শামীম মীর, গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি : তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদারীপুর-বরিশাল সীমান্তবর্তী বরিশালের গৌরনদী উপজেলার ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডে দু’পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, বোমাবাজি হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা এ সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন শামছুল হক (৪৮), স্বজল বেপারী (২৫), মিজান মুন্সী (৪৫), ইস্রাফিল (৩৫), সিদ্দিক সরদার (৫০), তমাল, সজীব হোসেন ও হুমায়ুন কবির (৫২)। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত পাঁচজনকে গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। অপর আহতদের চারজনকে গৌরনদী ও কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
এ সময় ১৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অর্ধকোটি টাকার মালামাল লুটের অভিযোগ উঠেছে। সংঘর্ষের সময় বোমাবাজিতে ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণভয়ে ব্যবসায়ী ও পথচারীরা ছোটাছুটি করতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের কারণে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে যান চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। এতে দূরপাল্লার বাসসহ শত শত যানবাহন আটকা পড়ে এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, আহত ব্যক্তি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডের একটি লোকাল বাস কাউন্টারে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টিকিট কাটাকে কেন্দ্র করে টিকিট মাস্টার ঝন্টু দাস (৬৫) ও মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার মসজিদবাড়ি এলাকার হাবুল বেপারীর (৪৭) মধ্যে তর্কবিতর্ক ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এর জের ধরে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে কালকিনি ও গৌরনদীর বাসিন্দাদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে তা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও বোমাবাজিতে রূপ নেয়।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সংঘর্ষের সময় কালকিনি এলাকার লোকজন ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডের অন্তত ১৫টি দোকানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সিদ্দিক সরদার, মোহাম্মদ তমাল, শামছুল হক, মো: আকাশ ও সজীব হোসেনের মুদি দোকান, আফজাল হোসেনের পার্সের দোকান এবং কাওছার তালুকদার, জিয়াউর রহমান, হুমায়ুন কবির, মনির হোসেন, সিরাজুল হক ও রাহাত হোসেনের ভ্যারাইটিজ স্টোরসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, হামলাকারীরা দোকানের মালামাল ও আসবাবপত্র মহাসড়কে এনে স্তূপ করে তাতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডের ব্যবসায়ী সিদ্দিক সরদার অভিযোগ করে বলেন, ‘কালকিনির মসজিদবাড়ি এলাকার ৬০-৭০ জন লোক ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ভূরঘাটায় হামলা চালায়। পরে গৌরনদীর কিছু যুবক তাদের প্রতিহত করতে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয়।’
গৌরনদী উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো: কাওছার তালুকদার অভিযোগ করে বলেন, ‘কালকিনির মসজিদবাড়ির মোফাজ্জেল সরদার ও বায়জীদ সরদারের নেতৃত্বে ৬০-৭০ জন লোক অস্ত্র, বোমা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়।’
তাদের অভিযোগ, হামলাকারীরা ১৫টি দোকান ভাঙচুর করে প্রায় অর্ধকোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। কালকিনি থানা পুলিশের বিরুদ্ধেও তিনি পক্ষপাতের অভিযোগ করেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কালকিনির মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘গৌরনদীর লোকজন প্রথমে কালকিনিতে হামলা চালানোর পর পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে।’
ডাসার থানার যুবদলের সদস্যসচিব মো: বায়জীদ সরদারও অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, টিকিট কাউন্টারের ঘটনার মীমাংসা করতে শুক্রবার রাতে ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডে গেলে তাকে লাঞ্ছিত করা হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে কালকিনির লোকজন জড়ো হন। পরে গৌরনদীর লোকজন কালকিনির মসজিদবাড়িতে হামলা চালিয়ে পাঁচজনকে আহত করে। এরপর সহস্রাধিক মানুষ পাল্টা হামলা চালায়। তবে গৌরনদীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা বা লুটপাটের সাথে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
কালকিনি থানার ওসি জহিরুল আলম বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছি। কেউ পক্ষপাতের অভিযোগ তুলতেই পারেন, তবে তা সঠিক নয়।’
গৌরনদী মডেল থানার ওসি তারিক হাসান রাসেল বলেন, ‘বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সংঘর্ষ এড়াতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সংঘর্ষের পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে কালকিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিশোর কুমার, কালকিনি থানার ওসি জহিরুল আলম, ডাসার থানার ওসি সোলায়মান মাহমুদ, গৌরনদী মডেল থানার ওসি তারিক হাসান রাসেলসহ সংশ্লিষ্টরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।