রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় পুলিশ অফিসার হাউজিং সোসাইটিতে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া বাড়িতে মাসের অন্তত ২০ দিনই উচ্চ শব্দে গান-বাজনা, তরুণ-তরুণীদের নাচ-গান আর মাদক সেবনের আয়োজন চলার তথ্য থেকেই সেখানে অভিযানে যায় পুলিশ।
সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তানদেরও যাতায়াত ছিল বলে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
তারা বলছেন, এসব আয়োজনে আশেপাশের বাড়ির বাসিন্দারা অতিষ্ঠ ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে অভিযোগও করেছিলেন তারা। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার ওই বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালায়। সেখান থেকে ৮৫ জনকে আটকের পর বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
অভিযানে তিনটি বোতলে আনুমানিক এক লিটার ৭০০ মিলিলিটার মদ, একটি ইয়াবা, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও অল্প পরিমাণ কুশ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে ডিবি। ওই বাড়িতে থাকা কয়েকজনকে তদবিরের মাধ্যমে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়ে বলেও দাবি করেন অভিযানে থাকা একজন কর্মকর্তা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির বুধবার মিন্টো রোডে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। অভিযানের আগে তার কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না। পরে তাকে অভিযানে যুক্ত করা হয়।
ঘটনাস্থলের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, হাউজিংয়ের ভেতরে একটি মসজিদের আশপাশ থেকেও উচ্চ শব্দে গান শোনা যাচ্ছিল। সেখানে প্রায় ২২টি গাড়ি ছিল। অভিযানের সময় ২৬ তরুণীসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারদের পাওয়া যায়।
এ কর্মকর্তা বলেন, পার্টিতে সিসা সেবন, উচ্চ শব্দে গান ও অশালীন নাচ চলছিল। পুলিশ প্রবেশের পর তারা দৌড়ে ওপরের তলায় উঠে যান। ভবনটির কয়েকটি কক্ষে নারী-পুরুষকে একসঙ্গেও পাওয়া যায়।
হাউজিংয়ে বসবাসকারী অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে এসব আয়োজনে বিরক্ত ছিলেন বলে অভিযানে থাকা একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন। তাদের ভাষ্য, উচ্চ শব্দের কারণে মসজিদ পর্যন্ত গান-বাজনা শোনা যেত। এ নিয়ে তারা পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও অভিযোগ করেছিলেন।
নিজ বাড়ি থেকে ৮৫ জনকে আটকের ঘটনার পর ওএসডি করা হয়েছে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে। মঙ্গলবার বিকালে পুলিশ সদর দপ্তরের রিঅ্যার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখায় কর্মরত এ কর্মকর্তাকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করার আদেশ দেওয়া হয়।
‘মাসে ২০-২২টি পার্টি’
ডিসি ইলিয়াস কবির বলেন, এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের নিবন্ধন করতেন। বাড়ির ‘হোস্ট’ অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির এবং ‘কো-হোস্ট’ ছিলেন মাহবুবুল আলম।
মাহবুবুল আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে ইলিয়াস কবির বলেন, ২০২৫ সাল থেকে সেখানে এ ধরনের আয়োজন হয়ে আসছে। প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টি হতো বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। ১০ জনের কাছ থেকে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হতো। এর বাইরে আরও প্রায় ৯০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০০ টাকা নেওয়া হতো। তবে মাসে মোট কত টাকা আয় হতো, কারা সেই অর্থ পেতেন এবং বাড়ির মালিকের সঙ্গে অর্থের লেনদেন কীভাবে হতো, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ওই বাড়িতে অভিযানে মদ, ইয়াবা, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম, অল্প পরিমাণে কুশ পাওয়া গেছে। সেখান থেকে কনডম উদ্ধারের কথাও বলেন ডিসি ইলিয়াস কবির।
অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষদের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা ইলিয়াস কবির।
আর নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এসব ঘটনায় বাড়িটির মালিকের ভূমিকার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে পুলিশ কর্মকর্তা ইলিয়াস কবির বলেন, বাড়ির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। এ ঘটনায় মামলা হয়নি। পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিজে পার্টির আয়োজন আর আয় ভাগ নিয়ে বাড়ির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওই অ্যাপের (এয়ারবিএনবি) সিস্টেম অনুযায়ী বাসার মালিক মূল হোস্ট, এটা ঠিক আছে। তবে আমি তো এসব আয়োজন করি না। এগুলো করে কো-হোস্ট মাহবুব, তাকে আমি ব্যবস্থাপক হিসেবে রেখেছি।
“তাকে বলা হয়েছিল যত রুলস-রুলেশনস আছে সেগুলো মানতে হবে। এগুলোর কোনো ভায়োলেশন হলে যেন সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানানো হয়। প্রয়োজনে সঙ্গে সঙ্গে প্রোগ্রাম বাতিল করার নির্দেশ ছিল। এখন তো দেখতেছি, মাহবুব আমাকে অনেক কিছুই জানাত না। ঘটনার দিন আমি জানতাম সেখানে গেস্ট আছে ৩৫ থেকে ৪০ জন। অথচ আটক হয়েছে এর থেকে ডাবল।”
তিনি বলেন, “মাহবুব সাজা খেটে বের হলে তার কাছে এগুলো আমি শুনব। আমার নির্দেশনার ব্যত্যয় পেলে তাকে আমি আবার আইনের আওতায় আনব। আর ৭০ শতাংশ (আয়ের) নেওয়ার যে বিষয়টা, সেটা তো আমার ভাড়ার টাকা। বাকিটা নির্দিষ্ট পরিমাণে মাহবুব নেয়। হাউজ কিপিং আছে, গার্ডেনার আছে তারাও নেয়।”