বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাক্ষাতের পর সম্ভাব্য এই সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিন হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দুই দেশের সম্পর্ক এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কথা বলেন তারা।
নভেম্বরে তারেক রহমান ভারত সফরে যাচ্ছেন কি না—এমন ‘গুঞ্জন’ সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে এ নিয়ে ‘ইতিবাচক ফল’ আসতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
অন্যদিকে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, সবকিছু ইতিবাচকভাবে এবং যথাসময়ে হবে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সুবিধাজনক সময়েই সফরটি অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানান তিনি।
কূটনৈতিক পরিভাষায় বিষয়টিকে এখনো ‘সম্ভাব্য সফর’ হিসেবে দেখা হলেও, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরের অনেক আগেই সফরে কোন কোন বিষয়কে বাংলাদেশ গুরুত্ব দেবে, সে বিষয়ে দেশের অবস্থান চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখন সেই প্রস্তুতির কাজই করছেন বলে ধারণা তার।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক যে সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে পড়ে গেছে, সেখান থেকে উত্তরণই এই সফর প্রস্তুতির বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিমন্ত্রী ও ভারতীয় হাইকমিশনার যা বলেছেন
মঙ্গলবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
পরে সাংবাদিকদের ভারতীয় হাইকমিশনার জানান, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় হুমায়ুন কবিরকে অভিনন্দন জানাতেই তার এই সৌজন্য সাক্ষাৎ।
হুমায়ুন কবির বলেন, দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুকূল পর্যায়ে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের তারিখ ও সময় নিয়ে আলোচনা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। সেগুলো আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করব।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও আলোচনা হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ভিজিট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিছু চ্যালেঞ্জ আছে, যেগুলো আলোচনার মাধ্যমে অ্যাড্রেস করা হচ্ছে।’
নভেম্বরেই সফর হতে পারে—এমন গুঞ্জনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গুঞ্জন মানে তো গুঞ্জনই। গুঞ্জন নিয়ে তো আমি কথা বলি না। আমি কথা বলি বাস্তবতা নিয়ে। বাস্তবতা হলো, আজ আমাদের মধ্যে ভালো বৈঠক হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, আলোচনা ফলপ্রসূ ও আন্তরিক পরিবেশে হয়েছে। যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলো কথাবার্তার মাধ্যমেই সমাধান করা হবে।
অন্যদিকে দীনেশ ত্রিবেদী সাংবাদিকদের বলেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় ভারতের পক্ষ থেকে তারা সন্তুষ্ট। কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘ইনভাইটেশন ইজ ওপেন। এ নিয়ে তাড়াহুড়োর দরকার আছে বলে মনে হয় না। সময় হলে হবে। সবকিছু ইতিবাচক। একটা সময় সবকিছু পজিটিভ হবে। আমরা আত্মবিশ্বাসী। উভয় প্রধানমন্ত্রীর সুবিধাজনক সময়ে এটা হবে।’
পরে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়, হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।
পোস্টে বলা হয়, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় হাইকমিশনার তাকে অভিনন্দন জানান। আলোচনায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অব্যাহত সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণে ইতিবাচক ফলাফল অর্জন করা যায়।
আর কী জানা গেল
ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন—এমনটি নীতিগতভাবে ধরে নিয়েই প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশ।
বিশেষ করে তিস্তার পানি বণ্টন, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নসহ বিদ্যমান বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণের কাজ চলছে।
এর বাইরে সম্ভাব্য এই সফরে বড় যে বিষয়টি সামনে আসতে পারে, সেটি হলো শেখ হাসিনা ইস্যু। তবে এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান রাজনৈতিক নেতৃত্বই নির্ধারণ করবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে আগেই বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের হস্তান্তরের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, অভ্যন্তরীণ জনমতের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করে সেটিই সফরের সময় তুলে ধরতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।
তার মতে, ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই দুই দেশের মধ্যে সক্রিয় ও সহজ সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। সম্পর্কের টানাপোড়েনে দুই দেশই, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা জানি যে আমরা কী চাই। কিন্তু চাইলে হয়তো সব হবে না। তারপরও চাইতে হবে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলোচনা এবং সম্পর্কের আদান-প্রদান গুরুত্বপূর্ণ।’
এর আগে গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে ১৬ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল, এই সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম বলেছিলেন, দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীকে দ্রুত ফেরত পাঠানো এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ এ বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
তবে তখন তিনি জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দুই দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
এর আগে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব—এফসিসি সাউথ এশিয়ার সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বক্তব্যের দিনই কড়া ভাষায় একটি বিবৃতি দিয়েছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ভারতের লোকসভার স্পিকার দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তাকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
এ ছাড়া ভারতের পক্ষ থেকে আরও একটি আমন্ত্রণ ছিল। সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনেও তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন জানিয়েছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে ওই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।