দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে আবারও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক যোগাযোগ জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক নানা ইস্যুর মধ্যে প্রায় তিন বছর পর বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজিটি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
জেডব্লিউজিটির ১৬তম বৈঠকে অংশ নিতে বুধবার (৭ অক্টোবর) দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন বাংলাদেশের ১০ কর্মকর্তা। আগামী ৮ ও ৯ অক্টোবর দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এফটিএ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তার।
মঙ্গলবার জারি করা সরকারি সফরের অনুমোদনসংক্রান্ত আদেশে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশের কর্মকর্তারা ৭ অক্টোবর বা এর কাছাকাছি সময়ে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হবেন। বৈঠক শেষে ১০ অক্টোবর বা এর কাছাকাছি সময়ে তাদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
প্রতিনিধি দলে আরো আছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউল হক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ, এনবিআর প্রতিনিধি হিসেবে বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ শামীম আলম, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফারহানা ইসলাম, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের যুগ্ম প্রধান মামুন-উর-রশিদ আসকারী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া-১) বাকী বিল্লাহ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মেরিনা সুলতানা ও বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক ফিরোজ আহমেদ।
বৈঠকে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, আমদানি-রপ্তানির বাধা দূর করা এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। জেডব্লিউজিটি সাধারণত বছরে একবার বসে। সর্বশেষ ১৫তম বৈঠক হয়েছিল ২০২৩ সালের ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায়।
এর আগে ১৪তম বৈঠক হয় ২০২২ সালের ২ ও ৩ মার্চ নয়াদিল্লিতে। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে দুই দেশের সম্পর্কে শীতলতা আসে এবং এই নিয়মিত বৈঠক আর হয়নি।
এর মধ্যেই ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা ও বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ করে। তবে সমুদ্রপথে আমদানির সুযোগ খোলা রাখা হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পর ভারত স্থলপথে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক ও পিভিসিসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়।
একই বছরের জুনে পাট ও কিছু বস্ত্রজাত পণ্যেও নিষেধাজ্ঞা আসে। আগের বৈঠকগুলোতে স্থলবন্দর ও ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্টের অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, সীমান্ত হাট চালু, রেলপথে পণ্য পরিবহন, আঞ্চলিক সংযোগ এবং পণ্যের মান সমন্বয় ও পারস্পরিক স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। বাংলাদেশ-ভারত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তির (সিইপিএ) প্রস্তুতি ও যৌথ সমীক্ষা, বাংলাদেশে নিত্যপণ্য সরবরাহ এবং পেট্রাপোল-বেনাপোল চেকপোস্ট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার বিষয়টিও আলোচ্যসূচিতে ছিল।
গত ২৪ আগস্ট বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে বন্ধ সীমান্ত হাট চালু, স্থলবন্দরের পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যক্রম এবং ভারতীয় সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী মুক্তাদিরের সঙ্গে ত্রিবেদীর বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে বলে বিজ্ঞপ্তিতে তখন জানায় মন্ত্রণালয়।
এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমও দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলানোর এ প্রচেষ্টা নিয়ে খবর প্রকাশ করেছে। মঙ্গলবার হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারত বাণিজ্য এবং কনস্যুলার বিষয়ের মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোর বৈঠক আয়োজনের জন্য কাজ করছে। আগামী ৮ ও ৯ অক্টোবর বাণিজ্য বিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে যোগ দিতে বুধবার একটি বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলের দিল্লি সফরের কথা রয়েছে। এ ছাড়া কনস্যুলার বিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের অন্য একটি বৈঠকের তারিখ নির্ধারণে দুই পক্ষ কাজ করছে, যার স্বাগতিক হতে যাচ্ছে ঢাকা।
খবরে আরো বলা হয়, বাণিজ্য বিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকের জন্য মঙ্গলবার বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলটির রওনা হওয়ার কথা ছিল এবং বৈঠকটিও ৭-৮ অক্টোবর নির্ধারিত ছিল। কিন্তু লজিস্টিক সমস্যার কারণে দলটি মঙ্গলবার রওনা হতে পারেনি। ফলে বৈঠকের সময় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, ঢাকা চেয়েছিল বাণিজ্য বিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকের পর দুই দেশের বাণিজ্য সচিবদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হোক। তবে ভারতীয় পক্ষ ঢাকাকে বলেছে, ট্রানজিট ও সীমান্ত বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বৈঠক শেষ হওয়ার পরই কেবল সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে।
কনস্যুলার বিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকটিও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে দুই দেশ। কারণ উভয় পক্ষই ভিসা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি সমস্যার সমাধান করতে চাইছে বলেও খবরে বলা হয়।