প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হাসান হামিদ : চাকরি খোঁজা তরুণদের করোনাকাল, সংকট ও দুর্ভাবনা

হাসান হামিদ : মহামারি আসলেই সামাজিক নিত্য নতুন প্রথা তৈরি করে। বদলে দেয় সবকিছু। লাশের মিছিলে ইমাম যুক্ত হলে, জানাজা পড়ানোর জন্য সাধারণ কেউ ইমাম হন। সব এভাবেই বদলে যায়। ঘরে বসে আছি আড়াই মাস। এই কদিনে অনেক অভ্যাস বদলেছে। কয়েক দিন ধরে অফিস-আদালত-ব্যবসা সব সীমিত আকারে চালু হয়েছে সরকারের স্বাস্থ্যবিধি মেনে। যারা চাকরি বা ব্যবসায় নিয়োজিত, তারা কাজে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু যারা সদ্য স্নাতক, কিংবা হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন কাজের সুযোগ তাদের জন্য ঠিক এই সময়টা কি আরও একটু কঠিন হয়ে গেল? চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা সব সময়ই ছিল। করোনার কারণে সেটি আরও বাড়লো।

গত ২৮ মে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের দেয়া বক্তব্য অনলাইনে পড়ছিলাম। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বক্তব্যে বলেছেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে অগ্রগতির পরেও বর্তমানে সারাবিশ্ব করোনাভাইরাসের কারণে অত্যন্ত সঙ্কটের মধ্যে আছে। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে করোনাভাইরাস মহামারিটি বিশ্বজুড়ে অকল্পনীয় ধ্বংসযজ্ঞ এবং যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। করোনার আঘাতে বিশ্বে ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ প্রায় আসন্ন। ছয় কোটি মানুষ দারিদ্র্যের নিম্নসীমায় চলে যেতে পারে। বিশ্বের অর্ধেক মানুষ কাজ হারিয়ে ফেলতে পারে। এক দশমিক ছয় বিলিয়ন মানুষ জীবিকা হারিয়ে ফেলতে যাচ্ছে। সারাবিশ্বে আট দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। ১৯৩০ সালের পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব। বিশ্বের অন্য দেশের মতো আমাদের দেশেও করোনায় চাকরির সুযোগ কমে যাচ্ছে। নিয়োগদাতারা এখন আর নতুন কর্মীর সন্ধান তেমন একটা করছেন না বলেই মনে হয়। করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চাকরি খোঁজার পোর্টালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন দেখলাম। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক(এডিপি)। প্রতিবেদনে তারা বলছে, গত এপ্রিল মাসে অনলাইন পোর্টালটিতে আগের বছরের এপ্রিলের তুলনায় ৮৭ শতাংশ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কমেছে। এ কাজে বাংলাদেশের বৃহত্তম অনলাইন জব পোর্টাল বিডিজবসের তথ্য উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে।

আসলে শুধু বাংলাদেশে নয়, করোনার প্রভাবে সারা বিশ্বেই বেকার হু হু করে বাড়ছে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। শুধু এপ্রিল মাসে ২ কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছে দেশটিতে। ১৯৩০ সালে বিশ্ব মহামন্দার পর এতটা খারাপ সময় পার করেনি দেশটি। সবমিলিয়ে দেশটিতে বেকার ভাতার আবেদন জানিয়েছে ৩ কোটি ৩৩ লাখের বেশি মানুষ। অথচ মাত্র এক মাস আগেও দেশটির বেকারত্বের হার ছিল মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ; যা গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ঠিক একই অবস্থা ইউরোপের দেশগুলোতেও। কঠিন সময়ে মানুষের চাকরি ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসেবে বর্তমানে বিশ্বের ৩৩০ কোটি কর্মজীবী মানুষের মধ্যে ৮১ শতাংশই ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিশ্বব্যাপী লকডাউনের কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কারখানা পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ থাকায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ হিসেবে বিশ্বের পাঁচ জন কর্মজীবীর চার জনই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। করোনাভাইরাসে বিশ্বের কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা বলছে আইএলও। তারা বলেছে, করোনার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও শ্রম সংকটে বিশ্বে প্রায় আড়াই কোটি বেকার বাড়বে। তাদের করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা ও কোয়ারেন্টিনের কারণে কর্মী সরবরাহ কমছে। আইএলওর মহাপরিচালক গাই রাইডার বলেছেন, করোনাভাইরাস এখন আর শুধু বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট নয়। এটি বড় শ্রম এবং অর্থনৈতিক সংকটও। বিশ্ববাসীর ওপর এর বিশাল প্রভাব পড়বে। আমাদের ভাবতে হবে করোনা পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আরো বেড়ে গেল কিনা। যে যতোই অন্য কথা বলুন, ত্রাণ নিয়ে গেলে হুমড়ি খেয়ে মানুষের তা নিতে আসা দেখলেই পরিস্থিতি আন্দাজ করা যায়। আর করোনা পরিস্থিতি এখন দেশের সব খাতেই প্রভাব ফেলছে। তবে অনানুষ্ঠানিক খাতে এর প্রভাব বেশি, এরই মধ্যে বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আমরা দেখছি, বেকার হয়ে পড়েছেন আমাদের দেশের পরিবহনশ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুর, হোটেল-রেস্তোরাঁকর্মী, ছোটো দোকানদার এরা সবাই। আর নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের অনেকেই রয়েছেন চাকরি হারানোর ভয়ে। ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি ইতিমধ্যেই বেতন ভাতা না দেয়া বা আংশিক দেয়ার মধ্যে চলছে, সামনে হয়তো কর্মী ছাঁটাই শুরু হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের ৫ কোটি ১৭ লাখ শ্রমশক্তি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত রয়েছে। যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ ভাগ। আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত হওয়ায় এই বিপুল পরিমাণ মানুষ রয়েছেন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। বিবিএসের হিসেবে ২০১৯ সাল শেষে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ২০ শতাংশ। সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম এক গবেষণায় বলেছে, যদি পরিস্থিতি এরকম চলতে থাকে সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আয় ২৫ ভাগ কমে গেলে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরো ২০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।
বর্তমান করোনা পরিস্থিতি বদলে দেবে আগামীর চাকরির বাজারের অনেক স্বাভাবিক চিত্র। বাংলাদেশে এমনিতেই চাকরি পাওয়াকে সোনার হরিণ হাতে পাওয়া বলা হয়। আর এখন করোনার কারণে দেশের বেশিরভাগ চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা যেভাবে সংকুচিত হয়েছে, তা কবে নাগাদ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবে, তা কেউ বলতে পারবে না। করোনার এই সময়ে এবং এ অবস্থার পরবর্তী সময়ে চাকরি পাওয়ার লড়াই সহজ হবে না বলা যায়। তাই নিজেকে অন্যের চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য প্রমাণ করতে এবং নিজের দক্ষতা বাড়াতে পরিশ্রম করতে হবে। নিজেকে আগামীর পৃথিবীর জন্য তৈরি করতে হবে। আমাদের মেধাবীরা তৈরি হোক আগামীর পৃথিবীর জন্য, এই গ্রহকে দেবার এবং এর জন্য করার অনেক কিছু এখনও রয়ে গেছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত