প্রবাসী ডেস্ক: দেশে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে প্রায় ৩০ বছর আগে ডিভি লটারির মাধ্যমে স্বপ্নের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন ফরিদপুরের সন্তান হাবিব। শুরুতে ভেবেছিলেন, অল্প কিছুদিন পরই দেশে ফিরে আসবেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিক্রমায় নিউইয়র্কের ব্যস্ত জীবন আর নানা বাস্তবতা তাঁকে আর দেশে ফিরতে দেয়নি।
প্রবাসী টিভির বিশেষ সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হাবিবের তিন দশকের প্রবাসজীবনের সংগ্রাম, ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প এবং যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাপনের নানা বাস্তব অভিজ্ঞতা।
ব্যাংকার থেকে ম্যানহাটনের ডেলিভারি কর্মী
বাংলাদেশে একটি ব্যাংকে চাকরি করার সময় ডিভি লটারি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান হাবিব। তখন তাঁর পরিকল্পনা ছিল কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্রে থেকে আবার দেশে ফিরে আসা।
নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর দেশে ফেরার জন্য ম্যানহাটনের একটি বিমান অফিসে টিকিট কাটতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাৎক্ষণিক টিকিট না পাওয়ায় তাঁর দেশে ফেরা পিছিয়ে যায়।
এরপর পরিবারের সহায়তায় নিউইয়র্কে অবস্থান করতে গিয়ে জীবিকার প্রয়োজনে একটি ফাস্টফুড রেস্তোরাঁয় ডেলিভারি কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২৪ তলা একটি ভবনে প্রথমবার খাবার পৌঁছে দিয়ে বখশিশ হিসেবে পেয়েছিলেন মাত্র ৫ ডলার ৯০ সেন্ট। ব্যাংকের চাকরি থেকে ডেলিভারি কর্মী—জীবনের এই বড় পরিবর্তন তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
পরিশ্রম ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য
নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের চেষ্টা চালিয়ে যান হাবিব। একাধিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পর অবশেষে তিনি সম্মানজনক একটি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পান।
বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক সিটি ট্রানজিট (MTA)-এ কর্মরত। কঠোর পরিশ্রম, সততা ও আত্মমর্যাদাকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘ প্রবাসজীবনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি।
কেন অনেক প্রবাসী আর দেশে ফিরতে পারেন না
সাক্ষাৎকারে প্রবাসজীবনের নানা কঠিন বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন হাবিব। তাঁর মতে, অনেক প্রবাসী কাগজপত্রের জটিলতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা আরও কিছু অর্থ উপার্জনের আশায় দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত বারবার পিছিয়ে দেন।
‘আর তিন মাস পর যাব, ছয় মাস পর যাব’—এভাবে করতে করতে অনেকের জীবনের বছরের পর বছর কেটে যায়। দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম ও মানসিক চাপের কারণে অনেকের স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত জীবনের একেবারে শেষ সময়ে দেশে ফেরার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তবে হাবিবের মতে, প্রবাসে কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি সততা ও আত্মমর্যাদা বজায় রেখে চলতে পারলে বিদেশের জীবনও সুন্দর ও সুশৃঙ্খল হতে পারে।
সাফল্যের পাশাপাশি পারিবারিক মূল্যবোধ
দীর্ঘ ৩০ বছরের প্রবাসজীবনে হাবিব শুধু নিজের ক্যারিয়ারই গড়ে তোলেননি, সন্তানদেরও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। তাঁর ছেলে-মেয়ে দুজনই যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। ছেলে বর্তমানে আইটি খাতে এবং মেয়ে শিক্ষকতা পেশায় কর্মরত।
আধুনিক ও ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রার মধ্যেও পুরো পরিবারকে এক ছাদের নিচে রাখার চেষ্টা করেছেন হাবিব। তাঁর কাছে প্রবাসজীবনের সাফল্যের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন ও মূল্যবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হাবিবের তিন দশকের এই অভিজ্ঞতা যেন প্রবাসজীবনের একটি বাস্তব চিত্র—স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো, কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সময়ের সঙ্গে সেই বিদেশকেই জীবনের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে মেনে নেওয়া।