ডেস্ক রিপোর্ট: ঢাকায় ইসিবি চত্বর এলাকায় নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রকল্পে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে হামলা ও লুটপাটের পর সরকারি নানা সংস্থার পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকার ভুক্তভোগীকেই হয়রানি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনার পর রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার পদক্ষেপকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সালমানের বিষয়ে তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বিএফআইইউ যে তাড়াহুড়ো দেখিয়েছে সেটি বিরল। তার শ্বশুর শেখ নুরুল ইসলাম, যিনি এই কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে বিয়ে করার কারণে মেয়ে দিশা ইসলামের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, তার প্রতিষ্ঠান ‘ফুয়াং বোলিং সার্ভিসেস লিমিটেডে’ একের পর এক অভিযান চালানো হচ্ছে। ----- ডেইলি স্টার বাংলা
গত ২৬ সেপ্টেম্বর ব্রাউনফিশ তছনছের এক সপ্তাহের মধ্যে এই ঘটনাগুলো ঘটেছে। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নও (এসআরবি) অভিযানে যুক্ত হয়েছে।
এদিকে সালমান মুক্তাদির অভিযোগ করেছেন, কণ্ঠরোধের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে অন্যরাও সরকারের বিরুদ্ধে বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাবে।’
সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সালমান মুক্তাদিরকে হয়রানি করছে সরকার।
‘যেটি ফ্যাসিস্ট সরকার করত, বর্তমান সরকারও একই পথে। এটি অন্যায় ও অবিচার’, টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন তিনি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলায় সালমানকে হয়রানি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘একজন নাগরিকদের সঙ্গে এমন ব্যবহার কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটি গণতান্ত্রিক আচরণ নয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, সরকারি সংস্থার পদক্ষেপে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সরকারের সমালোচনার পরিবেশ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
মন্ত্রী ও সালমানের বাদানুবাদ
গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার ইসিবি চত্বর এলাকার নির্মাণাধীন নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রকল্প এলাকায় শতাধিক লোক হামলা করে। সেখানে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ব্রাউনফিশে ভাঙচুর চালানো হয়।
এরপর সালমান ভিডিওতে এসে অভিযোগ করেন, বিএনপির লোকজন চাঁদা না পেয়ে এই হামলা করেছে, যদিও পরে তিনি এই বক্তব্য থেকে সরে আসেন।
এরপর টানা কয়েকদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং সালমানের মধ্যে বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য চলেছে। সেগুলো সংবাদমাধ্যম ও সামাজিকমাধ্যমে বেশ জোরালো আলোচনা তৈরি করে। হামলার পর ভিডিওতে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে সালমান বলেন, ‘এই ভিডিওটা খুবই স্পেশালি বানানো, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের জন্য। প্লিজ আপনি কোনো টেনশন নেবেন না। দিস ইজ নরমাল ইন বাংলাদেশ।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি চাঁদাবাজ দল, এই ঢালাও অভিযোগের কোনো মানে নেই।’ সালমান মামলা করেননি দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘এই লাইভ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।’
পরে সালমান ফের লাইভে আসেন। তিনি জানান, মন্ত্রীর কথায় তিনি বিস্মিত হয়েছেন। হামলার পর রাতেই তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানায় যান এবং পরদিন ভোর পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। ওই সময়ও মামলা নেওয়া হয়নি।
তিনি ফের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আক্রমণ করে বলেন, ‘আপনার মধ্যে কি একটু লজ্জা কাজ করে? আপনার প্রধানমন্ত্রীর আসন থেকে এরকম একটা কিছু হইল, আপনি কি বুঝতেসেন যে কতটুকু ডাউন হয়ে গেল?…বোঝেন নাই মনে হয়।’
এরপর এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর কোনো বক্তব্য দেননি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা
গত ৩০ সেপ্টেম্বর খবর আসে, বিএফআইইউ সালমানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে। ওই দিন সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ব্যাংকগুলোতে পাঠানো এক ই-মেইলে জরুরি ভিত্তিতে এই তথ্য সরবরাহ করতে বলা হয়। অনুরোধটিকে অতি জরুরি হিসেবে চিহ্নিত করে ‘গোএএমএল’ মেসেজ বোর্ডের মাধ্যমে এক ঘণ্টার মধ্যে তথ্য জমা দিতে বলা হয়। পাশাপাশি তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এরপর ব্যাংকগুলো থেকে কী তথ্য জানানো হয়, সে বিষয়টি আর প্রকাশ পায়নি।
তখন সালমান ফের লাইভে এসে বলেন, ‘আমি যখন ভিকটিম, তখনই কেন ব্যাংক হিসাব তলব। এর একদিন পর বৃহস্পতিবার কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিরেক্টরেট, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন গুলশানের একটি বিদেশি মদের গুদাম ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড’-এ অভিযান চালায়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পরবর্তীতে জানায়, বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত শুল্কমুক্ত মদ অননুমোদিত গুদামে সংরক্ষণের অভিযোগে কোম্পানিটির চারটি গুদাম সিলগালা করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, গুদামগুলোর দুটির মালিক সালমানের শ্বশুর নুরুল ইসলাম।
তবে নুরুল ইসলাম টাইমসকে জানান, ২০১৮ সালের আগেই তিনি টস বন্ডের মালিকানা বিক্রি করে দিয়েছেন। তিনি জানান, তিনি বিগত ৪৬ বছর ধরে কানাডায় বসবাস করছেন এবং সেখানে নিজের ব্যবসার উপার্জিত অর্থ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছেন। ফু-ওয়াক বোলিং সার্ভিসেস লিমিটেডের অপারেশন প্রধান মোহাম্মদ ফয়জুল করিমও টস বন্ডের সঙ্গে নুরুল ইসলামের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা থাকার কথা অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, নুরুল ইসলাম তার কন্যা দিশা ইসলামের সঙ্গে সালমানের বিয়ে মেনে নেননি এবং তখন থেকে সালমানের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই। ফয়জুল বলেন, ‘সালমানের পরিবারকে টার্গেট করার উদ্দেশ্যে যদি এটি করা হয়ে থাকে, তবে সম্ভবত তারা জানেই না যে নুরুল ইসলামের সঙ্গে সালমানের কোনো সম্পর্ক নেই।’
তিনি আরও জানান, গত এক সপ্তাহে ফু-ওয়াং ক্লাবেও দুবার অভিযান চালানো হয়েছে। ‘এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের’, যোগ করেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটও কানাডা থেকে তথ্য চেয়েছে।
এতদিন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ টাইমসকে বলেন, ‘একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের বাড়িতে একটি ঘটনা ঘটল, এরপর তিনি প্রকাশ্যে বক্তব্য দিলেন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা পরিবর্তন হলো, আর তার পরপরই হঠাৎ করে তার ব্যাংক হিসাব চাওয়া হলো। একইভাবে তার আত্মীয়ের যেসব গোডাউন অবৈধ বলা হচ্ছে, সেগুলো যদি সত্যিই আগে থেকেই অবৈধ হয়ে থাকে, তাহলে এতদিন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? বক্তব্য দেওয়ার পরই কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো?’
এসব পদক্ষেপে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রহণযোগ্যতার ক্ষতি হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি। বলেন, ‘মানুষ যদি মনে করে বিএফআইইউ, দুদক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক বক্তব্যের পর কাউকে টার্গেট করে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা কমে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ‘কোনো কাজ যদি আইনবিরোধী হয়, তাহলে সেটি বক্তব্যের আগে যেমন আইনবিরোধী, পরেও তেমনই আইনবিরোধী। কারো বিরুদ্ধে বক্তব্যের পর হঠাৎ করে কোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়।সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, ‘ওনার (সালমান) বক্তব্যের পর যখন আমরা দেখি ব্যাংক হিসাব চাওয়া হচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।’
ব্যাংক হিসাব চাওয়ারও একটি আইনি প্রক্রিয়া আছে বলে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘মামলা বা আদালতের নির্দেশসহ নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি ছাড়া কোনো কর্তৃপক্ষ ইচ্ছামতো কারও ব্যাংক হিসাব চাইতে পারে না। এখন যদি কারও ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা ক্ষমতার প্রভাব থেকে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি খুবই উদ্বেগজনক। সালমানের শ্বশুরের ব্যবসা অনেক দিন ধরেই চলছে। এতদিন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন–এই প্রশ্নও রাখেন এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।