ডেস্ক রিপোর্ট: আগামী সেপ্টেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে এক বড় ধরনের বহুমুখী অস্থিতিশীলতার ছক তৈরি করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। এরই মধ্যে পাহাড়ের তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ভারতের ইন্ধনে পাহাড়কে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির নীল নকশা তৈরি করেছে। এক দিকে পাহাড়ে অস্থিরতা, অপর দিকে দেশে সীমান্ত এলাকাগুলোতে ‘পুশইন’ বাড়ানো। অপর দিকে সমতলে আওয়ামী লীগের আত্মগোপনে থাকা সক্রিয় নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল থেকে নাশকতা সৃষ্টিসহ গুপ্ত হামলায় বিভিন্ন ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে।
এরই মধ্যে ভারতে পলাতক সাবেক প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসার কথা বলায় তাকে পুঁজি করে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে গোপন তৎপরতা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের এ ধরনের গোপন তৎপরতার নেপথ্যে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের যোগসাজশ দেখতে পাচ্ছেন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
গোয়েন্দা সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পাহাড়ে বিভিন্ন উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে সেখানে ব্যাপক সহিংসতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাহাড়ের পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে আঞ্চলিক তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠী Ñকেএনএফ (কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট), ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট) এবং জেএসএস (জনসংহতি সমিতি)-এর একাংশের সাথে নতুন করে হাত মিলিয়েছে আরাকান আর্মি সশস্ত্র গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীর তৎপরতা এখন এতটাই ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে যা ভারী আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিভিন্ন ধরনের উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক মজুদ বেড়ে যাচ্ছে।
এ দিকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) প্রধান পরাগ জৈনসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের আকস্মিক ঢাকা সফর ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নানা আলোচনা। ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন তার দলবল নিয়ে ফিরে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাদের কর্মীদের সক্রিয় থাকার নির্দেশ দিয়েছে। পলাতক সাবেক মন্ত্রী ও এমপিদের হুঙ্কারের আচরণেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) ফজলে এলাহী আকবর নয়া দিগন্তকে বলেন, ফ্যাসিজমের অস্থিরতা থেকে বিভিন্ন ধরনের ইন্ধন থাকবেই। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দেশী-বিদেশী চক্রান্ত চলমান রয়েছে। তবে বিদেশী চক্রান্তের চেয়ে দেশের ভেতর ঘরের শত্রু ভয়ঙ্কর।
আর এই চক্রান্তের সমাপ্তি ঘটাতে সরকারকে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান করা প্রয়োজন। নিরাপত্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির (এনএসসি) মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুগুলো মোকাবেলা করতে হবে।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর জন্য পাহাড় থেকে সীমান্ত এবং সমতলে গুপ্ত হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, পাহাড়ের একধরনের অস্থিরতার পেছনে ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ রয়েছে। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে ভারত অবৈধভাবে পুশইনের চেষ্টা করেছে তাদের রুখে দিতে এরই মধ্যে সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী (বিজিবি) সদস্যরা গ্রামবাসীকে সাথে নিয়ে তা প্রতিহত করেছে। তিনি বলেন, কোনো নিরাপত্তা সংস্থা জনগণকে সাথে নিয়ে নিরাপত্তার কাজ করলে তা সহজে মোকাবেলা করা যায়।
গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশী ভূখণ্ডে ইউপিডিএফ এবং কুকি-চিনের সাথে আরাকান আর্মির এই দহরম-মহরমের কারণে বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলাÑ রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই তিন গ্রুপ মিলে সরকারের বিভিন্ন দিকের দুর্বলতা এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ গুঞ্জনকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্তশাসন বা সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি অঞ্চলের দাবি তোলার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে লবিং করার যৌথ পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং গোয়েন্দা তথ্য বলছে, একটি সুনির্দিষ্ট নীল নকশার অধীনে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং পার্বত্য অঞ্চলকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা চলছে। এক দিকে ঢাকায় আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গোপন ‘ঝটিকা মিছিলের’ প্রস্তুতি, অন্য দিকে পাহাড়ে তিনটি সশস্ত্র আঞ্চলিক গোষ্ঠীর গোপন তৎপরতা এবং দেশের সীমান্তজুড়ে ভারতের ‘পুশইন’ নীতিÑ সবমিলিয়ে এই ত্রিমুখী চাপ সামলাতে হচ্ছে বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে। এর মাঝেই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধানসহ শীর্ষ কর্তার ঢাকা সফর ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে নতুন জল্পনা।
ঢাকায় আওয়ামী লীগের গোপন ছক : আত্মগোপনকারীদের ‘ঝটিকা মিছিল’ : রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া ও আইনি চাপের মুখে থাকা আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা সেপ্টেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে নতুন কৌশলে মাঠে নামার পরিকল্পনা করছে। তাদের ল্য নির্বাচিত সরকারের জনমনে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করা।
হঠাৎ উপস্থিতি কৌশল : দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা মাঝারি ও মাঠপর্যায়ের নেতারা রাজধানী ঢাকার কৌশলগত এলাকাগুলোতে হঠাৎ জড়ো হয়ে মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিটের ‘ঝটিকা মিছিল’ বা ফ্যাশ মার্চ করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। গত ১১ আগস্ট ঢাকার মহাখালী এলাকায় আওয়ামী লীগের একটি ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যা মূলত এই পরিকল্পনারই একটি প্রাথমিক মহড়া বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
অর্থ ও সমন্বয় : গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রত্যঞ্চলের জেলাগুলো থেকে কর্মী এনে দৈনিক ভাতার বিনিময়ে এই ঝটিকা মিছিলে ব্যবহার করার একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা হচ্ছে। তাদের ল্যÑ সোস্যাল মিডিয়ায় নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। তারা আত্মগোপনে থেকে গুপ্ত হামলারও ছক তৈরি করেছে।
পাহাড়ে ৩ গোষ্ঠীর অস্থিরতার ছক : অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে। দেশের সার্বভৌমত্ব রা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা।
ত্রিপীয় জোটের তৎপরতা : গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ের পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠী Ñকেএনএফ (কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট), ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট) এবং জেএসএস (জনসংহতি সমিতি)-এর একাংশ। তাদের সাথে নতুন করে হাত মিলিয়েছে আরাকান আর্মি সশস্ত্র গোষ্ঠী। তারা সম্প্রতি সীমান্ত পার হয়ে আধুনিক অস্ত্রের বড় ধরনের চোরাচালান পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চলে প্রবেশ করেছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য পার্বত্য অঞ্চলের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং সমতল থেকে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর নজর পাহাড়ে সরিয়ে নেয়াই এই তিন গোষ্ঠীর মূল পরিকল্পনা।
সীমান্তে ভারতের ‘পুশইন’ নকশা : বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর কার্যক্রম এবং ‘পুশইন’ নীতি নতুন রাজনৈতিক সরকারের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের এই রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়কালকে পুঁজি করে ভারতীয় সীমান্তরী বাহিনী ও পুশইন সিন্ডিকেটগুলো বাংলাভাষী সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশ সীমান্তে পুশইন বা ঠেলে দেয়ার চেষ্টা বৃদ্ধি করেছে।
সীমান্তে উত্তেজনা : এই পুশইন নকশার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে সোচ্চার হয়েছে। প্রয়োজনে ভারতীয় হাইকমিশন ঘেরাও বা সীমান্ত অভিমুখে লং মার্চের আলটিমেটামও এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তকে অশান্ত রেখে ঢাকাকে সবসময় কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখাই এই পুশইন ব্লু-প্রিন্টের লক্ষ্য।
বিজিবির বক্তব্য : এ বিষয়ে বিজিবি সদর দফতরের উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আব্দুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭১ কিলোমিটার। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দুর্গম পাহাড়ি, বনাঞ্চল ও যোগাযোগ-প্রতিবন্ধক এলাকায় অবস্থিত। এই পুরো সীমান্তজুড়ে বিজিবি প্রয়োজনীয়সংখ্যক বর্ডার আউটপোস্ট, টেম্পোরারি অপারেটিং বেস, নিয়মিত সীমান্ত টহল, পর্যবেণ পোস্ট ও অপারেশনাল মোতায়েনের মাধ্যমে সার্বণিক নজরদারি বজায় রেখেছে। পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত টহল ও মোতায়েনও করা হয়।
তিনি আরো বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা আরো কার্যকর করতে বিজিবি ড্রোন, থার্মাল ইমেজিং ডিভাইস, নাইট ভিশন সরঞ্জাম, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা নজরদারিসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ফলে দিন ও রাত উভয় সময়েই সীমান্ত এলাকায় কার্যকর পর্যবেণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষ করে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির দুর্গম এলাকায় বিজিবি নিয়মিত লং রেঞ্জ ও শর্ট রেঞ্জ পেট্রোল, ডমিনেশন পেট্রোল, অ্যাম্বুশ, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় অপারেশনাল ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। দুর্গম এলাকায় সদস্যদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প যোগাযোগ ও আকাশপথে রসদ সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে। সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র, মাদক বা সন্ত্রাসী তৎপরতা প্রতিরোধে বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কার্যকর দায়িত্ব পালন করছে।
বর্তমান প্রোপটে, দেশের নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারেÑ এমন যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাষ্ট্রের সব নিরাপত্তা সংস্থা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
ঢাকায় ‘র’ প্রধানের সফর : কী এই আগাম বার্তা? : এই সামগ্রিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফর এবং অত্যন্ত গোপনীয় কিছু বৈঠক নতুন ডালপালা মেলেছে। ভারতের এই শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তার আকস্মিক সফর ইঙ্গিত করে যে, দিল্লির নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচিত সরকারের ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ, দ্বিপীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতি নিয়ে গভীরভাবে পর্যবেণ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা সফরে এসে তিনি মূলত বর্তমান প্রশাসনের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছেন যে, আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা বা মাইনাস করার েেত্র সরকারের অবস্থান কতটুকু কঠোর। ---- সূত্র, নয়াদিগন্ত