সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বর্তমান অবস্থান জানতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে বেনজীর আহমেদের বর্তমান অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর অবস্থান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রকাশের পর তা নিশ্চিত হতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, বুধবার ইন্টারপোলের কাছে একটি ই-মেইল পাঠানো হয়েছে। সেখানে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সত্যতাও যাচাই করতে চাওয়া হয়েছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারামুক্তির পর গত ১৭ আগস্ট দুবাই থেকে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়ায় যান বেনজীর আহমেদ। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সেন্ট লুসিয়ার পাসপোর্ট তাঁর রয়েছে এবং দেশটিতে তাঁর যৌথ বিনিয়োগ রয়েছে। গ্রোস আইসলেট এলাকায় তাঁর একটি ফ্ল্যাট থাকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে আরও বলা হয়, গত ২৭ জুলাই দুবাইয়ের একটি আদালত থেকে জামিন পান বেনজীর। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৩০ জুলাই তিনি কারামুক্ত হন। এর আগে বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণসংক্রান্ত নথি ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দুবাইয়ের আদালতে উভয় পক্ষের শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত শর্তসাপেক্ষে তাঁকে জামিন দেন।
সূত্রের দাবি, বেনজীরের জামিনের জন্য ইউরোপে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা দুবাইয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির করেন। তাঁর জামিন ও কারামুক্তির খবর পাওয়ার পর বাংলাদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও তৎপরতা শুরু হয়। তবে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুবাই পুলিশের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করা হলেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, জামিন পাওয়ার পর বেনজীর দুবাই থেকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ কোনো দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্পেনসহ কয়েকটি দেশে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত সেন্ট লুসিয়াকে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি বেনজীর আহমেদের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি নিশ্চিত হতে ইন্টারপোলের কাছে তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। এখন ইন্টারপোলের জবাবের ওপরই তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে।
উল্লেখ্য, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে একাধিক মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অভিযোগগুলোর তদন্তের অংশ হিসেবে দেশ-বিদেশে তার সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়। তদন্ত চলাকালে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। পরে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় এবং আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে তিনি দেশের অন্যতম আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের সাতজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওই তালিকায় বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে দুদক আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, সম্পদ জব্দের উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সূত্র: প্রতিদিনের বাংলাদেশ