স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তিন কিশোরী। গন্তব্য স্কুল নয়, শেষ পর্যন্ত তারা ছুটে যায় সীমান্তের পথে। পাবনা থেকে নাটোর, নাটোর থেকে রংপুর, এরপর কুড়িগ্রাম। উদ্দেশ্য ছিল সীমান্ত এলাকায় যাওয়া। পরিবারের গচ্ছিত প্রায় এক লাখ টাকা নিয়ে তাদের একজন বাড়ি থেকে বের হয়েছিল বলেও পরিবারের দাবি। অচেনা শহরে রাত কাটানোর জায়গা খুঁজতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলে তারা। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের নজরে পড়ায় উদ্ধার হয় তিন স্কুলছাত্রী। গত রোববার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘটে এ ঘটনা। সোমবার দুপুরে তিন কিশোরীকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে পাবনা সদর থানা পুলিশ। তিনজনই পাবনা সদর উপজেলার চর আশুতোষপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। একজন অষ্টম শ্রেণির এবং দু’জন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।
একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় তাদের মধ্যে ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন কিশোরীর একজন দীর্ঘদিন ধরে নিজের চেহারা ও চোখের সমস্যা নিয়ে পরিবারের কাছ থেকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তার মধ্যে ক্ষোভ ও অভিমান তৈরি হয়। একপর্যায়ে বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাওয়ার চিন্তা করতে থাকে সে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে বিভিন্ন ভিডিও ও বিনোদনমূলক কনটেন্ট দেখার পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় সংগীতদল বিটিএসের প্রতিও ওই কিশোরীর আগ্রহ তৈরি হয়। একপর্যায়ে সীমান্ত এলাকা দিয়ে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানায় সে দুই সহপাঠীকে। বন্ধুত্বের টানে তারাও ওই পরিকল্পনায় যুক্ত হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী রোববার সকাল ১০টার দিকে তিনজন বিদ্যালয়ে এসে একত্র হয়। কিন্তু ক্লাসে না গিয়ে অটোরিকশায় করে চলে যায় পাবনা শহরের অনন্ত মোড় এলাকায়। সেখান থেকে আরেকটি অটোরিকশায় পাবনা বাস টার্মিনাল।
এরপর বাসে নাটোর। নাটোর থেকে রংপুর। সেখান থেকে কুড়িগ্রাম। একের পর এক যানবাহন বদলে তিন কিশোরী যখন কুড়িগ্রামে পৌঁছায়, তখন তারা নিজেদের পরিচিত পরিবেশ থেকে অনেক দূরে। পরিবারের দাবি, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাদের একজন গচ্ছিত প্রায় এক লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে যায়। সন্ধ্যার আগে কুড়িগ্রাম বাস টার্মিনালে পৌঁছে তারা রাত কাটানোর জন্য থাকার জায়গা খুঁজতে থাকে। খুঁজতে খুঁজতে ঢুকে পড়ে একটি অপরিচিত মহল্লায়। মহল্লায় তিন কিশোরীর গতিবিধি দেখে সন্দেহ হয় স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের। সেখানে বসবাস করেন কুড়িগ্রাম সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তাজ উদ্দিন। তার স্ত্রী তিন কিশোরীর সঙ্গে কথা বলেন। কথাবার্তা ও আচরণে সন্দেহ হওয়ায় তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে যান তিনি। তাদের খাবার দেয়া হয়, বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়। পরে বিষয়টি এসআই তাজ উদ্দিনকে জানানো হলে তিনি কৌশলে কিশোরীদের কাছ থেকে পরিবারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন। এরপর যোগাযোগ করা হয় তাদের পরিবারের সঙ্গে।
বিষয়টি জানানো হয় সংশ্লিষ্ট পুলিশকেও। এদিকে পাবনায় তখন উৎকণ্ঠায় তিন পরিবার। মেয়েরা বাড়িতে ফেরেনি। খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে পাবনা সদর থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন পরিবারের সদস্যরা। একই বিদ্যালয়ের তিন নাবালিকা একসঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে উদ্ধারে তৎপর হয় পাবনা জেলা পুলিশ। পরে কুড়িগ্রাম সদর থানার এসআই তাজ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। কুড়িগ্রাম সদর থানা পুলিশের সহযোগিতায় নিরাপদে উদ্ধার করা হয় তিন কিশোরীকে।
সোমবার দুপুরে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পাবনা সদর থানার ওসি তারিকুল ইসলাম বলেন, তিন কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক জিডি করা হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পুলিশ কাজ করে। কুড়িগ্রাম সদর থানার একজন উপ-পরিদর্শকের মাধ্যমে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতায় তিন কিশোরীকে নিরাপদে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। তিন কিশোরী ফিরে এসেছে-এটাই আপাতত পরিবারের সবচেয়ে বড় স্বস্তি। উৎস: মানবজমিন।