চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'-এর হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বন্দরে নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে এ সময় বন্দরের কার্যক্রমে কেউ বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) চুক্তি স্বাক্ষরের নির্ধারিত দিনের এক দিন আগে বুধবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক জরুরি চিঠিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রম পুরোপুরি সচল রাখতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) সব বিভাগীয় প্রধানকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। সিপিএর পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, 'পরিচালন কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করা হলে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে এবং আইন ও বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।'
একটি বিদেশি অপারেটরের কাছে এনসিটি টার্মিনাল হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বন্দর শ্রমিক, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এবং বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদের মুখেই এই নির্দেশনা জারি করা হলো। একাধিক শ্রমিক ও কর্মচারী সংগঠন ইতিমধ্যে এই চুক্তির বিরোধিতায় বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে বিদেশি অপারেটরের কাছে এনসিটি এবং ওভারফ্লো কন্টেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি।
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে জানানো হয়, এনসিটি পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিটি বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। ফলে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। মন্ত্রণালয় এটিকে একটি জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করে শৃঙ্খলা এবং নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করতে বলেছে। এই চিঠিটি সিপিএর সব সদস্য, বিভাগীয় প্রধান এবং বন্দর চেয়ারম্যানের একান্ত সহকারীর কাছে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে সুনির্দিষ্ট কোনো দল বা গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ না করা হলেও চলমান তীব্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই এই আইনি ব্যবস্থার কঠোর হুঁশিয়ারি এল।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সবচেয়ে ব্যস্ত কন্টেইনার টার্মিনালটি একটি আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে বন্দর কর্মী ও সংশ্লিষ্ট অংশীদাররা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কন্টেইনার পরিবহনের একটি বড় অংশই এনসিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা।
চলতি সপ্তাহে এই চুক্তির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি ও বেশ কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন চট্টগ্রামে সমাবেশ ও মশাল মিছিল করেছে। এ ছাড়া 'বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ' বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে।
আন্দোলনকারীরা এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানিয়ে বলছেন, এটি একটি কৌশলগত জাতীয় সম্পদ এবং এর নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকা উচিত। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে প্রস্তাবিত এই চুক্তির ফলে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা পরিবর্তিত হলে নিজেদের চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বন্দর শ্রমিকদের মধ্যেও গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে সরকারের অবস্থান হলো, একটি অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর যুক্ত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শক্তিশালী হবে। ১৫ বছরের এই চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের এই সর্বশেষ নির্দেশনার মাধ্যমে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বন্দর প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে; যাতে কোনো ধরনের প্রতিবাদ বা কর্মকাণ্ড পণ্য খালাস, জাহাজের চলাচল বা অন্যান্য জরুরি সেবাকে ব্যাহত করতে না পারে।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড