শিরোনাম
◈ ইরান কতদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে? ◈ পাহাড়কে অস্থিরতার ছক ৩ সশস্ত্র গোষ্ঠীর ও সীমান্তে ‘পুশইন’ নকশা ভারতের ◈ মাদকের বাক্সে ফুটবলার আ‌র্লিং হালান্ডের ছবি! উদ্ধার ২০০ কো‌টি টাকার ৪৬৯ কেজি কোকেন ◈ এশিয়ান গেম‌সে ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তান লড়াই হ‌বে শুধু পদকের জন‌্য ◈ প্রবাসফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনে ১০ কোটি ডলার ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক ◈ আত্মগোপনে থাকা নানক কীভাবে দেশ ছাড়লেন, জানালেন আনন্দবাজারকে ◈ ঢাকার সড়কে অটোরিকশার রাজত্ব : ব্যাটারি চার্জে ৩ হাজার কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন ◈ তারেক রহমানের সঙ্গে ছাত্রদলের শীর্ষ পাঁচ নেতার বিদায়ী সাক্ষাৎ, আসছে নতুন কমিটি ◈ রাষ্ট্রপতি হলে কি রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে হয়? ◈ বাংলাদেশে নিজেদের গোপন নেটওয়ার্ক গঠনের চেষ্টা করছে আল-কায়েদা: জাতিসংঘের সতর্কর্তা

প্রকাশিত : ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৩৮ দুপুর
আপডেট : ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৬ দুপুর

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

ইরান কতদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে?

এল আর বাদল: ইরান যুদ্ধের ছয় মাস পূর্ণ হতে চলেছে। অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়লেও সে দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যুদ্ধ সমাপ্তি নিয়ে বিশেষ তাড়া দেখা যাচ্ছে না।

তেহরান হয়তো দেখাতে চাইছে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টা এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। একইসঙ্গে তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মূল্যও বাড়িয়ে দিতে চাইছে যাতে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে তাদের কিছু দাবি দাওয়া মেনে নেওয়ার জন্য বাধ্য করা যায়।

তবে এর অনেক কিছুই নির্ভর করছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্নের উত্তরের উপর এবং তা হলো- ইরান আর কতদিন এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে? ----- সূত্র, বি‌বি‌সি বাংলা

সামরিক দিক থেকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে ইরান কতটা সক্ষম?

ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর বেশ কয়েকটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময় নিশানা করা হয়েছে। তবে তার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে কোনো নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়া যায়নি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'চ্যাথাম হাউজ' তাদের সর্বশেষ পর্যালোচনায় জানিয়েছে, ইরানের কাছে বর্তমানে কী পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ করা আছে তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাত্রা বা ঢেউ ছোট হয়ে এসেছে। তবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যার উপর নির্ভর করে তা নয়। ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করা তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ এবং কাজটা দ্রুততর করা সম্ভব। অন্যদিকে, এই যুদ্ধে নিহত কমান্ডারদের পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে এবং সামরিক কমান্ড কাঠামো এখন পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ অবস্থায় রয়েছে।

এই প্রসঙ্গে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ গায়েদি বিবিসি নিউজ ফার্সিকে বলেন, "ইরান সম্ভবত দীর্ঘ সময় ধরে উৎক্ষেপণ কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা বজায় রাখতে পারবে, যদিও তার মাত্রা কমতে পারে। তারা কিন্তু এখনো হরমুজ প্রণালিতেও বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম। ইরানের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চললে সেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মজুদের একটা অংশ ইতোমধ্যে ব্যবহার করা হয়ে গেছে এবং বিভিন্ন মার্কিন বিশ্লেষণে সতর্ক করে বলা হয়েছে এই গোলাবারুদ দ্রুত প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।

অধ্যাপক গায়েদি আরও বলেন, "তেলের দামের উপর যুদ্ধের প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তেহরানে এমন আশার সঞ্চার হয়েছে যে, তারা ওয়াশিংটনকে নিজেদের কিছু শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে পারবে।

অভ্যন্তরীণ দিক থেকে রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন তুলনামূলকভাবে বজায় থাকলেও, জনমত জরিপগুলোতে অন্য ছবি ফুটে উঠেছে। জরিপে ক্রমাগত দেখা যাচ্ছে, এই সংঘাতের প্রতি মার্কিন নাগরিকদের সায় নেই। তাছাড়া ট্রাম্প যে যুদ্ধে নিজের লক্ষ্য অর্জনে সফল হচ্ছেন না, সেটা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

তেহরানের হিসাব যদি ঠিকঠাক হয়, তবে তাদের লক্ষ্য হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটা যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যাওয়াটাই একটা চাপ তৈরির পন্থা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আপাতত এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে শুধু সামরিক সীমাবদ্ধতার কারণেই ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হবে।

এভাবে ইরানের অর্থনীতি কতদিন টিকতে পারবে?

যুদ্ধ শুরুর আগেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, তাদের নিজস্ব মুদ্রা 'রিয়াল'-এর মূল্য কমে যাওয়া এবং ব্যাপক কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার মতো একাধিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল ইরানের অর্থনীতি।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ইরানের অর্থনীতি প্রায় ২.৭ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে এবং এই অর্থবছরের শেষ কয়েক সপ্তাহেই শুধু যুদ্ধের প্রভাব পড়েছিল। এই যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুনভাবে আরো নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য বলছে সে দেশে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে।

যুদ্ধের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো। যেমন হরমুজগান প্রদেশে মূল্যস্ফীতির হার ১০১ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ইরানের শ্রম উপমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কর্মসংস্থানের দিক থেকে ১০ লাখেরও বেশি পদের উপর যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। শুধু তাই নয়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন।

এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০২৬ সালে ইরানের অর্থনীতি প্রায় ৫.৪ শতাংশ সংকুচিত হবে এবং মূল্যস্ফীতি ৬৯ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাবে। যুদ্ধের স্থায়িত্ব এবং বাণিজ্য ও তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে ব্যাঘাতের মাত্রা গভীর প্রভাব ফেলবে।

হরমুজ প্রণালি একদিকে যেমন কৌশলগত হাতিয়ার, তেমনই একটা দুর্বল স্থান হিসেবেও কাজ করে। এই পথে যে কোনো ব্যাঘাত ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য যুদ্ধের মূল্য বাড়িয়ে তুলতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ও জাহাজ চলাচলের উপর বিধিনিষেধের কারণে ইরানের পক্ষেও তেল রপ্তানি করাটা কঠিন।

তবে অর্থনৈতিক চাপ যে অনিবার্যভাবেই এই পরিস্থিতির কোনো বদল ঘটাবে তা কিন্তু নয়। মি. গায়েদি ব্যাখ্যা করেছেন, অত্যন্ত কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও স্বৈরাচারী সরকারগুলো বছরের পর বছর টিকে থাকতে পারে।

তার মতে, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা অসন্তোষ বাড়াতে পারে ঠিকই, কিন্তু সেটা তেহরানের সামরিক নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না, যদি না তার সঙ্গে ব্যাপক বিক্ষোভ কিংবা সরকারের অভ্যন্তরের কোনো বিভাজনও এসে যুক্ত হয়। 

তেহরানে যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে মতভেদ

এই পরিস্থিতিতে সামনে এগোনোর জন্য কোন পন্থা সবচেয়ে উপযোগী সে বিষয়ে তেহরানের অভ্যন্তরে মতভেদ রয়েছে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় দরকষাকষির দায়িত্বে থাকা দলের প্রধান মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এর আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, ইরান যেন কোনোভাবেই 'দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয় সৃষ্টিকারী সংঘাতের' ফাঁদে না পড়ে। যারা এই আলাপ-আলোচনার বিরুদ্ধে তাদেরও সমালোচনা করেছেন তিনি। তবে হার্ডলাইন নেতা নেতা বলে পরিচিত আমির হোসেইন সাবেতি পার্লামেন্টে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সব শর্ত মেনে নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষরও করে, তাহলেও যুদ্ধ হবে।

তবে এই মতপার্থক্যকে শুধু 'যুদ্ধের সমর্থক' ও 'শান্তির সমর্থক'- এই দুই শিবিরে ভাগ করা যায় না। এদিকে মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এও জানিয়েছেন যে, ইরানের অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় এমন কোনো চুক্তি তিনি মেনে নেবেন না। এই মতভেদ এখন মূলত যে বিষয়কে কেন্দ্র করে, তা হলো- ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধি করা তেহরানের পক্ষে কতটা যেতে পারে এবং ঠিক কোন পর্যায়ে গেলে অভীষ্ট ফলের তুলনায় বেশি মূল্য চোকাতে হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো জনসাধারণ কী ভাবছে? যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ইরানের নাগরিক মতামত নিয়ে কোনো নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ নেই। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সামগ্রিক দিক থেকে সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না।

তবে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও 'জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স'-এর ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি জানিয়েছেন, এই ইসলামি প্রজাতন্ত্রর জন্য তাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত "সবচেয়ে বিপজ্জনক ফ্রন্ট" হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক সমস্যা এবং দেশের অবকাঠামোর ওপর তৈরি ক্রমাগত চাপের কারণেই এমনটা হতে পারে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়