উচ্চমূল্যের চন্দন কাঠের বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করছে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) গবেষণা। শ্বেতচন্দনের চারা উৎপাদন ও বাগান তৈরির পদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় অগ্রগতি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
লালচন্দন নিয়েও গবেষণা শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চন্দন চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
তবে চন্দন কাঠ সংগ্রহের উপযোগী হতে প্রায় ২০ বছর সময় লাগায় বাণিজ্যিক উৎপাদন থেকে মুনাফা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে চন্দন কাঠের শিল্প গড়ে তোলা এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে ধারাবাহিক গবেষণা, মানসম্মত চারা উৎপাদন, যথাযথ বাগান ব্যবস্থাপনা ও বাজার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
২০ বছরের অপেক্ষা, বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
বিএফআরআই ২০১৭ সালে চন্দন নিয়ে গবেষণা শুরু করে এবং ২০২২ সালে ১০০টি শ্বেতচন্দন গাছের বাগান গড়ে তোলে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নার্সারিতে ৫০০টির বেশি চারা রয়েছে। প্রতিবছর ১০ টাকা দরে ৪০০ থেকে ৫০০টি চারা বিক্রি করা হয়।
শ্বেতচন্দন গাছ পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সের পর বীজ দিতে শুরু করে। তবে চারা উৎপাদনের জন্য অন্তত ১০ বছর বয়সী গাছের বীজকে বেশি উপযোগী মনে করা হয়।
চন্দন কাঠে সুগন্ধ তৈরি হতে ১৬ থেকে ১৭ বছর সময় লাগে। প্রায় ২০ বছর বয়সে কাঠটি সংগ্রহের উপযোগী হয়।
বন গবেষণা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একটি পরিণত গাছ থেকে ৩০০ থেকে ৩৫০ কেজি পর্যন্ত কাঠ পাওয়া যেতে পারে। প্রতি কেজি কাঠের দাম ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এক একর জমিতে প্রায় এক হাজার শ্বেতচন্দন গাছ লাগানো সম্ভব।
তবে দীর্ঘ চাষকাল, উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের সীমিত প্রাপ্যতা, অবৈধ বাণিজ্য এবং পণ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জটিলতা এ খাতের বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক চন্দন সরবরাহের প্রায় ২৫ শতাংশে অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যের প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া নকল বা নিম্নমানের চন্দন তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
লালচন্দন নিয়েও গবেষণা সম্প্রসারণ
বিএফআরআইয়ের গৌণ বনজ সম্পদ বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা ড. শাহ আলম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছেন, শ্বেতচন্দনের চারা উৎপাদন ও বাগান তৈরির পদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় অগ্রগতির পর গত বছর থেকে লালচন্দনের চারা উৎপাদন নিয়েও গবেষণা শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, বাজারে কুঁচ ফল বা রক্তকম্বল গাছের বীজও লালচন্দনের বীজ হিসেবে বিক্রি হয়, যা ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করে। এসব বীজ টকটকে লাল, মসৃণ এবং ডিম্বাকৃতির বা গোলাকার ও চ্যাপ্টা।
শাহ আলম বলেন, শ্বেতচন্দনের জন্য উপযুক্ত কয়েকটি 'হোস্ট প্লান্ট' (পোষক গাছ) শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অড়হর, নিশিন্দা, নিম ও বকুল। চন্দনগাছের শিকড়ের সঙ্গে পোষক গাছের শিকড়ের সংযোগ তৈরি হয়। এর মাধ্যমে চন্দন প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে। বিশেষ করে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের মতো পুষ্টি উপাদান পেতে পোষক গাছ সহায়তা করে।
তিনি জানান, নার্সারিতে চারা উৎপাদন থেকে শুরু করে বাগানের পরিচর্যা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত পোষক গাছ নির্বাচন ও ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) ও ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া চন্দন চাষের জন্য উপযোগী।
তিনি বলেন, চন্দনগাছ পরিণত হওয়া পর্যন্ত পোষক গাছের সহায়তা প্রয়োজন হয়। গাছ প্রায় ৭ থেকে ৮ ফুট উচ্চতায় পৌঁছালে পোষক গাছের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু চারা বিতরণ করলেই হবে না। চারা রোপণের পদ্ধতি, গাছের পরিচর্যা ও দীর্ঘমেয়াদি বাগান ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও কৃষক ও সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়ছে
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও চন্দন চাষে আগ্রহ বাড়ছে। বিএফআরআইয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শ্বেতচন্দনের বাগান গড়ে তুলেছে।
গাজীপুরের পুবাইল রিসোর্ট ক্লাবের হেড অভ সেলস অফিসার মো. সাউজিদ ইসলাম জানান, তিন মাস আগে সরকারি নিয়ম মেনে রিসোর্টের জন্য বিএফআরআই থেকে ১০০টি শ্বেতচন্দনের চারা সংগ্রহ করা হয়।
তিনি বলেন, রিসোর্টের ৪০ বিঘা জায়গার বিভিন্ন স্থানে এসব চারা রোপণ করা হয়েছে। সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে চন্দন কাঠ উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনাও দেখছে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ।
দেশীয় বাজার এখনো আমদানিনির্ভর
দেশে চন্দন চাষের সম্ভাবনা তৈরি হলেও বাজার এখনো প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। মূলত ভারত ও মিয়ানমার থেকে বৈধ ও অবৈধ পথে চন্দন কাঠ দেশে আসে।
প্রায় ৪০ বছর ধরে চন্দন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কাশেম কবিরাজ টিবিএসকে বলেন, চট্টগ্রামের বাজারে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মণ চন্দন কাঠ বিক্রি হয়। ক্রেতারা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ও ধর্মীয় উপাসনার কাজে এসব কাঠ ব্যবহার করেন।
বর্তমানে ১০০ গ্রাম চন্দন কাঠের দাম প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। তবে কাঠের মানভেদে দামের পার্থক্য হয়।
দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার থেকে চন্দন কাঠ সংগ্রহ করেন। মশলা ও ভেষজ পণ্যের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার এই মৌলভীবাজারে ভারত ও মিয়ানমার থেকেও চন্দন কাঠ আসে।
নকল পণ্যও বাজারের অন্যতম উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন গাছের আঁশ বা গুঁড়োর সঙ্গে সুগন্ধি মিশিয়ে চন্দন কাঠ হিসেবে এসব পণ্য বিক্রি করা হয়।
বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ছে
প্রসাধনী, সুগন্ধি, অ্যারোমাথেরাপি ও ওষুধশিল্পে ব্যবহারের কারণে বিশ্বজুড়ে চন্দন কাঠ ও তেলের চাহিদা বাড়ছে।
গ্লোবাল গ্রোথ ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক চন্দন বাজারের মূল্য ছিল প্রায় ৩৯০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালে তা ৪৩০ মিলিয়ন ডলারে এবং ২০৩৫ সালে ৯৩০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত এ বাজারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৯.১৯ শতাংশ।
বিশ্ববাজারে চন্দনের প্রায় ৪৭ শতাংশ ব্যবহার হয় ব্যক্তিগত পরিচর্যা ও প্রসাধনী পণ্যে। প্রিমিয়াম পারফিউমের প্রায় ৩৫ শতাংশে চন্দনকে মূল সুগন্ধি উপাদান বা 'বেস নোট' হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা, ধর্মীয় সামগ্রী, ধূপ, ভাস্কর্য ও ঘর সাজানোর উপকরণ তৈরিতেও চন্দন ব্যবহৃত হয়।
চন্দন তেল ও সুগন্ধির মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ হয় প্রাকৃতিক চন্দন তেলের মাধ্যমে। বাকি চাহিদা পূরণ করে কৃত্রিম বা সিন্থেটিক বিকল্প। বৈশ্বিক বাজারে ভারতীয় চন্দনের অংশ প্রায় ৪২ শতাংশ, আর অস্ট্রেলীয় চন্দনের অংশ প্রায় ৩০ শতাংশ।
বাণিজ্যিকভাবে চন্দন কাঠ সংগ্রহের উপযোগী হতে এখনো বহু বছর বাকি। তাই বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে দেশীয় উৎপাদন ও ভবিষ্যৎ রপ্তানির সুযোগে রূপ দিতে বাংলাদেশের গবেষণা ও বাগান সম্প্রসারণের উদ্যোগে ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড