স্পোর্টস ডেস্ক :নামেই বড় ম্যাচ। নামেই ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট লড়াই। কিন্তু সেই লড়াই কোথায়? ভারতকে সামান্যতম বেগও দিতে পারল না পাকিস্তানের মহিলা ক্রিকেট দল। কার্যত এক ইনিংসেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেল। ভারতের মহিলা দলের সঙ্গে পাকিস্তানের মহিলা দলের ব্যবধানটা এদিন আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠল। ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলতে যা বোঝায়, মহিলাদের এশিয়া কাপের এই ম্যাচে সেটুকুও দেখা গেল না।
টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু শুরু থেকেই নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট পড়তে থাকে। বড় রানের স্বপ্ন যে পূরণ হবে না, তা পাওয়ারপ্লে শেষ হওয়ার আগেই পরিষ্কার হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫৫ রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তানের ইনিংস। টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের জন্য লজ্জার এক রেকর্ডও তৈরি করল তারা। --- আজকাল
পাকিস্তানের ব্যাটারদের নিয়ে কার্যত ছেলেখেলা করলেন ভারতের স্পিনাররা। শ্রী চরণী, প্রেমা রাওয়াত এবং দীপ্তি শর্মার ঘূর্ণির সামনে একের পর এক আত্মসমর্পণ করলেন পাকিস্তানের ব্যাটাররা। শ্রী চরণী ৭ রানে ৩ উইকেট, প্রেমা রাওয়াত ৯ রানে ৩ উইকেট এবং দীপ্তি শর্মা ৫ রানে ২ উইকেট নিয়ে পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। এদিকে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যে বুমেরাং হয়ে ফিরবে, তা কে জানত!
শুরুতে মুনিবা আলি আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ১৫ বলে ১৩ রান করে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। কিন্তু একাধিকবার ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলার পর শেষ পর্যন্ত শেফালি ভার্মার বলে বোল্ড হয়ে ফিরতে হয় তাঁকে।
শাওয়াল জুলফিকার ১৪ বলে ১৪ রান করেন। তিনটি বাউন্ডারি এলেও স্পিনের বিরুদ্ধে ভুল শট বাছাইয়ের খেসারত দিতে হয় তাঁকে। শ্রী চরণীর বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন শাওয়াল।
এরপর পাকিস্তানের ইনিংস কার্যত ভারতের স্পিনারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। শ্রী চরণী পরপর গুল ফিরোজা (০) এবং শাওয়াল জুলফিকারকে (১৪) ফেরান। আয়েশা জাফরও (২) স্পিনের বিরুদ্ধে ঝুঁকি নিয়ে মিড-অনে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান। কয়েক ওভারের মধ্যেই পাকিস্তানের তিন-চারটি উইকেট পড়ে গেলেও ইনিংস গুছিয়ে নেওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি।
প্রেমা রাওয়াতের লেগস্পিনও পাকিস্তানের ব্যাটারদের কাছে হয়ে ওঠে দুর্বোধ্য। সদফ শামাস মাত্র ৩ রান করে ফেরেন। এরপর দলের অধিনায়ক ফাতিমা সানার কাছ থেকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তিনিও খাতা না খুলেই দীপ্তি শর্মার বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরে যান।
উম্মে-ই-হানি ও আইমান ফাতিমা কিছুটা সময় ক্রিজে কাটালেও রান তোলার গতি বাড়াতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৬ রান করে ফেরেন উম্মে-ই-হানি। আইমান ফাতিমার ইনিংসও থামে ৫ রানে।
পাকিস্তানের ইনিংসের হতাশাজনক মুহূর্তগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল রান-আউট। রান নেওয়ার জন্য প্রথমে সম্মতি জানিয়ে মাঝপথে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন উম্মে-ই-হানি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। রান-আউট হয়ে ফিরে যেতে হয় আইমান ফাতিমাকে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল যোগাযোগ এবং পরিস্থিতি বুঝতে না পারার ছবি যেন গোটা পাকিস্তান ইনিংসেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল।
অন্যদিকে ভারতীয় বোলাররা পাকিস্তানের দুর্বলতাগুলো নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছেন। শ্রী চরণীর নিয়ন্ত্রিত স্পিন, প্রেমা রাওয়াতের দুর্দান্ত লেগস্পিন এবং দীপ্তি শর্মার অভিজ্ঞতা, সব মিলিয়ে পাকিস্তানের ব্যাটারদের এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি দেননি তাঁরা।
তবে পাকিস্তানের সমস্যা শুধু কম রান করা নয়। আরও বড় সমস্যা হল রান করার পদ্ধতিতে ধারাবাহিকতার অভাব এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের পরিকল্পনার ঘাটতি। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট মানেই প্রতিটি বলে বড় শট নয়। উইকেট পড়লে কিছুটা সময় নিয়ে সিঙ্গলস-ডাবলসে ইনিংস গড়ে তোলা, স্পিনারকে পড়া, ফিল্ডের ফাঁক খুঁজে নেওয়া এবং উইকেট ধরে রাখা, এই মৌলিক বিষয়গুলিই এদিন বারবার অনুপস্থিত ছিল পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ে।
একসময় ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট মানেই ছিল উত্তেজনা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং শেষ বল পর্যন্ত লড়াই। কিন্তু এদিনের ম্যাচে সেই ছবির ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না। পুরুষদের ক্রিকেট হোক বা মহিলাদের, পাকিস্তানের ক্রিকেট যে পিছিয়ে পড়েছে, এই ম্যাচ যেন তারই আরেকটি উদাহরণ।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ, পাকিস্তানের এটি ছিল ২০০তম মহিলা টি-টোয়েন্টি। এমন একটি মাইলফলক ম্যাচে স্মরণীয় পারফরম্যান্সের বদলে মাত্র ৫৫ রানে গুটিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে হতাশার। আর তার জবাবে ৬৮ বল বাকি থাকতে সাত উইকেটে ভারতের ম্যাচ জিতে নেওয়া প্রমাণ করে পাকিস্তান ক্রিকেট পিছিয়ে পড়ছে ক্রমশই। এশিয়া কাপে গ্রুপ পর্বে সর্বোচ্চ পয়েন্ট নিয়ে ভারতে পৌঁছে গেল সেমিতে।
পাকিস্তানের ভরাডুবির দিনে ভারতকে অবশ্যই কৃতিত্ব দিতে হবে। তাদের স্পিনাররা অসাধারণ বোলিং করেছেন। রান তাড়া করতে নেমে শেফালি বার্মা (১২), স্মৃতি মান্ধানা (৯) ও প্রতীকা রাওয়াল (৪) ফিরে গেলেও অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর (১৮*) ও দীপ্তি শর্মা (১২*) অপরাজিত থেকে ম্যাচ জিতিয়ে দেন।
পাকিস্তানের ইনিংস আরও একটি প্রশ্ন তুলে দিল। আধুনিক টি-টোয়েন্টির গতি, কৌশল এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের যে মৌলিক পাঠ, তা এখনও পুরোপুরি আয়ত্তে আনতে পারেনি পাকিস্তানের মহিলা দল।