ইরানের অভ্যন্তরে কুখ্যাত ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ক্রমবর্ধমান অনুপ্রবেশ ও গোপন অপারেশন ঠেকাতে বেইজিং এক বিশাল কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ২০২৫ সালে ইরানের ভেতরে ইসরায়েলের সুদূরপ্রসারী হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র চুরির মাধ্যমে যে নিরাপত্তা ঘাটতি প্রকাশ পেয়েছে, তা চীনকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। বেইজিং মনে করছে, মোসাদের এই সক্ষমতা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য একটি ‘প্যান্ডোরা বক্স’ বা নতুন বিপদ খুলে দিয়েছে।
মডার্ন ডিপ্লোমেসির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে চীন ইরানকে পরামর্শ দিয়েছে যেন তারা সব ধরনের মার্কিন ও ইসরায়েলি সফটওয়্যার ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। এর পরিবর্তে চীন ইরানকে নিজস্ব ‘ক্লোজড সিস্টেম’ বা সুরক্ষিত প্রযুক্তি সরবরাহ করছে, যা হ্যাক করা মোসাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। এছাড়া, ইরান মার্কিন জিপিএস-এর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনের তৈরি ‘বেইডু’ নেভিগেশন সিস্টেমে সম্পূর্ণ স্থানান্তরিত হওয়ার পরিকল্পনা করছে।
২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে চীন সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চীন ইরানকে সলিড-ফুয়েল কেমিক্যাল (যেমন সোডিয়াম পারক্লোরেট) এবং নিখুঁত গাইডেন্স সিস্টেম সরবরাহ করছে। এর ফলে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আরও শক্তিশালী হবে এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দারা এগুলোকে কারিগরিভাবে অকেজো করতে পারবে না।
ইরানের আকাশসীমায় ইসরায়েলের আধিপত্য কমাতে চীন অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম (YLC-8B এবং JY-27A) সরবরাহে জোর দিচ্ছে। এই রাডারগুলো ইসরায়েলের ‘স্টিলথ’ বা রাডার-ফাঁকি দিতে সক্ষম এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান শনাক্ত করতে পারে। বেইজিংয়ের লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির এমন এক ভারসাম্য তৈরি করা যেখানে ইসরায়েল এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে।
চীন শুধুমাত্র প্রযুক্তি দিয়েই ক্ষান্ত নয়, বরং তারা ‘সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা’র (এসসিও) মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে চীন, রাশিয়া এবং ইরান নিজেদের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করবে, যাতে মোসাদ বা সিআইএ-র যেকোনো গোপন নাশকতামূলক কার্যক্রম আগেভাগেই নস্যাৎ করা যায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের বর্তমান সরকারের স্থিতিশীলতা চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিংয়ের বিশাল বিনিয়োগ প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এবং জ্বালানি আমদানির পথগুলো (যেমন হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগর) সুরক্ষিত রাখতে ইরানের স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। চীন মনে করে, মোসাদের অনুপ্রবেশ যদি ইরান সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলে, তবে তা সরাসরি চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত হানবে।
ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং মোসাদের জাল ছিন্ন করার এই চীনা প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে তেহরানের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব যেমন বাড়ছে, তেমনি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্ভেদ্য হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: ইনকিলাব