত নামগুলো ছদ্মনাম।

সিলেটের একটি দম্পতির ছদ্মনাম সামিয়া আশরাফ ও তাঁর স্বামী। তাঁদের ভাষ্য, ছাত্র ভিসায় প্রথমে যুক্তরাজ্যে যান তাঁরা। সেখানে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ফ্রান্সে আসেন। রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেও সফল হননি। এরপর পর্তুগাল ও স্পেনে বৈধতা পাওয়ার আশায় যান। বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে কাগজপত্র করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, পাসপোর্টে নামের বানানসহ বিভিন্ন নথির জটিলতায় বারবার ব্যর্থ হন। এতে কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান তাঁরা।

মৌলভীবাজারের আরেক দম্পতি, ছদ্মনাম সিনথিয়া ইসলাম ও রোমানা আহমেদ। তাঁদের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। এক দেশ থেকে আরেক দেশে বৈধতার আশায় ঘুরেছেন। প্রতিবারই নতুন কাগজ, নতুন নিয়ম এবং নতুন খরচ। দেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকেও একাধিকবার টাকা নিতে হয়েছে। একসময় সঞ্চয় শেষ হয়ে ঋণের চাপ বাড়ে।

সুনামগঞ্জের ইদ্রিস মিয়া ও শান্তা ইসলাম নামের আরেক দম্পতি জানান, ইউরোপে এসে সবচেয়ে বড় সংকট নিয়মিত কাজ পাওয়া। একদিন কাজ আছে, পরের দিন নেই। কিন্তু বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াতের খরচ প্রতিমাসেই দিতে হয়। দেশে থাকা পরিবার মনে করে ইউরোপে থাকলেই ভালো থাকা যায়। অথচ বাস্তবে নিজেদের খরচ চালানোই অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

Advertisement

ইউরোপের বিভিন্ন বাংলাদেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গ্রুপে নিয়মিত কাজ ও বাসার সন্ধানে পোস্ট দিতে দেখা যায়। কেউ রেস্টুরেন্টে কাজ চান, কেউ পরিচ্ছন্নতার কাজ, কেউ নির্মাণকাজ, কেউ খাবার সরবরাহের কাজ। কাগজপত্র না থাকায় অনেকে কম পারিশ্রমিকে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

কেউ রেস্টুরেন্টের রান্নাঘরে বাসন ধুচ্ছেন, কেউ নির্মাণকাজে ভারী শ্রম দিচ্ছেন, কেউ প্রচণ্ড ঠান্ডায় খাবার সরবরাহ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, বৈধ শ্রমিক যে কাজের জন্য তুলনামূলক বেশি পারিশ্রমিক পান, কাগজপত্রহীন শ্রমিক একই কাজ করেও অনেক কম টাকা পান। কাজ হারানোর ভয়ে অনেকেই প্রতিবাদ করতে পারেন না।

বাসস্থানও বড় সমস্যা। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় নিজের নামে নিয়মিত বাসা ভাড়া নেওয়া কঠিন। ফলে অনেকে অন্যের বাসায় সাবলেট হিসেবে থাকেন। ছোট ঘরে একাধিক মানুষের বসবাস, ভাগাভাগি করে রান্নাঘর ও বাথরুম ব্যবহার এবং পানি-বিদ্যুৎ ব্যবহারে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই দিন কাটে।

নারীদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি কম নয়। কাজের সুযোগ না পাওয়া, আর্থিক অনিশ্চয়তা, বাসস্থানের সমস্যা এবং অপরিচিত পরিবেশে একা হয়ে পড়ায় অনেকে মানসিক চাপে থাকেন বলে সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।

তবে ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই অনেকের বিপদ শুরু হয়।

লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনা একাধিকবার সামনে এসেছে। ২০২৫ সালে দুই বাংলাদেশিকে লিবিয়ায় ৪২ দিন আটকে রেখে নির্যাতন এবং পরিবারের কাছে মুক্তিপণ চাওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশে অভিযান চালায় পুলিশ। ২০২৬ সালেও লিবিয়া থেকে বাংলাদেশিদের নির্যাতন ও মুক্তিপণের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। আবার ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে ভুয়া শেনজেন ভিসা দিয়ে টাকা নেওয়ার ঘটনাও ধরা পড়েছে। একটি ঘটনায় ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

ইউরোপে যাওয়ার নামে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করার ঘটনাও রয়েছে। অথচ বৈধ পথে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও অতিরিক্ত অর্থ, দ্রুত ভিসার প্রতিশ্রুতি এবং ইউরোপে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে দালালরা অনেক পরিবারকে প্রলুব্ধ করে।

প্রশ্ন হলো, এত ঝুঁকি জেনেও কেন তরুণরা বিদেশমুখী?

এর পেছনে বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাঁদের জন্য চাকরি তৈরি হয়েছে ৮৭ লাখ। ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণ কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এই বাস্তবতায় বিদেশে তুলনামূলক বেশি আয়ের আকর্ষণ তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দেয়। দালালরা সেই আকাঙ্ক্ষাকেই কাজে লাগায়। ইউরোপে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলেই বৈধতা পাওয়া যায়, এমন ধারণাও ভুল। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন করেছেন। কিন্তু আবেদন সফল হওয়ার হার দেশভেদে খুবই সীমিত।

তাই ইউরোপের স্বপ্ন বন্ধ করার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ সরকারের সামনে এখন কয়েকটি বড় দায়িত্ব। বিদেশ যাওয়ার আগে নাগরিকদের প্রকৃত অভিবাসন ব্যয়, বৈধ নিয়োগকারী, ভিসার ধরন ও সংশ্লিষ্ট দেশের আইন সম্পর্কে সহজ ভাষায় তথ্য দিতে হবে। স্থানীয় উপ-এজেন্টদের কার্যক্রম কঠোরভাবে নজরদারিতে আনতে হবে। ভুয়া ভিসা ও মানবপাচার চক্রকে শুধু বিচ্ছিন্নভাবে নয়, পুরো নেটওয়ার্ক হিসেবে তদন্ত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশে তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করা।
ইউরোপের স্বপ্ন দেখা অপরাধ নয়। বিদেশে ভালো জীবন চাওয়াও অপরাধ নয়। কিন্তু সেই স্বপ্নের বিনিময়ে যদি একটি পরিবার জমি বিক্রি করে, ঋণে ডুবে যায়, কোনো তরুণ লিবিয়ায় বন্দি হয় কিংবা ইউরোপে পৌঁছে কাগজপত্রহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করে, তাহলে সেই স্বপ্নের পেছনের ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতেই হবে।

কারণ প্রশ্নটি শুধু দালাল কে, তা নয়।

প্রশ্ন হলো, কেন একজন বাংলাদেশি তরুণকে নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজতে গিয়ে দালালের দরজায় দাঁড়াতে হচ্ছে?

সূত্র: মানবজমিন 

  • সর্বশেষ