চলতি ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির সামগ্রিক নিম্নমুখী প্রবণতার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানিতেও। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
শুধু জুলাইয়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এ বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির গতি কিছুটা মন্থর হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পতন তুলনামূলক কম। জানুয়ারি–জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ এবং ভারতের ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
এ সময়ে পাকিস্তানের রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ১ দশমিক ০৩ শতাংশ।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। জানুয়ারি-জুলাই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পণ্য সরবরাহের পরিমাণের হিসাবেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। তবে এ ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের পতন ছিল আরও বেশি-যথাক্রমে ২৪ দশমিক ১৭ শতাংশ ও ২৪ দশমিক ০২ শতাংশ। বিপরীতে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া পরিমাণের হিসাবে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।
মূল্যের হিসাবে প্রায় সব প্রধান সরবরাহকারী দেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে চীনের পোশাকের গড় দাম, ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে সামগ্রিক আমদানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন ঘটছে। বিশেষ করে চীন থেকে অর্ডার সরিয়ে বিকল্প উৎস খুঁজছেন অনেক মার্কিন ক্রেতা ও ব্র্যান্ড। এর ফলে কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাচ্ছে।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, মার্কিন বাজারে পোশাক আমদানি ও সরবরাহের পরিমাণ কমে যাওয়ায় শীর্ষ সরবরাহকারী দেশগুলোর রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে চীনের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের রপ্তানিতেও মন্দার প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, চীন থেকে অর্ডার সরে আসার কারণে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো কিছুটা সুবিধা পাচ্ছে। তুলনামূলক ছোট রপ্তানিকারক হওয়ায় এসব দেশের প্রবৃদ্ধির হার বেশি মনে হলেও সামগ্রিক বাজারের বড় অংশ এখনো প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর দখলে।
মার্কিন বাজারের ভোক্তা আচরণের পরিবর্তন প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, দেশটির ভোক্তাদের কেনাকাটার অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ক্রেতাদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব পোশাকের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শুল্কসংক্রান্ত অনিশ্চয়তার কারণে সেকেন্ডহ্যান্ড পোশাক ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে। এসব পরিবর্তন নতুন পোশাকের আমদানিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
উদ্যোক্তা ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ শুল্কনীতি ও মার্কিন নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে অনেক বায়ার ও ব্র্যান্ড তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করছে। ঝুঁকি কমাতে তারা কোনো একক দেশ বা অঞ্চলের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন বিকল্প উৎস থেকে পোশাক সংগ্রহের দিকে ঝুঁকছে।
ফলে কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো নতুন অর্ডার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে চীন থেকে অর্ডার স্থানান্তরের সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্যও সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সার্বিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে বর্তমান নিম্নমুখী প্রবণতা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তেমনি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে। তাই মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। উৎস: বাংলানিউজ24