ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশটির মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এ নতুন চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে দুই হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ করিডোরে ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কটি জাতীয় মহাসড়ক-২৭-এর (এনএইচ২৭) সমান্তরালে নির্মাণ করা হবে। খবর দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) এক ফেসবুক পোস্টে ভারতের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়কমন্ত্রী নিতিন গড়করি জানান, নতুন সড়ক নির্মাণে দুই হাজার ৭৭ কোটি ১৮ লাখ রুপি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সড়কটি পশ্চিমবঙ্গের বাগডোগরা থেকে বিহারের গলগালিয়া পর্যন্ত পানিটাঙ্কি ও খড়িবাড়ি হয়ে যাবে।
৩১ দশমিক দুই কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির নাম হবে জাতীয় মহাসড়ক-৩২৭ (এনএইচ৩২৭)। এটি এনএইচ২৭ থেকে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রেখে নির্মাণ করা হবে।
‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডোরটি প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ। সবচেয়ে সরু অংশে এর প্রস্থ মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার। নেপাল ও বাংলাদেশের মাঝখানে অবস্থিত এই সরু ভূখণ্ডই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশটির বাকি অংশের একমাত্র স্থল যোগাযোগপথ। একই সঙ্গে এটি চীন ও ভুটান সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গড়করি বলেন, ‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরের ওপর দিয়ে নির্মিত এই প্রকল্প উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ শক্তিশালী করার পাশাপাশি নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের দিকে যাতায়াত ব্যবস্থাও উন্নত করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত হলে বাগডোগরা, নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি ও পানিটাঙ্কি এলাকায় যানজট কমবে। পাশাপাশি বাগডোগরা বিমানবন্দর এবং আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে। কৃষি, উদ্যানজাত পণ্য, চা ও অন্যান্য স্থানীয় পণ্য দ্রুত বড় বাজারে পৌঁছানোর সুযোগও তৈরি হবে।’
বিহারের কিষানগঞ্জ জেলার গলগালিয়া এবং দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার পানিটাঙ্কি এই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রান্ত। পানিটাঙ্কি নেপালে যাতায়াতের অন্যতম জনপ্রিয় ট্রানজিট রুট।
প্রকল্পের আওতায় তিনটি বড় সেতু, একটি রোড ওভারব্রিজ, পাঁচটি হাতি চলাচলের আন্ডারপাস এবং মহাসড়কের দুই পাশে সার্ভিস রোড নির্মাণ করা হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা ও অবকাঠামো জোরদারে আরও তৎপর হয়েছে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার। করিডোরটিতে প্রতিরক্ষা স্থাপনা বাড়ানোর পাশাপাশি যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বারাণসী থেকে নিউ জলপাইগুড়ি (এনজেপি) পর্যন্ত একটি দ্রুতগতির রেল করিডোর নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শিলিগুড়ির কাছে ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। মালদা থেকে এনজেপি পর্যন্ত চতুর্থ রেললাইন স্থাপনের অনুমোদনও দিয়েছে ভারতের রেল মন্ত্রণালয়।
অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা কর্মকর্তা টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়াকে বলেন, এনজেপির সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের রেল যোগাযোগের মতো এনএইচ২৭ শিলিগুড়ি ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ভারতের মূল ভূখণ্ডের প্রধান সড়ক যোগাযোগ। এখন বিহারের গলগালিয়া থেকে ‘চিকেনস নেক’ হয়ে দ্বিতীয় ও সমান্তরাল একটি মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পেছনে কৌশলগত কারণও থাকতে পারে।
এদিকে বাগডোগরা বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নেও কাজ করছে ভারতীয় সরকার। আলিপুরদুয়ার জেলার হাসিমারা থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে।
নতুন মহাসড়ক প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পাঁচটি হাতি চলাচলের আন্ডারপাস। এনএইচ৩২৭-এর যে অংশটি কার্শিয়াং বন বিভাগের মধ্য দিয়ে যাবে, সেখানে কয়েকটি এলাকাকে ‘হাতি চলাচল অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সড়কটির নিচ দিয়ে হাতি চলাচলের জন্য আলাদা পথ নির্মাণের দাবি জানিয়েছিল বন বিভাগ। এক জ্যেষ্ঠ বন কর্মকর্তা বলেন, ধান কাটার মৌসুমে এসব এলাকায় হাতির চলাচল সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
তিনি বলেন, পাঁচটি আন্ডারপাস নির্মাণ হলে দ্রুতগতির যানবাহনের ধাক্কায় হাতি আহত বা নিহত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তা মহাসড়ক প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শিলিগুড়ি করিডোরের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় এই প্রকল্পের তাৎপর্য শুধু আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক অবকাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে প্রয়োজনীয় পণ্য, সেবা ও মানুষের চলাচল আরও সহজ করবে।
সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া ও এনডিটিভি