দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগারটি ১৯৬৮ সালে তৈরি হয়। ৫৮ বছর পর অবশেষে শুরু হতে যাচ্ছে দেশের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার নির্মাণকাজ। ৩০ লাখ টন শোধন সক্ষমতার এ শোধনাগার চালু হলে দেশের ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটানো যাবে। এতে ডিজেল, অকটেনের মতো পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানির পরিমাণ কমে আসবে, কমবে খরচ।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, তেল শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল অর্থায়ন নিশ্চিত করা। গতকাল বৃহস্পতিবার ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। চুক্তির অধীন এ প্রকল্পে ১০০ কোটি ডলার বা ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে) অর্থায়ন করবে তারা। আগামী ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
বর্তমানে ১৫ লাখ টন সক্ষমতার একমাত্র সরকারি পরিশোধনাগারটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায়। এটি পরিচালনা করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। একই এলাকায় দ্বিগুণ সক্ষমতার দ্বিতীয় শোধনাগারটি নির্মাণ করা হবে। প্রকল্প অনুমোদনের ছয় মাস পর গত বুধবার জ্বালানি বিভাগের একজন যুগ্ম সচিবকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে কখনো সরকারি অর্থায়নে, কখনো বিদেশি ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা বলে দেড় দশক পার হয়ে গেছে। ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল-২’ নামে প্রকল্পটি প্রথম নেওয়া হয় ২০১২ সালে। এরপর অন্তত ১১ বার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধিত হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি; বরং প্রতিবার খরচ বেড়েছে। ২০২৪ সালে এটি চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম বা এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দেয় আওয়ামী লীগ সরকার।
বর্তমানে ১৫ লাখ টন সক্ষমতার একমাত্র সরকারি পরিশোধনাগারটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায়। এটি পরিচালনা করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আগের প্রকল্পটি বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রকল্পটির নাম পরিবর্তন করে মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইআরএল নাম দেওয়া হয়। গত ১০ ফেব্রুয়ারি একনেক থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হবে ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি কোষাগার থেকে ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা ও ১২ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বিপিসির মাধ্যমে অর্থায়ন হবে বলে ধরা হয়েছিল।
বিএনপি সরকার এসে অর্থায়নের ধরন বদল করে বিদেশি অর্থায়নে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। গতকাল সেই অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও আইডিবি গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে অর্থায়নের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাসসের খবরে বলা হয়, অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি নতুন সরকার এসেছে এবং বাংলাদেশের একটি নতুন দিকনির্দেশনা রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য, ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়া। এটি কোনো স্লোগান নয়, এটি একটি পরিকল্পনা। আমরা এই দশকে রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করতে চাই।’
জ্বালানি তেল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার আলোচনায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। শোধনাগার নির্মাণে বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ায় এ খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ রাখার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এটা স্বস্তির খবর, ভোক্তা এর সুফল পাবে। প্রকল্পের কাজ যাতে কোনোভাবে ব্যাহত না হয় এবং নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে-----জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম
বাংলাদেশ সচিবালয়ে আয়োজিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান ও আইডিবির পক্ষে সংস্থাটির ডিরেক্টর জেনারেল (কান্ট্রি প্রোগ্রামস) আনাসি আইসামি চুক্তিতে সই করেন।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নিজেদের টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গেলে বাজেটের ওপর চাপ পড়বে। তাই সরকার প্রকল্পটি বিদেশি ঋণে বাস্তবায়ন করছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি তেল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার আলোচনায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। শোধনাগার নির্মাণে বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ায় এ খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ রাখার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এটা স্বস্তির খবর, ভোক্তা এর সুফল পাবে। প্রকল্পের কাজ যাতে কোনোভাবে ব্যাহত না হয় এবং নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্র: প্রথম আলো