প্রস্রাব থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ার প্রধান কারণ হলো— পানিশূন্যতা, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন অথবা নির্দিষ্ট কিছু খাবার ও ওষুধ। এ ছাড়া অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, লিভারের সমস্যা কিংবা গর্ভাবস্থাতেও প্রস্রাবের দুর্গন্ধ হতে পারে। এটি মূলত আপনার শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে প্রস্রাব ঘনীভূত হয় এবং অ্যামোনিয়ার মতো তীব্র গন্ধ বের হতে থাকে।
সাধারণত দিনে ৪-৮ বার প্রস্রাব করা স্বাভাবিক। এর বেশি কিংবা কম হলে এবং সঙ্গে ব্যথা, জ্বালাপোড়া বা অস্বাভাবিক রঙ থাকলে তা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর ব্যথা কিংবা জ্বালাপোড়া কিংবা ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আর শরীরের ভেতরের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করে প্রস্রাব। এটি শরীরের প্রধান বর্জ্য নিষ্কাশন প্রক্রিয়া, যা কিডনির মাধ্যমে রক্ত ফিল্টার করে ইউরিয়া, টক্সিন, লবণ, অতিরিক্ত পানি ও অন্যান্য বিষাক্ত বিপাকীয় পদার্থ নিঃসরণ করে। মূত্রতন্ত্রের মাধ্যমে প্রস্রাব বর্জ্য মূত্রাশয় ও মূত্রনালির সহায়তায় শরীরের বাইরে বের হয়, যা শরীরের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক ভারসাম্য বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সাধারণত প্রস্রাবের গন্ধ হালকা হয়ে থাকে এবং এটি সচরাচর নজরে আসে না। তবে অনেকেরই হঠাৎ করে প্রস্রাব থেকে তীব্র, অস্বাভাবিক বা দীর্ঘস্থায়ী দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। এ ক্ষেত্রে অনেকেই অবহেলা করে থাকেন, যা মোটেও ঠিক নয়।
কিছু ক্ষেত্রে জীবনযাপনের ছোট পরিবর্তনের জন্য সাময়িক গন্ধ হতে পারে। তবে এ সমস্যা কয়েক দিন বা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। এ বিষয়ে মুম্বাইয়ের নেফ্রোলজিস্ট ডা. আদিত্য নায়ক ও ইউরোলজিস্ট ডা. প্রদীপ রাওয়ের মতে, প্রস্র্রাবের গন্ধ পরিবর্তনের সাধারণ কারণ হচ্ছে পানিশূন্যতা। শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি না থাকলে প্রস্রাব ঘনীভূত হয় এবং এতে অ্যামোনিয়ার মতো তীব্র গন্ধ হয়। ক
আর খাদ্যাভ্যাসেও প্রস্রাবের গন্ধে ভূমিকা থাকে। কারণ রসুন, পেঁয়াজ, অ্যাসপারাগাসের মতো খাবার খেলে প্রস্রাবে বিশেষ ধরনের গন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আবার অতিরিক্ত কফি বা অ্যালকোহল গ্রহণের কারণেও প্রস্রাবের স্বাভাবিক গন্ধ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে গন্ধ ক্ষতিকর নয় এবং খাদ্যাভ্যাস স্বাভাবিক হলে তখন আপনাআপনিই গন্ধ কমে যায়।
এ ছাড়া মূত্রনালির সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কারণ প্রস্রাবের দুর্গন্ধ যদি জ্বালাপোড়া, ব্যথা কিংবা অস্বস্তির সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বুঝতে হবে মূত্রনালির সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) হলে ব্যাকটেরিয়া জমে দুর্গন্ধ তৈরি হয়। এ অবস্থায় কিছুক্ষণ পরপর প্রস্রাবের বেগ হওয়া, জ্বালাপোড়া ও তলপেটে ব্যথা বা জ্বর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স: অনেক সময় ভিটামিন বা ওষুধ গ্রহণের কারণেও প্রস্রাব থেকে গন্ধ বের হয়ে থাকে। বিশেষ করে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স জাতীয় সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা হলে প্রস্রাব উজ্জ্বল রঙের ও তীব্র গন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার কিছু অ্যান্টিবায়োটিক বা ওষুধের ক্ষেত্রেও এমনটা হয়ে থাকে, তবে এসব ক্ষতিকর নয়।
আর ডায়াবেটিস থেকেও প্রস্রাবের দুর্গন্ধ হয়। ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত হলে প্রস্রাবে গ্লুকোজ বা কিটোনের উপস্থিতির জন্য মিষ্টি বা অ্যাসিডিক ধরনের গন্ধ হতে পারে। কখনো কখনো রোগী উপলব্ধিই করতে পারেন না, তার রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময় প্রস্রাবের গন্ধ এ সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
ডায়াবেটিস ছাড়াও কিডনির সমস্যার কারণে প্রস্রাবে দুর্গন্ধ হতে পারে। এ বিষয়ে ডা. আদিত্য নায়ক বলেছেন, প্রস্রাবের দুর্গন্ধ কয়েক দিন যদি থাকে, আর প্রস্রাবের সময় যদি ব্যথা হয়, রঙ গাঢ় কিংবা অস্বাভাবিক হয়, জ্বর কিংবা কাঁপুনি কিংবা তলপেট ও কোমরের পাশে ব্যথা হয়, তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাধারণত এ ধরনের লক্ষণ কিডনির সমস্যার কারণে হয়ে থাকে।
প্রস্রাবজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা সাধারণত প্রস্রাব পরীক্ষা, এর কালচার, রক্তে শর্করার পরীক্ষা এবং কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষার পর প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সময়মতো চিকিৎসা নিয়ে রোগ শনাক্ত করতে পারলে বড় জটিল রোগ এড়ানো সম্ভব।
সূত্র: যুগান্তর