স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাবে সায় নেই নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। নির্দলীয় নির্বাচন হওয়ায় তাদের পক্ষে এমন আইন করা সম্ভব নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি। তবে জাতীয় সংসদের মতো স্থানীয় সরকারের ভোটেও দ্বৈত নাগরিক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) অভিযুক্ত আসামির প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না রাখার প্রস্তাব যাচ্ছে সরকারের কাছে। এ ছাড়া ঋণখেলাপির জামিনদার এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও প্রার্থী হতে পারবেন না- এমন বিধান করতে চাইছে ইসি। সূত্র: সমকাল প্রতিবেদন
পাশাপাশি এক সদস্যের নির্বাচনী আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব দিচ্ছে সংস্থাটি। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান একজন বিচারপতি ও একজন বিচার বিভাগীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তার (যুগ্ম জজ বা সহকারী জজ) বদলে শুধু উচ্চ আদালতের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনালগুলো গঠন করা হবে। দুই সদস্যের হওয়ায় যে কেউ দ্বিমত জানালে সেক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের তৃতীয় কোনো বেঞ্চে যাওয়ায় আপিল নিষ্পত্তি করতে দীর্ঘ সময় ও আইনি জটিলতা তৈরি হয়। এমন জটিলতা এড়াতেই এক সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব আনছে ইসি।
এসব আইন ও বিধি সংশোধনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে আজ মঙ্গলবার কমিশন সভায় বসতে যাচ্ছে ইসি। সকাল ১১টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠেয় সভায় একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আচরণবিধিমালার খসড়া অনুমোদনের কথা রয়েছে। স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের (সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ) জন্য আইন ও বিধিমালার সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করে সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। তবে আচরণ বিধিমালা সংশোধন ইসির নিজস্ব এখতিয়ার হওয়ায় এজন্য সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে না।
এর আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে ইসিকে প্রস্তাব দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ইসি প্রণীত খসড়া আচরণবিধিমালার ওপর মতামত দিতে গিয়ে সম্প্রতি ওই প্রস্তাব দেয় দলটি। তাদের প্রস্তাবে ছিল, কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতাকর্মী নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় যুক্ত করতে হবে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হচ্ছে। ফলে কোনো দলের নেতাদের অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার এখতিয়ার ইসির নেই। স্থানীয় সরকারের যেসব পদে নির্বাচন হবে, সেগুলোতে প্রার্থী হতে যোগ্যতার শর্ত পূরণ করলেই যে কেউ দাঁড়াতে পারবেন। এখানে কে কোন দলের সেটা বিবেচনায় আনবে না ইসি।
তিনি জানান, এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন ও বিধির বেশ কিছু সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব আজ কমিশন সভায় আলোচনার পর চূড়ান্ত করা হবে। এরপর সরকারের অনুমোদন পেলে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
এই ইসি বলেন, এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের আচরণবিধিমালার খসড়াও চূড়ান্ত হয়েছে। এসব বিধিমালাও কমিশন সভায় অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।
চার ক্যাটাগরির ব্যক্তির প্রার্থিতা নিষিদ্ধ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইন করে আইসিটি মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির প্রার্থী হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ইসি স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও এই আইন চালু করতে চায়।
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, আইসিটি আইনের ২০সি ধারায় অভিযোগপত্রভুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিধান আগে থেকেই রয়েছে। তবে এটি স্থানীয় সরকার আইনে যুক্ত না থাকায় আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে। এই কারণে বিধানটি স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রেও চালু করা হবে। ফলে অভিযোগপত্রভুক্ত কেউ স্থানীয় সরকারের মেয়র, চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান কাউন্সিলর বা সদস্য পদে নির্বাচন করতে পারবেন না। তবে ট্রাইব্যুনাল থেকে অব্যাহতি বা খালাস পেলে সেই অযোগ্যতা আর থাকবে না।
ইসির প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুমোদন হলে দ্বৈত নাগরিকরাও প্রার্থী হতে পারবেন না। কমিশন মনে করে, যারা অন্য দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন, তারা জনপ্রতিনিধি হওয়ার উপযুক্ত নন। এ ছাড়া সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকরা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। ওই কারণ দেখিয়ে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তারা যাতে প্রার্থী হতে না পারেন, ওই বিধান যুক্ত করতে সরকারকে সুপারিশ করতে যাচ্ছে ইসি।
এদিকে, ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার পরিচালক এবং ঋণখেলাপির জামিনদারদের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করার প্রস্তাবও রয়েছে ইসির। জাতীয় নির্বাচনে আইনের ফাঁক গলে ঋণখেলাপিদের কেউ কেউ নির্বাচিত হয়ে গেছেন এবং স্থানীয় সরকারে এটা ঠেকাতে এই বিধান কঠোর করার লক্ষ্যেই এমন প্রস্তাব দিচ্ছে ইসি।
এ ছাড়া এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের নির্বাচনে অযোগ্য চাওয়া হয়েছে। ইসি মনে করে, স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিলে যেমন অন্য শিক্ষকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আবার এসব শিক্ষক জয়ী হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে। তাই এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে চাকরি ছেড়ে করার পক্ষে তারা।
আরও যেসব প্রস্তাব
ইসির প্রস্তাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা রয়েছে। যাতে স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে যুক্ত করার সুযোগ থাকে। অবশ্য প্রয়োজন না হলে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন না করার পক্ষে ইসি।
স্বতন্ত্র প্রার্থিতার ক্ষেত্রে মোট ভোটারের ১ শতাংশের সমর্থন সূচক স্বাক্ষরের বিধান বাতিল ও জামানতের পরিমাণ বাড়ানোসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ইসির তরফে। এ ছাড়া হলফনামায় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের বিধানও যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।