কালো প্রজাপতির ডানার আলো শোষণ করার বিশেষ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সৌর প্যানেলের সক্ষমতা বাড়ানোর নতুন পথ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
তাদের দাবি, প্রকৃতির এ অনন্য গঠন অনুকরণ করে তৈরি সিলিকন প্যানেল আলো প্রতিফলন কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।
কালো প্রজাপতির ডানার রং দেখে অনেকেই হয়ত ভাবেন, এতে বিশেষ কোনো প্রাকৃতিক রঞ্জক বা পিগমেন্ট রয়েছে। তবে আসল সত্যটি আরও রোমাঞ্চকর।
বিজ্ঞান সাইট সায়েন্সঅ্যালার্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, কালো প্রজাপতির ডানাগুলো অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আঁশ নিয়ে গঠিত। এসব আঁশের পৃষ্ঠভাগে যেসব আলো পড়ে তার প্রায় ৯৯. ৯৪ শতাংশই ডানাগুলো শুষে নেয়।
প্রজাপতির ডানার আঁশের উপরিভাগ কিছুটা ‘স্পঞ্জি’ বা জালের মতো ছিদ্রওয়ালা ও খাঁজকাটা। ফলে আলো প্রতিফলিত করার চেয়ে ডানাগুলো বেশি আলো ভেতরে ঢুকতে দেয়। আলো প্রায় পুরোপুরি শোষিত হয়ে সামান্য অংশ প্রতিফলিত হয় বলেই এগুলোকে আমাদের চোখে এত গাঢ় কালো দেখায়।
কালো ও নীল রঙের সৌর প্যানেলের পার্থক্যের বিষয়টির সঙ্গে প্রজাপতির এই প্রক্রিয়ার মিল রয়েছে। কালো সোলার প্যানেলের প্রতিটি সেল বা কোষ একক সিলিকন ক্রিস্টাল দিয়ে তৈরি, যা প্রায় সব আলো শুষে নেয়।
আলো শোষণের এ বাড়তি সক্ষমতার কারণেই নীল প্যানেলের চেয়ে কালো রঙের বিভিন্ন প্যানেলের কার্যসক্ষমতা বেশি।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট ‘সোলার এনার্জি’তে।
এ গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এক গাণিতিক সিমুলেশন বা অনুকরণ পরিচালনা করেছেন, যেখানে সৌর প্যানেলে ব্যবহৃত ফটোভোলটাইক সেলের আলো শোষণকারী উপাদান সিলিকন স্ল্যাবগুলোকে নয়টি ভিন্ন প্রজাতির কালো প্রজাপতির ডানার কাঠামোর আদলে তৈরি করা হয়েছে।
এর মূল উদ্দেশ্য, প্যানেলের উপরিভাগ থেকে আলো প্রতিফলনের পরিমাণ কমানো ও আলো প্রবেশের মাত্রা বাড়ানো।
গবেষণার ফলাফলে উঠে এসেছে, ডানার মতো গঠন তৈরির পর বিভিন্ন সিলিকন স্ল্যাব থেকে আলো প্রতিফলনের মাত্রা ৩৫ শতাংশেরও বেশি থেকে নেমে এসেছে কেবল ১০ শতাংশে ।
আলো প্রতিফলন কমে যাওয়ায় এসব স্ল্যাব কার্যকরভাবে বেশি আলো শোষণ করতে পেরেছে। ফলে স্ল্যাবগুলোর শর্ট-সার্কিট কারেন্ট উৎপাদনের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
সৌর প্যানেলের সক্ষমতা ১০০ শতাংশে পৌঁছাবে?
সৌর প্যানেল বসানোর আগে সবাই এর কার্যসক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করেন।
প্রজাপতির ডানার গঠন অনুসরণের গবেষণায় যেখানে ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে, সেখানে সঠিক গঠন ও উপাদান ব্যবহার করে একদিন তা ১০০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া যাবে– এমন আশা স্বাভাবিক।
তবে বাস্তব কিছু প্রতিবন্ধকতার কারণে সৌর প্যানেলের সক্ষমতা ১০০ শতাংশ হওয়া প্রায় অসম্ভব।
যেমন, মেঘের ছায়া বা ভুল কোণে আলো পড়ার কারণে প্যানেল পর্যাপ্ত সরাসরি সূর্যালোক নাও পেতে পারে। এ ছাড়া ময়লা, ধূলিকণা, বরফ ও পানির আস্তরণ সূর্যালোক আটকে দেয়, যা ফটোভোলটাইক সেলের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কমায়।
প্যানেলের জন্য অতিরিক্ত উত্তাপও আরেকটি বড় সমস্যা, যেখানে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে তাপমাত্রা প্রতি ডিগ্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিভি সেলের সক্ষমতা শূন্য দশমিক তিন শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
তবে পারিপার্শ্বিক সব পরিস্থিতি একদম নিখুঁত ও প্যানেলের জন্য প্রযোজ্য বিভিন্ন নিয়ম মেনে চলার পরও মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক নিয়মই সৌর প্যানেলের সক্ষমতাকে ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে দেবে না।
এর মূল কারণ তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র, যা বলে, মহাবিশ্বে শক্তির যে কোনো রূপান্তরে কিছু না কিছু অপচয় ঘটবেই। এটা মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়ম, যা কোনো প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমেই ডিঙানো সম্ভব নয়।
ফলে সূযের আলো ব্যবহার করা যায় এমন বিদ্যুতে রূপান্তরিত হলে শক্তির কিছু অংশ অপচয় হবেই। আর এখানেই আসে তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র।
তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র মতে, শক্তি কখনো ধ্বংস করা যায় না, কেবল এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হতে পারে। সৌর প্যানেলের ক্ষেত্রে এই অপচয় হওয়া শক্তিটুকু তাপে পরিণত হয়।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম