রাজধানী থেকে জেলা শহর- কথায় কথায় গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটছে। মাদক কারবার, আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, দখল, চাঁদাবাজি, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার বেড়েছে। গুলিতে প্রাণহানির পাশাপাশি আহত হচ্ছেন অনেকে। খুনোখুনির পাশাপাশি অস্ত্রের মুখে ছিনতাই, অপহরণ ও ভয় দেখাতে ফাঁকা গুলি ছোড়ার ঘটনাও ঘটছে। গতকাল পর্যন্ত অক্টোবর মাসের ৩০ দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে অন্তত ২৭টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় একজন সাংবাদিকসহ অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। এসব গুলির ঘটনা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ।
২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর থানা ফাঁড়িসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। এখনও লুণ্ঠিত সহশ্রাধিক অস্ত্র উদ্ধারের বাইরে রয়েছে। আবার অন্তত ৩০টি সীমান্ত পয়েন্ট থেকে প্রতিনিয়ত অস্ত্র ঢুকছে দেশে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ দাগি অপরাধীদের বেশিরভাগ কারাগার থেকে বেরিয়ে যায়। তারা নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার খুনোখুনিতে লিপ্ত। বিশেষ অভিযান চললেও এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা থামছেই না। নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বে গুলি ছুড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা; চাঁদা না পেয়ে, অবৈধ ব্যবসা দখল করতেও ছোড়া হচ্ছে গুলি। গুলি হচ্ছে হাট বাজার ও বালু মহালের ইজারা ও দখল নিয়ে। মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থেকেও একে অপরের দিকে গুলি ছুড়ছে। মোটকথা ‘কথায় কথায়’ গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাবনায় হাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বে দুবর্ৃৃত্তদের গুলিতে দু’জন নিহত হন। নিহতরা হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ শ্রমিক লীগের পাবনা সদর উপজেলার আহ্বায়ক আবদুস সালাম (৫৬) ও তার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে আতাইকুলা ইউনিয়ন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি রিপন হোসেন (৩৫)।
পাবনার ঘটনার এক দিন আগে গত বুধবার লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পার্বতীনগর ইউনিয়নের দিলসাদপুর গ্রামে মাটির ব্যবসা কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের গুলিতে খোরশেদ আলম (৪৫) নিহত হন। এর আগের দিন রাজবাড়ী, খুলনা ও চট্টগ্রামে গুলি, ছিনতাই এবং অস্ত্রের মুখে লুটের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা বলছে, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার শুধু হত্যাকা-ে সীমাবদ্ধ নেই; আধিপত্য বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটন ও প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
এদিকে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কতটা কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে শুধু বিচ্ছিন্ন হত্যাকা-ের তদন্ত নয়, অস্ত্রের উৎস শনাক্ত, নিয়মিত উদ্ধার অভিযান এবং বিরোধের জেরে সশস্ত্র হামলা ঠেকাতে সমন্বিত উদ্যোগই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, অবৈধ অস্ত্রের উৎস ও সরবরাহকারী চক্র শনাক্ত করে ব্যালিস্টিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন ঘটনার যোগসূত্র খুঁজতে হবে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও দখলকেন্দ্রিক সংঘাতপ্রবণ এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে নিরপেক্ষভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত তদন্ত, সাক্ষীর নিরাপত্তা, বিচার নিশ্চিত করা এবং অস্ত্র চোরাচালান রোধে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, বহুমাত্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ বন্ধ ও অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে। তা না হলে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না।
পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার এআইজি কামারুম মুনিরা বলেন, অবৈধ অস্ত্রধারী, মাদক ব্যবসায়ী ও কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা রোধে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারেও পুলিশের সব ইউনিট বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
একের পর এক হত্যাকা- : ২ অক্টোবর নরসিংদী শহরের চৌয়ালা এলাকায় বাড়িতে ঢুকে আবদুল্লাহ বাবু (২৬) নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। আধিপত্য বিস্তার ও পূর্বশত্রুতার জেরে এ ঘটনা ঘটে। তার বড় ভাইসহ দুজন ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন।
৪ অক্টোবর খুলনার দিঘলিয়ায় চায়ের দোকানে গুলিতে নিহত হন নাসিমুল করিম (৫৫)। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তিনি পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ) সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আধিপত্য বিস্তার কিংবা চরমপন্থি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এ হত্যার কারণ হতে পারে বলে ধারণা পুলিশের।
৫ অক্টোবর খুলনার রূপসায় ছেলে জয় ঢালী হত্যার দেড় মাস পর গুলিতে নিহত হন তার বাবা আক্তার ঢালী। পরিবারের অভিযোগ, ছেলের হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে এসে তাকে হত্যা করেছেন। ১২ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সাহেব আলী নামে এক ব্যক্তি। এ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত হিসেবে রনিকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
১৬ অক্টোবর রাতটি ছিল সহিংসতায় উদ্বেগজনক। রাজবাড়ীতে পিয়ারুল সরদার নামে এক ব্যক্তিেেক গুলি করে হত্যা করা হয়। একই রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দোকানে বসে থাকা সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন তিনি।
একই রাতে চট্টগ্রামের সীতাকু-ে স্ক্র্যাপ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুলিতে নিহত হন যুবদল কর্মী তারেক হোসেন। তার সঙ্গে থাকা ইমন নামে আরেকজন গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার এবং একটি এলজি, একটি রিভলবার ও একটি পিস্তল উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ।
১৭ অক্টোবর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে দোকানে ঢুকে জামায়াত কর্মী মিজানুর রহমানকে গুলি করে মুখোশধারীরা। এর আগে সেখানে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ২২ অক্টোবর খুলনার পূর্ব বানিয়াখামারে গুলিতে নিহত হন তাওহিদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি।
ছিনতাই ও আতঙ্ক ছড়াতেও অস্ত্র : ৯ অক্টোবর গাজীপুরের শ্রীপুর-গোসিংগা সড়কে বিকাশের এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের টাকা বহনকারী গাড়িতে গুলি চালিয়ে প্রায় তিন কোটি টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। হামলায় প্রতিষ্ঠানটির এক হিসাব ব্যবস্থাপক গুলিবিদ্ধ হন। প্রায় ১০টি মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা গাড়ি থামিয়ে কাচ ভেঙে টাকার তিনটি বস্তার মধ্যে দুটি নিয়ে পালিয়ে যায়।
২৪ অক্টোবর ভোরে রাজধানীর মগবাজারে সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। ওই সময় গাড়িতে তিনি ছিলেন না। একই দিনে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে দোকানে বসে থাকা জামালউদ্দিনকে গুলি করে আহত করে দুই মোটরসাইকেল আরোহী। খুলনায় ক্লিনিকে হামলা ও ভাঙচুরের পর আতঙ্ক ছড়াতে ফাঁকা গুলি ছোড়ার ঘটনাও ঘটে।
২৭ অক্টোবর রাজবাড়ীতে ব্যবসায়ী নেতা আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে তিনটি গুলি ছোড়া হয়। একটি গুলি তার ডান হাতে লাগে। একই দিন খুলনার নিরালায় সিগারেট কোম্পানির এক কর্মীকে গুলি করে তার ল্যাপটপের ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। খুলনার বটিয়াঘাটায় যুবদলের সাবেক নেতা অহিদুল ইসলাম ওরফে বাদলও গুলিবিদ্ধ হন। চট্টগ্রামের রাউজানে জমি কেনার ২৫ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার সময় এক নারীর পথ আটকে অস্ত্রের মুখে ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
এর আগে ২০ অক্টোবর কক্সবাজারের টেকনাফে ফাঁকা গুলি ছুড়ে মো. রফিক নামে একজনকে অপহরণ করে অস্ত্রধারীরা। ১৮ অক্টোবর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে গুলিতে আহত হন দোকানকর্মী সুজন পাল। ২৬ অক্টোবর খুলনার বটিয়াঘাটায় গুলিবিদ্ধ হন যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল শেখ।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, দেশের তিন মহানগর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। খুলনায় গত ১০ মাসে ৭১টি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। এর একটি বড় অংশই হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে। চট্টগ্রামে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার লেগেই আছে। ঢাকাতেও সাম্প্রতিক সময়ে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে।
সূত্র : দৈনিক আমাদের সময়