শিরোনাম
◈ সৌদি-হুতি সংঘাতে পাকিস্তান-তুরস্কের সেনা, কতটা জড়াবে ইয়েমেন যুদ্ধে আর কতদিন থাকতে পারবে পাকিস্তান? ◈ বিশ্বজুড়ে কোথায় কোথায় মার্কিন বোমারু বিমান মোতায়েন থাকে? যা জানাগেল ◈ তিন বছর পর ফের বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত, দিল্লি যাচ্ছেন ১০ কর্মকর্তা: বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে নতুন উদ্যোগ ◈ বাংলাদেশে গাড়ি কারখানা করবে টয়োটা, ২০২৭ সালে শুরু হবে নির্মাণকাজ ◈ কিউ-ক্যাশে সেবা ব্যাহত: ৩০ ব্যাংকের কার্ড ও ডিজিটাল সেবা দ্রুত চালুর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ◈ ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ৭ ধরনের ক্যানসার বাড়ছে, গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য ◈ মেসির বিদায়ী ম্যাচেও কেলেঙ্কারি, এএফএর বিরুদ্ধে ‘অর্থলোভী’ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ! ◈ বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হবে নাঃখাদ্যমন্ত্রী ◈ এক বছরে নতুন করে দরিদ্র বেড়েছে প্রায় ২১ লাখ বাংলাদেশি, চাকরি হারাচ্ছেন নারীরা ◈ সরকারি কলেজের বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের বদলি-পদায়ন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত, জারি নতুন নির্দেশনা

প্রকাশিত : ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:০৪ রাত
আপডেট : ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:০৬ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বিশ্বজুড়ে কোথায় কোথায় মার্কিন বোমারু বিমান মোতায়েন থাকে? যা জানাগেল

আল-জাজিরা: যুক্তরাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত রয়্যাল এয়ার ফোর্স (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে রবিবার ১২টি বি-১বি বোমারু বিমান উড্ডয়ন করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছে। এর মধ্য দিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া মার্কিন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় ঘাঁটির ভূমিকা আকস্মিকভাবে শেষ হলো।

লন্ডন থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ফেয়ারফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর ইউরোপে ভারী বোমারু বিমান পরিচালনার একমাত্র ঘাঁটি। একই সঙ্গে বিদেশে মোতায়েন করা বোমারু বিমানগুলোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রবর্তী ঘাঁটি।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘাঁটিটিকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে ‘সন্ত্রাসবাদের’ সন্দেহে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে তাদের সবাইকে জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়। একই ঘটনায় সর্বশেষ মঙ্গলবার আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনিও ব্রিটিশ নাগরিক।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার জানান, ফেয়ারফোর্ড থেকে বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার পেছনে ‘কিছু হুমকি’ ছিল এবং তিনি মনে করেন, এসব হুমকির সঙ্গে ইরানের যোগসূত্র থাকতে পারে। হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, সে কারণেই বিমানগুলোকে ‘কিছুটা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তবে খুব বেশি দূরে নয়’।

Advertisement

তবে এর কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কথিত হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে বোমারু বিমান সরানোর সরাসরি যোগসূত্রকে গুরুত্ব দেননি। তিনি বলেন, বোমারু বিমানের এক ঘাঁটি থেকে অন্য ঘাঁটিতে নিয়মিত রোটেশন বা স্থানবদল অস্বাভাবিক নয় এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি আস্থাশীল।

ফেয়ারফোর্ডে কী ঘটেছিল?

২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ পুলিশ ফেয়ারফোর্ডের কাছে বিস্ফোরক স্থাপনের পরিকল্পনার সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেফতার করে। এক দিন পর তাদের জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়।

তদন্তকারীরা তাদের ব্যবহৃত ভ্যানগুলোতে পেট্রল পেলেও কোনও বিস্ফোরক ডিভাইস পাওয়া যায়নি। তবে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত এখনও চলছে।

এরপর বৃহস্পতিবার লন্ডনে ২৫ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ-ইরানি দ্বৈত নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে বিমানঘাঁটিতে হামলার ষড়যন্ত্রের সন্দেহ ছিল। তাকেও ৩ অক্টোবর জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়।

সর্বশেষ মঙ্গলবার ২২ বছর বয়সী আরেক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইঙ্গিত দিয়েছেন, কথিত এই ষড়যন্ত্রে ইরানের ‘ভূমিকা’ থাকতে পারে। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।

ইরান অবশ্য এমন কোনও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গ্রেফতারের প্রতিবাদে তেহরানে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকেও তলব করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কী ধরনের বোমারু বিমান আছে?

বর্তমানে মার্কিন বিমানবাহিনী তিন ধরনের কৌশলগত বোমারু বিমান পরিচালনা করছে। চতুর্থ একটি মডেল- বি-২১ রাইডার-এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।

বি-৫২ স্ট্রাটোফোরট্রেস

মার্কিন বিমানবাহিনীর সবচেয়ে পুরোনো সক্রিয় বোমারু বিমান হলো বি-৫২ স্ট্রাটোফোরট্রেস। বর্তমানে ব্যবহৃত বি-৫২এইচ মডেলটি মূলত ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে নির্মিত।

বিমানটির ডানার বিস্তার প্রায় ৫৬ মিটার। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বোমারু বিমান এবং প্রায় ৩১ টন অস্ত্র বহন করতে পারে। এর অস্ত্রভান্ডারে পারমাণবিক বোমার পাশাপাশি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও থাকতে পারে।

বি-৫২-এর দীর্ঘ পাল্লা এবং বিপুল অস্ত্র বহনের সক্ষমতার কারণে কয়েক দশক ধরে এটি মার্কিন কৌশলগত বিমানশক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বি-১বি ল্যান্সার

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি মার্কিন বিমানবাহিনীতে যুক্ত হওয়া বি-১বি ল্যান্সার তিন ধরনের সক্রিয় বোমারু বিমানের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগামী।

এটি শব্দের গতির ১ দশমিক ২ গুণ পর্যন্ত গতিতে উড়তে পারে। এর ডানা প্রয়োজন অনুযায়ী পেছনের দিকে ভাঁজ হয়ে যায়, যা উচ্চগতিতে উড্ডয়নে সহায়তা করে।

বি-১বি প্রায় ৩৪ টন প্রচলিত অস্ত্র বহন করতে পারে- যা মার্কিন বোমারু বিমানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রচলিত অস্ত্র বহনক্ষমতা। তবে বর্তমানে এটি আর পারমাণবিক অস্ত্র বহন করে না। ফেয়ারফোর্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়া ১২টি বিমানই ছিল বি-১বি।

বি-২ স্পিরিট

বি-২ স্পিরিট হলো স্টেলথ বা রাডারে শনাক্ত করা কঠিন এমন প্রযুক্তিতে তৈরি বোমারু বিমান। এর নকশা অনেকটা উড়ন্ত ডানার মতো, যা শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এ ধরনের মাত্র ২০টি বিমান নির্মিত হয়েছিল। এর মধ্যে বর্তমানে ১৯টি সক্রিয় রয়েছে।

বি-২ প্রচলিত ও পারমাণবিক- দুই ধরনের অস্ত্রই বহন করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কেজি ওজনের বিশাল ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা, যা ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসের জন্য ব্যবহৃত হয়। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন হামলায় এই ধরনের বোমা ব্যবহারের কথা জানানো হয়েছিল।

বি-২১ রাইডার

মার্কিন বিমানবাহিনীর নতুন প্রজন্মের স্টেলথ বোমারু বিমান হলো বি-২১ রাইডার। এটি বি-২-এর তুলনায় ছোট এবং বর্তমানে পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন পর্যায়ে রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে প্রথম বি-২১ দক্ষিণ ডাকোটার এলসওয়ার্থ বিমানঘাঁটিতে মোতায়েন হওয়ার কথা।

আগামী দেড় দশকে মার্কিন বিমানবাহিনী ধীরে ধীরে বি-১বি ও বি-২ বহর সরিয়ে বি-২১ এবং আধুনিকায়িত বি-৫২-এর ওপর নির্ভর করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমানগুলো কোথায় থাকে?

মার্কিন সব বোমারু বিমানের স্থায়ী ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডেই। বর্তমানে পাঁচটি প্রধান ঘাঁটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

•    বি-৫২এইচ: বার্কসডেল বিমানঘাঁটি, লুইজিয়ানা; মিনট বিমানঘাঁটি, নর্থ ডাকোটা
•    বি-১বি: ডাইস বিমানঘাঁটি, টেক্সাস; এলসওয়ার্থ বিমানঘাঁটি, সাউথ ডাকোটা
•    বি-২: হোয়াইটম্যান বিমানঘাঁটি, মিসৌরি
•    বি-২১: ২০২৭ সালে এলসওয়ার্থ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছানোর কথা

এসব ঘাঁটির রানওয়ে দীর্ঘ ও প্রশস্ত। সাধারণত এগুলোর দৈর্ঘ্য ১০ হাজার ফুট বা প্রায় ৩ হাজার ৪৮ মিটারের বেশি। অর্থাৎ বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের মতোই দীর্ঘ এসব রানওয়ে।

তবে বোমারু বিমান কোথায় পরিচালনা করা যাবে, তা শুধু রানওয়ের দৈর্ঘ্যের ওপর নির্ভর করে না। নিরাপত্তা, অস্ত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং বিমান পরিচালনায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে কোথায় মোতায়েন থাকে মার্কিন বোমারু বিমান?

স্থায়ী ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রে হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী মার্কিন বিমানবাহিনী বিশ্বের বিভিন্ন মিত্র দেশের ঘাঁটিতে সাময়িকভাবে বোমারু বিমান মোতায়েন করে। সাধারণত কয়েক সপ্তাহের জন্য এসব বিমান সেখানে অবস্থান করে। এই কর্মসূচিকে যুক্তরাষ্ট্র ‘বোম্বার টাস্ক ফোর্স’ মোতায়েন বলে।

বিদেশে বোমারু বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়ামের অ্যান্ডারসেন বিমানঘাঁটি এবং ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া।

সাম্প্রতিক সময়ে স্পেনের মোরন বিমানঘাঁটিতে বি-৫২, নরওয়ের অরল্যান্ড এবং জাপানের মিসাওয়া ঘাঁটিতে বি-১বি মোতায়েন করা হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে টিন্ডাল বিমানঘাঁটিতেও বি-৫২ মোতায়েন করা হয়েছে; সেগুলো সেপ্টেম্বরে সেখানে পৌঁছায়।

এ ধরনের মোতায়েনের উদ্দেশ্য হলো মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের কাছাকাছি থেকে দ্রুত অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা ধরে রাখা।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি হামলা চালানোও সম্ভব

মার্কিন বোমারু বিমানকে বিদেশি ঘাঁটিতে স্থায়ীভাবে রাখতেই হবে- এমন নয়। আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমানের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকেও দীর্ঘপথের অভিযান পরিচালনা করতে পারে এসব বিমান।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে এমন দীর্ঘপাল্লার অভিযানের নজির দেখা গেছে। এসব অভিযানে বোমারু বিমানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়ে লক্ষ্যবস্তু এলাকায় যেতে এবং আবার ফিরে আসতে ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে।

একটি মিশনে তিনটি বোমারু বিমানের জন্য পথিমধ্যে জ্বালানি সরবরাহ করতে ছয় থেকে নয়টি ট্যাংকার বিমান প্রয়োজন হয়েছে।

ফলে মার্কিন বোমারু বিমানশক্তির মূল বৈশিষ্ট্য শুধু বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ঘাঁটি স্থাপন নয়; বরং দীর্ঘপাল্লার উড্ডয়ন, আকাশে জ্বালানি নেওয়ার সক্ষমতা এবং মিত্রদেশগুলোর ঘাঁটি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বের অনেক দূরের অঞ্চলেও দ্রুত সামরিক শক্তি পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা।

ফেয়ারফোর্ড থেকে বি-১বি বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার পর ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ভারী বোমারু বিমান পরিচালনার স্থায়ী ঘাঁটি না থাকলেও, প্রয়োজন হলে মিত্রদেশগুলোর বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকেই এসব বিমান অভিযান পরিচালনা করতে পারে। ফলে ফেয়ারফোর্ডের ভূমিকা শেষ হওয়া মানেই ওই অঞ্চলে মার্কিন দূরপাল্লার বোমারু সক্ষমতার সমাপ্তি নয়। অনুবাদ: বিডি প্রতিদিন

  • সর্বশেষ