শিরোনাম
◈ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হেঁটে হেঁটে সচিবালয় থেকে ওসমানীতে প্রধানমন্ত্রী ◈ অসুস্থ টুকুকে দেখতে হাসপাতালে রিজভী ◈ ছিনতাই-চাঁদাবাজিতে নাজুক আইনশৃঙ্খলা: সংসদে যৌথ অভিযানের জোর দাবি ◈ বঙ্গোপসাগর-আন্দামান ঘিরে চীন-ভারতের সঙ্গে নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ, মিয়ানমারের দাওয়েই বন্দরে রাশিয়ার প্রবেশ ◈ যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত ২, তিন পুলিশসহ কয়েকজন আহত ◈ সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তে ভারতের বড় ধাক্কা, চুক্তি কার্যকর রাখার রায় আন্তর্জাতিক আদালতের ◈ বা‌র্সেলোনা-‌রিয়াল মা‌দ্রিদ মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকো ২৫ অ‌ক্টোবর ◈ বি‌লিয়ন ডলার খরচ ক‌রে বোয়িং থেকে নতুন করে বিমান কেনা লাভের নাকি চাপের? ◈ এশিয়ান গেমসের অব্যবস্থার দায় পি‌সি‌বির চেয়ারম‌্যান মহ‌সিন নকভির ঘাড়ে ◈ দুবাই ছাড়লেন বেনজীর আহমেদ, অবস্থান জানতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাইল বাংলাদেশ পুলিশ

প্রকাশিত : ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫২ দুপুর
আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৩ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তে ভারতের বড় ধাক্কা, চুক্তি কার্যকর রাখার রায় আন্তর্জাতিক আদালতের

সিন্ধু নদীর উৎপত্তি চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের পশ্চিমাংশে মানসসরোবর হ্রদের কাছে। হিমালয় পেরিয়ে নদীটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত আরব সাগরে গিয়ে মিশেছে।

সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত রায় দিয়েছেন, ভারত একতরফাভাবে ‘স্থগিত’ ঘোষণা করলেও ভারত-পাকিস্তান সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে। তবে ভারত এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। নয়াদিল্লির দাবি, যে সালিসি আদালত এই রায় দিয়েছেন, সেটির গঠনই সিন্ধু পানি চুক্তির বিধানের পরিপন্থী। ৬৬ বছর পুরোনো এই চুক্তি নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া বিরোধে কী বলা হয়েছে রায়ে? ভারতের জন্য এর তাৎপর্যই বা কী? আর এখন চুক্তিটির অবস্থান কোথায়?

সিন্ধু নদীর উৎপত্তি চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের পশ্চিমাংশে, মানসসরোবর হ্রদের কাছাকাছি। সেখান থেকে নদীটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আরব সাগরে মিশেছে। সিন্ধু এবং এর প্রধান পাঁচ উপনদী- ঝিলম, চেনাব, বিয়াস, শতদ্রু ও রাভি মিলেই গঠিত সিন্ধু নদীব্যবস্থা।

কেন হয়েছিল সিন্ধু পানি চুক্তি?

১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ ভারতের বিভাজনের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়। বিভাজনরেখা সিন্ধু নদীবিধৌত অঞ্চলকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়।

এর ফলে পাকিস্তানের পাঞ্জাবের কৃষকেরা একটি জটিল পরিস্থিতিতে পড়েন। তাদের সেচব্যবস্থা নির্ভর করত রাভি নদীর মাধোপুর এবং শতদ্রু নদীর ফিরোজপুরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ হেডওয়ার্কসের ওপর- দুটিই ভারতের ভূখণ্ডে পড়ে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে পানি-বিরোধ শুরু হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় আলোচনা শুরু হয়। তৎকালীন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট ইউজিন আর ব্ল্যাকের উদ্যোগে প্রায় নয় বছর ধরে আলোচনা চলে।

শেষ পর্যন্ত ১৯৬০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর করাচিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সিন্ধু পানি চুক্তিতে সই করেন।

চুক্তিতে কী ভাগাভাগি করা হয়েছিল?

চুক্তি অনুযায়ী, সিন্ধু নদীব্যবস্থার তিনটি পূর্বাঞ্চলীয় নদী- রাভি, বিয়াস ও শতদ্রুর পানির ওপর ভারতের প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়। এই তিন নদীর গড় বার্ষিক প্রবাহ প্রায় ৩৩ মিলিয়ন একর ফুট। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলীয় তিন নদী—সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের পানি ব্যবহারের প্রধান অধিকার দেওয়া হয় পাকিস্তানকে। এই তিন নদীর গড় বার্ষিক প্রবাহ প্রায় ১৩৬ মিলিয়ন একর ফুট। তবে ভারতের জন্য পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলো ব্যবহারের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ ছিল না।

চুক্তি অনুযায়ী ভারত এসব নদীতে ‘রান অব দ্য রিভার’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করতে পারে। এ ছাড়া সীমিত পরিমাণ পানি সংরক্ষণেরও অনুমতি রয়েছে। চুক্তিতে ভারতকে মোট ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন একর-ফুট পানি সংরক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাধারণ সংরক্ষণের জন্য ১ দশমিক ২৫ মিলিয়ন একর-ফুট, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন একর-ফুট এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য শূন্য দশমিক ৭৫ মিলিয়ন একর-ফুট।

তবে ভারত এখনো পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোতে অনুমোদিত পরিমাণে পানি সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলেনি। চুক্তি বাস্তবায়ন তদারকির জন্য গঠন করা হয় ‘পার্মানেন্ট ইন্ডাস কমিশন’। এতে ভারত ও পাকিস্তানের একজন করে কমিশনার থাকেন। বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও চুক্তিতে তিন স্তরের ব্যবস্থা রাখা হয়— ‘প্রশ্ন’, ‘পার্থক্য’ ও ‘বিরোধ’। সাধারণ কোনো প্রশ্ন কমিশন পর্যায়ে সমাধানের কথা। কোনো কারিগরি মতভেদ দেখা দিলে নিয়োগ দেওয়া হয় ‘নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ’। আর গুরুতর বিরোধের ক্ষেত্রে বিষয়টি যেতে পারে সাত সদস্যের ‘কোর্ট অব আরবিট্রেশন’ বা সালিসি আদালতে। বিশ্বব্যাংকও এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভারতের আপত্তি কোথায়?

ভারতের অনেক বিশ্লেষক দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ১৯৬০ সালের চুক্তিতে ভারত তুলনামূলকভাবে বড় ছাড় দিয়েছিল। তাদের যুক্তি, সিন্ধু নদীব্যবস্থার মোট পানির বড় অংশ বহনকারী তিনটি পশ্চিমাঞ্চলীয় নদী পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ করা হয়। অথচ উজানের দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভারতকে ওই নদীগুলো ব্যবহারে নানা বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে, এর প্রভাব পড়েছে বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখে সেচ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উন্নয়নে।

এখন সিন্ধু পানি চুক্তির অবস্থান কী?

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাতের মধ্যেও সিন্ধু পানি চুক্তি টিকে ছিল। ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, এমনকি ১৯৯৯ সালের কারগিল সংঘাতও এই চুক্তিকে অকার্যকর করতে পারেনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি এবং ২০২৪ সালের আগস্টে ভারত চুক্তিটি পর্যালোচনা ও সংশোধনের জন্য পাকিস্তানকে নোটিশ দেয়। এরপর ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ঘোষণা করে, সিন্ধু পানি চুক্তি ‘অবিলম্বে স্থগিতাবস্থায়’ রাখা হবে। ভারত অবশ্য ‘চুক্তি বাতিল’ বা ‘স্থগিত’- এ ধরনের স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করেনি। তারা বলেছে, চুক্তিটি ‘abeyance’-এ রাখা হয়েছে। সমস্যা হলো, ‘abeyance’ শব্দটি সিন্ধু পানি চুক্তির কোথাও নেই। আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনেও এর নির্দিষ্ট কারিগরি অর্থ নেই। এই শব্দচয়নই পরে সালিসি আদালতের শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

সালিসি আদালত কী রায় দিয়েছেন?

পাকিস্তানের আবেদনের ভিত্তিতে দ্য হেগের সালিসি আদালত ভারতের ২০২৫ সালের সিদ্ধান্তের আইনি অবস্থান পরীক্ষা করেন। আদালত বলেন, ‘abeyance’ শব্দটির নিজস্ব কোনো নির্দিষ্ট আইনি অর্থ নেই। তাই শুধু শব্দটি নয়, ভারতের সিদ্ধান্তের বাস্তব পরিণতি বিবেচনা করেই এর আইনি চরিত্র নির্ধারণ করতে হবে। আদালতের মতে, ভারতের পদক্ষেপ কার্যত চুক্তি স্থগিত করা অথবা বাতিল করার দাবি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এরপর প্রশ্ন ওঠে- ভারত কি একতরফাভাবে এমন পদক্ষেপ নিতে পারে? সালিসি আদালতের উত্তর- না। রায়ে বলা হয়, সিন্ধু পানি চুক্তিতে কোনো পক্ষকে একতরফাভাবে চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করার অধিকার দেওয়া হয়নি। চুক্তি কার্যকর থাকবে, যদি না ভারত ও পাকিস্তান যৌথভাবে নতুন কোনো চুক্তির মাধ্যমে এটি সংশোধন বা বাতিল করে।

ভারতের কয়েকটি যুক্তিও আদালত প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভারত দাবি করেছিল, পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি সংশোধন নিয়ে মতবিরোধ, ভারতীয় প্রকল্পে পাকিস্তানের আপত্তি এবং সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ- এসব বিষয় চুক্তি স্থগিতের কারণ হতে পারে। আদালত বলেন, সিন্ধু পানি চুক্তি মূলত নদীর পানি ব্যবহারের বিষয় নিয়ে করা একটি নির্দিষ্ট চুক্তি। সন্ত্রাসবাদ এর আওতাভুক্ত নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রয়োজন কিংবা দুই দেশের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাতকেও চুক্তি স্থগিতের যথেষ্ট আইনি কারণ হিসেবে মানেননি আদালত।

ফলে আদালতের সিদ্ধান্ত হলো, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো পুরোপুরি কার্যকর এবং ভারতকে চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে। একই সঙ্গে আদালত ভারতের ৮৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ নিয়েও নির্দেশনা দিয়েছেন। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ৯০ দিন পর পর্যন্ত প্রকল্পের বাঁধের দেয়াল ও বিদ্যুৎ গ্রহণ কাঠামোর নির্দিষ্ট উচ্চতার ওপর কংক্রিটের কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ২০২৭ সালের জুলাইয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই রায়ের অর্থ কী ভারতের জন্য?

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে এই রায় ভারতের জন্য অস্বস্তিকর। তবে নয়াদিল্লি শুরু থেকেই সালিসি আদালতকে স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের দাবি, আদালতটি গঠনের প্রক্রিয়াই সিন্ধু পানি চুক্তির লঙ্ঘন। ভারত কখনোই এই আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। আগের রায়গুলোর মতো এবারও তারা সর্বশেষ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের অবস্থান হলো, যে আদালতের আইনগত বৈধতাই তারা স্বীকার করে না, তার রায়ও তাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে পাকিস্তানের জন্য এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তি দিতে পারে যে ভারত একতরফাভাবে চুক্তি স্থগিত করে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং নদীর পানিকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ‘abeyance’ শব্দ ব্যবহারের সিদ্ধান্তও এখানে একটি দুর্বলতা তৈরি করেছে। কারণ, ভারত চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিলও করেনি, আবার স্থগিত করার সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোও ব্যাখ্যা করেনি। এই অস্পষ্টতাকেই সালিসি আদালত নিজেদের রায়ে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছে। 

ভারত কেন সালিসি আদালতকে স্বীকৃতি দেয় না?

বিতর্কের সূত্রপাত মূলত ভারতীয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে ঘিরে। ২০১৫ সালে পাকিস্তান ভারতের কিশেঙ্গঙ্গা ও রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা নিয়ে আপত্তি তোলে। তখন পাকিস্তান প্রথমে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে আবেদন করে। কিন্তু ২০১৬ সালে পাকিস্তান সেই আবেদন প্রত্যাহার করে সরাসরি সালিসি আদালত গঠনের দাবি জানায়। ভারত চেয়েছিল, বিষয়টি নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হোক। সমস্যা হলো, একই বিষয়ে কোন প্রক্রিয়াটি আগে চলবে—নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ নাকি সালিসি আদালত, সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংককে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা চুক্তিতে দেওয়া হয়নি। তাই ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বব্যাংক দুটি প্রক্রিয়াই সাময়িকভাবে স্থগিত করে।

পরে সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হলে ২০২২ সালে বিশ্বব্যাংক একই সঙ্গে একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয় এবং সালিসি আদালতও গঠন করে। এখানেই ভারতের সবচেয়ে বড় আপত্তি। নয়াদিল্লির যুক্তি, একই বিষয় নিয়ে দুটি সমান্তরাল বিচারিক প্রক্রিয়া চললে পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত আসতে পারে। আর সিন্ধু পানি চুক্তিতে এমন সমান্তরাল প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়নি। এই পরিস্থিতির পরই ভারত ২০২৩ ও ২০২৪ সালে চুক্তি সংশোধনের নোটিশ দেয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ভারত চুক্তি ‘স্থগিতাবস্থায়’ রাখার ঘোষণা দেওয়ার পর নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের প্রক্রিয়াতেও অংশ নেওয়া বন্ধ করে দেয়। তবে পাকিস্তানকে নিয়ে সেই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। সর্বশেষ দুটি বৈঠক হয়েছে ২০২৫ সালের নভেম্বর এবং ২০২৬ সালের মে মাসে।

পাকিস্তানের অভিযোগের জবাবে ভারত কী বলছে?

পাকিস্তান বলছে, ভারতের সিদ্ধান্ত তাদের পানি নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছে। কিন্তু ভারতের পাল্টা যুক্তি ভিন্ন। নয়াদিল্লি বলছে, ১৯৬০ সালের চুক্তিতেই পাকিস্তান সিন্ধু নদীব্যবস্থার বড় অংশের পানির অধিকার পেয়েছে। ভারত উজানের দেশ হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলো ব্যবহারে কঠোর সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছে। ভারতের আরেকটি অভিযোগ হলো, পাকিস্তান বারবার চুক্তির বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ভারতীয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছে। এতে জম্মু ও কাশ্মীরে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের পানি সংকটের জন্যও ভারত নিজেকে দায়ী মনে করে না। ভারতের মতে, পাকিস্তানের পানি সংকটের পেছনে রয়েছে কৃষিতে অদক্ষ পানি ব্যবহার, পর্যাপ্ত জলাধারের অভাব এবং ভূগর্ভস্থ পানির দ্রুত হ্রাসের মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যা।

ভারতের পানি যাতে পাকিস্তানে না যায়, সে জন্য কী করা হচ্ছে?

সিন্ধু পানি চুক্তি অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলীয় তিন নদী- রাভি, বিয়াস ও শতদ্রুর পানি ব্যবহারের অধিকার ভারতের। কিন্তু ভারতের সব বরাদ্দকৃত পানি এখনো দেশটির কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এর একটি অংশ পাকিস্তানে প্রবাহিত হয়ে যায়। বিশেষ করে মাধোপুরের নিচ দিয়ে প্রায় ২ মিলিয়ন একর-ফুট রাভির পানি ব্যবহার না করেই পাকিস্তানে চলে যায় বলে ধারণা করা হয়। এই পানি ব্যবহারের জন্য ভারত তিনটি প্রকল্প চিহ্নিত করেছে- শাহপুর কান্দি প্রকল্প, উঝ বহুমুখী প্রকল্প এবং প্রস্তাবিত দ্বিতীয় রাভি-বিয়াস সংযোগ প্রকল্প। শাহপুর কান্দি প্রকল্পের মাধ্যমে রণজিৎ সাগর বাঁধ থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত পানি সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। রাভির একটি বড় উপনদীর ওপর উঝ বহুমুখী প্রকল্প ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অন্যদিকে দ্বিতীয় রাভি-বিয়াস সংযোগ প্রকল্পের লক্ষ্য রাভির অতিরিক্ত পানি বিয়াস অববাহিকায় সরিয়ে নেওয়া। তবে প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

সামনে কী?

সালিসি আদালতের রায় নতুন করে একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে- সিন্ধু পানি চুক্তি এখন আর শুধু পানি ভাগাভাগির একটি পুরোনো চুক্তি নয়। এটি ভারত-পাকিস্তানের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের অংশ হয়ে উঠছে। আইনগতভাবে পাকিস্তান এখন একটি আন্তর্জাতিক রায়ের সমর্থন পেয়েছে। অন্যদিকে ভারত সেই রায়ের বৈধতাই মানছে না। ফলে প্রশ্নটি এখন শুধু চুক্তি কার্যকর কি না- সেখানে সীমাবদ্ধ নেই। মূল প্রশ্ন হলো, দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে এমন একটি চুক্তি, যা যুদ্ধের সময়ও টিকে ছিল, তা কি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার চাপ সামলাতে পারবে? সেই উত্তর নির্ভর করবে শুধু দ্য হেগের আদালতের রায়ের ওপর নয়, বরং ভারত ও পাকিস্তান ভবিষ্যতে আলোচনার টেবিলে ফিরতে পারে কি না, তার ওপরও। সূত্র: কালেরকন্ঠ

  • সর্বশেষ