বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। চীন থেকে বাংলাদেশ প্রথম যে যুদ্ধবিমান কিনেছিল, এর আনুষ্ঠানিক নাম এফ-৬। ১৯৭৭ সালে চীন থেকে এসব যুদ্ধবিমান কিনেছিল বাংলাদেশ।
ঢাকার বিজয় স্মরণী থেকে জিয়া উদ্যানের দিকে গেলে রাস্তার মোড়ে মাঝারি আকারের যে যুদ্ধবিমান চোখে পড়বে, সেটি এ ধরনের বিমান। বিমানটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর এটিকে উন্মুক্ত প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়।
আনুষ্ঠানিক নাম এফ-৬ হলেও চীনে বিমানটি পরিচিত জে-৬ নামে।
বাংলাদেশ এখন চীন থেকে আধুনিক প্রযুক্তির নতুন যে যুদ্ধবিমান কিনতে যাচ্ছে, সেটির নাম জে-১০ সিই।
সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে আলোচিত এই যুদ্ধবিমানটি দিয়েই পাকিস্তান তার প্রতিপক্ষ ভারতের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির রাফাল বিমান ভূপাতিত করার দাবি করে।
রাফাল ফ্রান্সের তৈরি ৪.৫ জি প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান।
রাফাল ভূপাতিত করার দাবি নিয়ে সে সময় আলোচনা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও চীনের জে-১০ বিমান নিয়ে খবর ও বিশ্লেষণ উঠে আসে।
বাংলাদেশ এখন বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের কথা বলছে। সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে চীনের এই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান জে-১০ কেনার ওপর।
বলা হচ্ছে, ইতোমধ্যে এই বিমান কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে গেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের পরিকল্পনায় শুধু কি যুদ্ধবিমানই যথেষ্ট?
আকাশ প্রতিরক্ষা, প্রশিক্ষণ, যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ এবং অবকাঠামো বিবেচনায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?
আর চীনের এই যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতায় কতটা পরিবর্তন আনবে?
বাংলাদেশের প্রথম যুদ্ধবিমান কোন দেশের?
বাংলাদেশ ১৯৭৭ সালে চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনে, এটা ঠিক। তবে দেশটির প্রথম যুদ্ধবিমানের বহর এসেছিল আরও কয়েক বছর আগে, ১৯৭৩-৭৪ সালে।
তখন বাংলাদেশকে বিনামূল্যে যুদ্ধবিমান উপহার দিয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন।
সেটি ছিল তখনকার অত্যাধুনিক সুপারসনিক যুদ্ধবিমান মিগ-২১।
“এগুলো ছিল একেবারে ফ্যাক্টরি ফ্রেশ। কারখানা থেকে বের হয়েই আমরা পেয়েছিলাম। মানে রাশিয়ান বিমানবাহিনীর বাইরে আমরাই প্রথম পেয়েছিলাম। এমনকি ভারতও আমাদের কয়েক বছর পর মিগ-২১ পেয়েছিল। তখনকার এই অত্যাধুনিক বিমান আমাদের অনেক এগিয়ে দিয়েছিল,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী। তিনি তখন বিমানবাহিনীর একজন তরুণ অফিসার ছিলেন।
“শুধু যুদ্ধবিমান নয়, এর সঙ্গে যত ধরনের মিসাইল, বোমা, রকেট—সব আমাদের দিয়েছিল। তখন থেকেই বিমানবহর শুরু হলো বলা যায়। তখন তো আমাদের কিছুই ছিল না। যুদ্ধের পর এয়ারফিল্ডগুলো মেরামত হচ্ছিল। এমনকি ব্যাচের পর ব্যাচ প্রশিক্ষণের জন্য রাশিয়া পাঠানো হয়েছিল,” যোগ করেন ইশফাক ইলাহী চৌধুরী।
বাংলাদেশের বিমানবাহিনীতে এখন কী আছে?
বাংলাদেশ প্রথম যুদ্ধবিমান পায় সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। সেটি ছিল মিগ-২১।
এরপর বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান সংগ্রহের মূল উৎস পরিবর্তিত হয়ে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
১৯৭৭ সালে চীন থেকে এফ-৬, এরপর আশির দশকে আনা হয় এফ-৭।
বাংলাদেশ এরপরও যুদ্ধবিমান কিনেছে। তবে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে একটি বড় পরিবর্তন আসে ১৯৯৯ সালে।
তখন রাশিয়া থেকে আটটি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান কেনে বাংলাদেশ। সেগুলো ছিল সে সময়ের পৃথিবীর অন্যতম সেরা আকাশ প্রতিরক্ষা ফাইটার জেট।
তবে ২০২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর বহর বেশ পুরোনো হয়ে পড়েছে। একটি অংশ এখন অচল, আরেকটি অংশ পুরোনো হয়ে অচল হওয়ার পথে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের বিমানবহরে এখন আসলে কী আছে? সরকারিভাবে অবশ্য এর কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয় না।
তবে সামরিক তথ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ওয়ারপাওয়ার বাংলাদেশ’-এর হিসাবে এর একটি চিত্র পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর বহরে এখন বিমান আছে ২১২টি। এর মধ্যে যুদ্ধবিমান রয়েছে ৪৪টি।
এই ৪৪টি যুদ্ধবিমানের মধ্যে রাশিয়ার মিগ-২৯ আছে আটটি। আর চীনের নির্মিত এফ-৭ যুদ্ধবিমান ৩৬টি। এই মডেলগুলো কিছুটা পুরোনো।
এ ছাড়া আছে ১৪টি ইয়াক-১৩০ বিমান, যেগুলো প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হলেও হালকা আক্রমণ চালানোর উপযোগী। রাশিয়া থেকে বিমানগুলো কেনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী।
চীনের এফটি-৭ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের লকহিডের দুটি সিরিজের কৌশলগত পরিবহন বিমানও আছে বাহিনীতে।
বিমানবাহিনীর বহরে ৭৩টি হেলিকপ্টার রয়েছে বলেও ‘ওয়ারপাওয়ার বাংলাদেশ’-এ তথ্য দেওয়া আছে। এর মধ্যে রাশিয়ার এমআই সিরিজের ৩৬টি হেলিকপ্টার রয়েছে।
আর যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত সেসনা, বেলসহ বিভিন্ন মডেলের হেলিকপ্টার আছে ২৪টি।
এর পাশাপাশি ফ্রান্স, ইতালি ও চেকোস্লোভাকিয়া (চেক রিপাবলিক) থেকে কেনা কিছু প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টারও ব্যবহার করে বাংলাদেশ।
এ ছাড়া বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর কাছে ৪৪টি ড্রোন রয়েছে বলে জানাচ্ছে ওয়েবসাইটটি। এর মধ্যে ৩৬টিই স্লোভেনিয়ায় নির্মিত ব্রামর সি-৪ আই।
তুরস্কের তৈরি বায়রাক্তার টিবি-২ আছে ছয়টি। গত বছরই এগুলো যুক্ত হয়।
“বাংলাদেশের মিগ-২৯ একটু আধুনিক। কিন্তু সেটাও এখনকার যুগে পুরোনো। এর বাইরে আমাদের বাকি যা আছে, সবগুলো আরও পুরোনো থ্রি-জি প্রযুক্তির। অথচ এখন যে যুদ্ধ হচ্ছে, সেখানে ৪.৫-জি, এমনকি ৫-জি প্রযুক্তির স্টেলথ বিমানও ব্যবহার হচ্ছে। সুতরাং বাংলাদেশের বিমানবহর আধুনিকায়ন করার বিকল্প ছিল না। এখন চীন থেকে যে বিমানগুলো আনা হচ্ছে, সেগুলো আধুনিক ৪.৫-জি প্রযুক্তির। সুতরাং এটা একটি ভালো সিদ্ধান্ত,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বিমানবাহিনীর সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল এম আবুল বাশার।
শুধু যুদ্ধবিমান কেনাই কি যথেষ্ট?
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীনের ২০টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ। এগুলোকে বলা হচ্ছে মাল্টিরোল ফাইটার জেট।
অর্থাৎ বিমানগুলো আকাশ প্রতিরক্ষায় একই সঙ্গে বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী। যেমন—
এয়ার-টু-এয়ার সাপোর্ট: অর্থাৎ এটি আকাশসীমায় শত্রুবিমানকে প্রতিরোধ করতে ব্যবহার করা যায়।
এয়ার-টু-গ্রাউন্ড: অর্থাৎ শত্রু দেশের মাটিতে কোনো টার্গেট থাকলে সেখানে বোমাবর্ষণে দক্ষ।
ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট: অর্থাৎ সেনাবাহিনী কোথাও যুদ্ধরত থাকলে এই বিমান সেখানে গিয়ে তাদের সহায়তা করতে পারে।
মেরিটাইম এয়ার সাপোর্ট: অর্থাৎ সমুদ্রে নৌবাহিনীকে সহায়তা দেওয়া।
“এই একটা বিমান, যেটা আমরা কিনতে যাচ্ছি, এটা একাই সব ধরনের কাজ করতে পারে,” বলেন বিমানবাহিনীর সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল এম আবুল বাশার।
তিনি এটাও বলেন যে, আধুনিক যুদ্ধপরিস্থিতিতে শুধু যুদ্ধবিমানই যথেষ্ট নয়। রাডার, জ্যামিং প্রযুক্তি, মিসাইলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার দেখা যায়। এ ছাড়া বিমান, নৌ ও সেনাবাহিনীর অস্ত্র-সরঞ্জামের মধ্যে একধরনের ‘রিয়েল টাইম’ সমন্বয়ের ওপরও যুদ্ধের সফলতা নির্ভর করছে।
সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল এম আবুল বাশার অবশ্য বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বাংলাদেশ শুধু যুদ্ধবিমান কিনছে না, বরং এর সঙ্গে ‘ফুল প্যাকেজ’ আনা হচ্ছে।
“এটা আসলে একটা ফুল প্যাকেজ। শুধু এয়ারক্রাফট কিনলে তো হবে না। এখানে স্পেয়ার পার্টস থাকে, মেইনটেন্যান্স থাকে, এসবের জন্য ১০ বছরের একটা কন্ট্রাক্ট থাকে। প্লাস এর সঙ্গে বাড়তি ইকুইপমেন্ট নেওয়া হয়—সামনে কী সিনারিও হতে পারে, কী কী লাগতে পারে, সেটা হিসাব করে।”
“এই এয়ারক্রাফটে জ্যামার তো ইনবিল্ট থাকবে, রাডার থাকবে। এর সঙ্গে সার্ভেইল্যান্স ক্যাপাসিটি চাইলে সেটা নেওয়া যায়। এগুলোর জন্য আলাদা ইকুইপমেন্ট প্যাকেজে থাকে। আরও থাকে মিসাইল, অর্থাৎ লং রেঞ্জ মিসাইল, যেটা হচ্ছে বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ। চোখে দেখা যায় না, কিন্তু টার্গেট করে হামলা করা যায়। পাকিস্তান এটা ভারতের সঙ্গে ব্যবহার করে সফলতা পেয়েছে। সেই একই এয়ারক্রাফটই তো আমরা কিনছি,” তিনি বলেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশে এখন আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য ‘গ্রাউন্ড বেইজড রাডার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা’ সম্প্রতি চালু হয়েছে বলে বিবিসিকে জানান মি. বাশার।
এটি শত্রু বিমান আক্রমণের আগাম সতর্কতা দেবে এবং টার্গেট নির্ধারণ করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
“আমরা এখন এয়ারক্রাফটের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থাটা নিয়ে আসব এবং এটা সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করব। এ ছাড়া আমাদের কাছে ড্রোন আছে। আমরা ইতোমধ্যে চীনের সঙ্গে চুক্তি করেছি। আমাদের কেনা এয়ারক্রাফটগুলো রাডার ব্যবস্থা থেকে যে ছবি পাবে, সেটার ভিত্তিতে এই ড্রোনগুলোকে গাইড করে নির্দিষ্ট দিকে পাঠাতে পারবে।”
অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান পরিচালনার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আছে?
সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধবিমান থাকলেই হয় না। এগুলো পরিচালনার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো লাগে।
তাছাড়া বিমানগুলোকে কোথায়, কীভাবে রাখা হবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিমান ওড়ার আগে, অর্থাৎ মাটিতে থাকার সময়ই যদি শত্রুপক্ষের আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সেই বিমান কোনো কাজে লাগবে না। ফলে বিমানগুলোকে লুকিয়ে রাখা এবং এর জন্য শক্ত অবকাঠামো দরকার হয়।
একই সঙ্গে দরকার হয় একাধিক রানওয়ে। কারণ রানওয়ে ধ্বংস হলে বিমান তখন আর উড্ডয়নের সুযোগ পাবে না।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঠিক একই পরিস্থিতিতে পড়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। সেই সময় ডিসেম্বরের শুরুতে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোমা হামলায় তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়েতে বড় বড় গর্ত বা ফাটল তৈরি হয়।
যার ফলে পাকিস্তানি বিমানগুলোর পক্ষে উড্ডয়ন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
রানওয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে পাকিস্তানের ১৪ নম্বর স্কোয়াড্রনের অত্যাধুনিক স্যাবর ফাইটার জেটগুলো মাটির ওপর একরকম অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
বিমানগুলো ভারতীয় বিমানের সহজ টার্গেটে পরিণত হয় এবং মাটিতে থাকা অবস্থাতেই ধ্বংস হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিমান পরিচালনা বা সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কী আছে?
এমন প্রশ্নে বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী অবকাঠামোগত দুর্বলতা আছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানান।
“আমাদের বিমানবাহিনীর সবচেয়ে বড় একটি সমস্যা হচ্ছে যে, এর নিজস্ব কোনো এয়ারফিল্ড নেই। আমাদের প্রত্যেকটি এয়ারফিল্ড, যেগুলো আমরা এখনো ব্যবহার করছি, যেমন—ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর—এগুলো বেসামরিক যানবাহনের সঙ্গে মিলে ব্যবহার করছি। যশোরে বেসামরিক ব্যবহার কম। কিন্তু সেটা আবার ভারতীয় সীমান্তের খুব কাছে। আর ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তো সামরিক-বেসামরিক বিমান, হেলিকপ্টার—সবই চলাচল করে।”
এ ছাড়া যুদ্ধবিমান লুকিয়ে রাখার জন্য কংক্রিটের শক্ত অবকাঠামোও সেভাবে নেই বলে জানান তিনি।
“এগুলো খুব ব্যয়বহুল। বোমার বিরুদ্ধে টিকে থাকার উপযোগী করে বানাতে হয়। সুতরাং খরচ অনেক বেশি। কিন্তু এগুলো আমাদের বানাতে হবে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া আলাদা অন্তত একটি বিমানঘাঁটি দরকার, যেটা সামরিক ডিজাইন মেনে সামরিক ব্যবহারের জন্য থাকবে। সেখানে মাল্টিপল রানওয়ে থাকবে, যেন একটি রানওয়ের ওপর নির্ভরশীল না হয়,” বলেন ইশফাক ইলাহী চৌধুরী।
বাংলাদেশের বর্তমানে যুদ্ধবিমানের জন্য ব্যবহার উপযোগী এয়ারফিল্ড আছে ১৩টি।
“এর মধ্যে সবগুলোকে আমরা হয়তো সব সময় অপারেশনাল রাখতে পারব না। কারণ সেই সক্ষমতা আমাদের নেই। আমাদের এখন চারটি এয়ারবেইজ—ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, কক্সবাজার—এই চারটি থেকে সহজেই অপারেট করতে পারি। আরও ২/৩টি এয়ারফিল্ড আছে, যেগুলো আমরা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারি। এই রানওয়েগুলোকে অ্যাকটিভ রাখতে হবে।”
বলেন সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল এম আবুল বাশার। একই সঙ্গে তিনি জোর দেন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর।
তিনি বলেন, “আমাদের হার্ড এয়ারক্রাফট শেল্টার থাকতে হবে। বিপদের সময় যেন লুকিয়ে রাখা যায় কিংবা কন্টিনিউয়াস মুভমেন্টে রাখা যায়। এ ছাড়া ঘাঁটিগুলোতে আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম থাকতে হবে, যেন শত্রু বিমান আসার খবর পেলেই বিমানগুলো আকাশে উঠে যেতে পারে। এটাতে আমাদের হয়তো শতভাগ সক্ষমতা নেই। কিন্তু অন্তত ৫০ থেকে ৬০ ভাগ সক্ষমতা আছে আমাদের।”
চীনা নির্ভরতার কারণ কী?
বাংলাদেশ বহুমাত্রিক সামরিক সক্ষমতা তৈরি করতে চায়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এর জন্য দেশটি মূলত চীনা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে শুরু করে রণতরী কিংবা সেনাবাহিনীর ট্যাংক, সাঁজোয়া যান থেকে শুরু করে আকাশ প্রতিরক্ষা—সবকিছুর বড় অংশই আসে চীন থেকে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে সাবমেরিন রয়েছে দুটি। দুটিই চীনের তৈরি এবং ২০১৭ সালে এগুলো নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়।
এ ছাড়া গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে সব মিলিয়ে নৌযান রয়েছে ১১৭টি। এর মধ্যে সাতটি ফ্রিগেট বা রণতরী আছে বাংলাদেশের।
সঙ্গে আরও আছে ছয়টি কর্ভেট যুদ্ধজাহাজ। কর্ভেট জাহাজগুলোর মধ্যে চারটি চীনের, দুটি যুক্তরাজ্যের।
ফ্রিগেটগুলোর চারটির নির্মাতা চীন, দুটির যুক্তরাষ্ট্র এবং একটি দক্ষিণ কোরিয়ার।
কিন্তু চীন কীভাবে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের প্রধান উৎস হয়ে উঠল?
এর কয়েকটি কারণ আছে—
প্রথমটি হচ্ছে, কম টাকায় আধুনিক অস্ত্র। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, চীনের যুদ্ধবিমানগুলোর সমমানের যেসব বিমান ইউরোপ বা আমেরিকায় আছে, সেগুলোর তুলনায় চীনের যুদ্ধবিমানগুলো “অর্ধেকের কম বা ওয়ান-থার্ড খরচে পাওয়া সম্ভব”।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে, প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত-মিয়ানমারের থেকে ভিন্ন ধরনের বিমান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা। যেটা বাংলাদেশকে কৌশলগত সুবিধা দেবে। ভারত ও মিয়ানমার—দুটি দেশই রাশিয়ার তৈরি বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে। বাংলাদেশ ভিন্ন ধরনের বিমান ব্যবহার করলে সেটা দুই দেশের কাছেই ‘অচেনা’ থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
তৃতীয় কারণ হচ্ছে, চীন-বাংলাদেশ দুই দেশের ধারাবাহিক উষ্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক।
আর চতুর্থটি হচ্ছে, চীনা অস্ত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো শর্তের বেড়াজাল নেই।
“ইউরোপ বা আমেরিকা কিন্তু শর্ত দেয়—কার বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন, কখন ব্যবহার করছেন। যেমন পাকিস্তান এফ-১৬ যুদ্ধবিমান কিনেছে। তারা কিন্তু এটা ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে না। যেখানে এফ-১৬ আছে, এরকম প্রত্যেক ঘাঁটিতেই আমেরিকার লোক আছে। তারা সর্বক্ষণ মনিটর করে। কিন্তু চীন এরকম কোনো শর্ত দেয় না,” বলেন ইশফাক ইলাহী চৌধুরী।