শিরোনাম
◈ প্রিজন ভ্যান থেকে পিচ্চি রাজার পালানোর সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেলো ◈ সৌদি-হুতি সংঘাতে পাকিস্তান-তুরস্কের সেনা, কতটা জড়াবে ইয়েমেন যুদ্ধে আর কতদিন থাকতে পারবে পাকিস্তান? ◈ বিশ্বজুড়ে কোথায় কোথায় মার্কিন বোমারু বিমান মোতায়েন থাকে? যা জানাগেল ◈ তিন বছর পর ফের বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত, দিল্লি যাচ্ছেন ১০ কর্মকর্তা: বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে নতুন উদ্যোগ ◈ বাংলাদেশে গাড়ি কারখানা করবে টয়োটা, ২০২৭ সালে শুরু হবে নির্মাণকাজ ◈ কিউ-ক্যাশে সেবা ব্যাহত: ৩০ ব্যাংকের কার্ড ও ডিজিটাল সেবা দ্রুত চালুর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ◈ ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ৭ ধরনের ক্যানসার বাড়ছে, গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য ◈ মেসির বিদায়ী ম্যাচেও কেলেঙ্কারি, এএফএর বিরুদ্ধে ‘অর্থলোভী’ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ! ◈ বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হবে নাঃখাদ্যমন্ত্রী ◈ এক বছরে নতুন করে দরিদ্র বেড়েছে প্রায় ২১ লাখ বাংলাদেশি, চাকরি হারাচ্ছেন নারীরা

প্রকাশিত : ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:২৫ রাত
আপডেট : ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:৫৯ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সৌদি-হুতি সংঘাতে পাকিস্তান-তুরস্কের সেনা, কতটা জড়াবে ইয়েমেন যুদ্ধে আর কতদিন থাকতে পারবে পাকিস্তান?

আল-জাজিরা: সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে আগস্টে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রথমবারের মতো কার্যকর হলো। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান জোরদারের প্রেক্ষাপটে চুক্তিটির আওতায় পাকিস্তান ও তুরস্কের সেনা সৌদি আরবে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সোমবার রিয়াদে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে জোটের শীর্ষ কমিটি যৌথ প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ঠিক কতসংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হবে এবং তাদের দায়িত্ব কী হবে, তা যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়নি।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, “সম্মিলিত প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন অবিলম্বে শুরু এবং প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি ও সক্ষমতা সরবরাহের সিদ্ধান্ত হয়েছে। অনুমোদিত ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জাতীয় আইন অনুযায়ী এসব বাহিনী ও সক্ষমতা দ্রুত সৌদি আরবে মোতায়েন করা হবে।”

এর কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী ইতোমধ্যে সৌদি আরবকে সহায়তা করছে। তবে তাদের ভূমিকা এখনও মূলত সহায়ক ও প্রতিরক্ষামূলক।

Advertisement

সোমবার রাতে রিয়াদ থেকে জিও নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আসিফ বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের বাহিনী সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তাদের মধ্যে গোয়েন্দা নজরদারি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম রয়েছে। তবে ইয়েমেনে স্থল অভিযান ও এলাকা পুনর্দখলের মূল লড়াই সৌদি বাহিনীই পরিচালনা করছে।

এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- সৌদি নেতৃত্বাধীন আক্রমণাত্মক অভিযানের পাশে থেকে পাকিস্তান কতদিন সরাসরি যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারবে?

সৌদি আরবে আগে থেকেই পাকিস্তানি সেনা

সৌদি আরবে পাকিস্তানি সামরিক উপস্থিতি নতুন নয়। ১৯৬৭ সাল থেকেই পাকিস্তান সৌদি সামরিক সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। ১৯৮২ সালের একটি চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।

১৯৮৫ সালের জুনে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি অবমুক্ত নথিতে বলা হয়েছিল, সে সময় সৌদি সেনাবাহিনীতে ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার পাকিস্তানি নাগরিক কর্মরত ছিলেন। তাদের মধ্যে তাবুকে একটি সাঁজোয়া ব্রিগেডও ছিল।

১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও পাকিস্তান সৌদি আরবে বড় একটি সামরিক দল পাঠিয়েছিল। তাদের দায়িত্ব ছিল মূলত সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা।

এর বাইরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। ওই চুক্তিতে বলা হয়, যেকোনও একটি দেশের ওপর আগ্রাসন উভয় দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হবে।

চলতি বছরের এপ্রিলে সৌদি আরব নিশ্চিত করে, পাকিস্তানি একটি সামরিক দল- যার মধ্যে যুদ্ধবিমান ও সহায়ক বিমানও ছিল- দেশটির পূর্বাঞ্চলের কিং আবদুলআজিজ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে। তবে সৌদি আরবে বর্তমানে ঠিক কতসংখ্যক পাকিস্তানি সেনা রয়েছে, ইসলামাবাদ কখনও তা প্রকাশ করেনি।

সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনসের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী সৌদি সংবাদমাধ্যম আরব নিউজকে বলেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনী ইতোমধ্যে সৌদি আরব ও দেশটির পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তায় মোতায়েন রয়েছে।

তিনি সে সময় ‘শারীরিকভাবে’ উপস্থিত থাকার বিষয়টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, পাকিস্তান প্রয়োজনে ‘যেকোনও পর্যায়ে’ যেতে প্রস্তুত।

রিয়াদের বৈঠকে নতুন করে যে বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে বিষয়ে আইএসপিআর কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রশ্নের জবাব দেয়নি।

মঙ্গলবার পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, সৌদি আরব ও দেশটির পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে পাকিস্তানের অঙ্গীকার ‘আলোচনার ঊর্ধ্বে’।

তবে মন্ত্রণালয় একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছে, সম্মিলিত প্রতিরোধব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রকৃত সামরিক ও পরিচালনাগত বিবরণ গোপনীয় এবং তা নিয়ে গণমাধ্যমে অনুমানভিত্তিক আলোচনা করা উচিত নয়।

তুরস্কের ভূমিকা এখনও অস্পষ্ট

সৌদি আরবে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি তুলনামূলকভাবে অস্পষ্ট। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, তুরস্কের সেনারাও সেখানে রয়েছে। কিন্তু আঙ্কারা এখনও প্রকাশ্যে এমন কোনও মোতায়েনের বিষয় নিশ্চিত করেনি।

ইস্তাম্বুলের ইবনে হালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোকহান এরেলি বলেন, সৌদি আরবে তুরস্কের কোনও প্রকাশ্যে স্বীকৃত স্থায়ী সামরিক মোতায়েন নেই।

তার মতে, তুরস্কের সংবিধানের ৯২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশে সেনা পাঠানোর ক্ষমতা দেশটির পার্লামেন্টের হাতে। কিন্তু মক্কা চুক্তি এখনও তুরস্কের পার্লামেন্টে অনুমোদিত হয়নি। ফলে তুরস্কের সামরিক ভূমিকা কী হবে, সেটি এখনও অনিশ্চিত।

‘সম্মিলিত প্রতিরোধ’ কতটা আক্রমণাত্মক?

উপসাগরীয় আন্তর্জাতিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফের মনে করেন, সৌদি আরব চায় মক্কা চুক্তি যেন শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা হয়ে না থাকে; বরং বাস্তব সামরিক প্রতিরোধক্ষমতায় পরিণত হয়।

তার মতে, আপাতত পাকিস্তান ও তুরস্কের কাছে সৌদি ভূখণ্ড রক্ষা এবং দেশটির আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সহযোগিতা চাইছে রিয়াদ। এর মাধ্যমে হুতিদের কাছে বার্তা দেওয়া হচ্ছে- সৌদি আরবের ওপর হামলা আর শুধু সৌদি-হুতি সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে না।

ইয়েমেনের হুতিরা অতীতে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের তেল রফতানির বিকল্প অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনও রয়েছে। ইরানের ওপর চলমান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে বিধিনিষেধের কারণে এই পাইপলাইনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশটির দুটি বিমানবন্দরে হামলা হয়েছে। এতে অন্তত তিনজন আহত হন।

তবে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের বক্তব্যে ‘সম্মিলিত প্রতিরোধ’ ব্যবস্থার পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, জোটের কাঠামোর মধ্যে ‘সম্মিলিত প্রতিরোধব্যবস্থা সক্রিয়’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে হামলা এবং এর জন্য দায়ী সবাইকে মোকাবিলা করা যায়।

দানিয়া থাফের মতে, ‘এর জন্য দায়ী সবাই’- এই শব্দচয়ন ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে হুতিদের জানানো হচ্ছে, সৌদি আরব শুধু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; হামলা সক্ষম করে এমন ব্যক্তি, নেটওয়ার্ক বা অবকাঠামোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারে। একই সঙ্গে হুতিদের বাইরের সমর্থকদেরও সতর্ক করা হচ্ছে।

পাকিস্তান বলছে, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক

তবে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। ২ অক্টোবর ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, মক্কা চুক্তিটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক। এর কোনও আক্রমণাত্মক লক্ষ্য নেই।

ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিনের ধারণা, পাকিস্তানের অবদান বড় আকারের সেনা পাঠানোর বদলে বিশেষায়িত সামরিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

তার মতে, পাকিস্তান সৌদি আরবে বিদ্যমান সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট, ড্রোন, যুদ্ধক্ষেত্রের যোগাযোগব্যবস্থা, সাইবার সক্ষমতা এবং প্রকৌশলী বাহিনী পাঠাতে পারে। কিছু বিশেষায়িত কমান্ডো বা বিশেষ বাহিনীর সদস্যও থাকতে পারেন। তবে এর চেয়ে বেশি কিছু হওয়ার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।

তুরস্কের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমিত ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন বিশেষজ্ঞ গোকহান এরেলি। তার মতে, বাস্তবসম্মত পরিস্থিতিতে তুরস্কের ভূমিকা মূলত স্থলযুদ্ধের বাইরে থাকবে। এর মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ড্রোনের জরুরি সরবরাহ এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। প্রয়োজনে নৌ বা বিমান প্রতিরক্ষা সম্পদও যুক্ত হতে পারে।

ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কি পাকিস্তান?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন- পাকিস্তানের ভূমিকা কি সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা ইয়েমেনের ভেতরে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে গড়াবে?

দানিয়া থাফের মতে, বর্তমানে পাশাপাশি দুটি সামরিক অভিযান চলছে। প্রথমটি হলো সৌদি আরবকে হুতিদের হামলা থেকে রক্ষা করা। দ্বিতীয়টি হলো ইয়েমেনের ভেতরে সামরিক ভারসাম্য বদলে দেওয়া, যাতে হুতিরা শক্তিশালী অবস্থান থেকে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালাতে না পারে। পাকিস্তান এখনও প্রকাশ্যে জানায়নি, তাদের ভূমিকার সীমা কোথায়।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর রোমে সাংবাদিকেরা খাজা আসিফকে প্রশ্ন করেন, পাকিস্তানি বাহিনী ইয়েমেনে হামলায় অংশ নিয়েছে কি না। তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, তিনি বিস্তারিত জানাতে চান না। তবে সৌদি আরবকে রক্ষার জন্য চুক্তির অধীনে পাকিস্তানের যে সামর্থ্য রয়েছে, তা সৌদি আরবের জন্যও ব্যবহার করা হবে। এ বক্তব্যই পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

২০১৫ সালেও ইয়েমেন নিয়ে একই সংকটে পড়েছিল পাকিস্তান

ইয়েমেন যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে পাকিস্তান এর আগেও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব পাস করে। এতে বলা হয়, ইয়েমেন সংঘাতে পাকিস্তানের নিরপেক্ষ থাকা উচিত, যাতে দেশটি সংকট সমাধানে সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে পারে।

তবে একই প্রস্তাবে সৌদি আরবের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা লঙ্ঘিত হলে কিংবা মক্কা ও মদিনার মতো পবিত্র স্থান হুমকির মুখে পড়লে সৌদি আরবের পাশে থাকার অঙ্গীকারও করা হয়েছিল।

সোমবারের যৌথ বিবৃতিতেও প্রায় একই ধরনের যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। এতে মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলার প্রচেষ্টার নিন্দা জানানো হয়েছে।

ইরানের কড়া নজর

পাকিস্তান ও সৌদি আরবের এই সামরিক সমঝোতার দিকে ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে ইরান। রবিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইয়েমেনে যুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তানি বাহিনী মোতায়েনের খবর সত্য নয়- তেহরান এমনটাই আশা করে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ইয়েমেনে নতুন করে কোনও সামরিক হস্তক্ষেপ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।

অবশ্য পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে তিনি মক্কা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ইসহাক দার বলেন, তিনি ইরানি নেতৃত্বকে জানিয়েছেন যে, পাকিস্তান একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশীদার এবং একজন মুসলিম হিসেবে পাকিস্তানকে সেই অঙ্গীকার পালন করতে হবে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানি নেতারা হুতিদের সঙ্গে সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে সোমবার প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে রাজনৈতিক সমাধানের কোনও পথের কথা উল্লেখ করা হয়নি।

তেহরানের পারস্য উপসাগরীয় স্টাডিজ গ্রুপের বিশ্লেষক জাভাদ হেইরান-নিয়া বলেন, সৌদি ভূখণ্ড ও অবকাঠামো রক্ষার বিষয়টিকে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা থেকে আলাদা করে দেখে ইরান।

তার মতে, পাকিস্তানের মোতায়েন যদি কেবল প্রতিরক্ষামূলক হয় এবং সৌদি স্থাপনা রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তেহরান সেটি মেনে নিতে পারে। কিন্তু পাকিস্তান যদি হুতিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযানে যোগ দেয়, তাহলে সেটিকে ইরান ‘লাল রেখা’ হিসেবে বিবেচনা করবে। কারণ, ইরানের দৃষ্টিতে হুতিরা আরব উপদ্বীপে তার কৌশলগত প্রভাববলয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

যুদ্ধ কতদিন চলবে, সেটিই বড় প্রশ্ন

পাকিস্তান কতদিন সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে থাকতে পারবে, তার বড় অংশ নির্ভর করছে সৌদি আরব ইয়েমেনে ঠিক কী অর্জন করতে চায় তার ওপর।

দানিয়া থাফের মতে, রিয়াদ সম্ভবত একটি স্বল্পমেয়াদি কিন্তু তীব্র সামরিক অভিযান চায়, যার লক্ষ্য হবে হুতিদের ওপর পুনরায় প্রতিরোধক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা- আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ইয়েমেন যুদ্ধ শুরু করা নয়।

কিন্তু ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী এ সপ্তাহে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের দখলে যাওয়া এলাকা পুনরুদ্ধারের মধ্যেই তারা তাদের অভিযান সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। বরং ইরান-সমর্থিত হুতিদের কাছ থেকে রাজধানী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্যও তাদের রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে সানা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। এখানেই পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

দানিয়া থাফের ভাষায়, সৌদি ভূখণ্ড ও বাব আল-মানদেব নিরাপদ করা তুলনামূলকভাবে সীমিত সামরিক অভিযান হতে পারে। কিন্তু হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করা কিংবা সানা পুনর্দখলের চেষ্টা হলে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।

ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের তুঘরাল ইয়ামিনও মনে করেন, পাকিস্তানকে এখনই নিজেদের ‘লাল রেখা’ স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে দেশটির সেনারা হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে।

তার মতে, প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘পাকিস্তান কীভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে’- এমন নয়; বরং ‘কীভাবে পাকিস্তান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাবে’, সেটিই হওয়া উচিত মূল প্রশ্ন।

কারণ সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার একদিকে পাকিস্তানকে মক্কা চুক্তির বাধ্যবাধকতার মধ্যে রাখছে, অন্যদিকে ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নিলে ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতা ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। ফলে সৌদি-হুতি সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, পাকিস্তানের জন্য প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান আর আক্রমণাত্মক অভিযানের মধ্যে সীমারেখা বজায় রাখাও তত কঠিন হয়ে উঠবে। 

  • সর্বশেষ