মনজুর এ আজিজ : দেশের গ্যাস খাত এখন বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। ভয়াবহ সংকটের মধ্যে দফায় দফায় দরপত্র দিয়েও মিলছে না এলএনজি সরবরাহের দরদাতা। অন্যদিকে, ভর্তুকি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২৭) জ্বালানি খাতে ভতুর্কি বরাদ্দ রয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। প্রথম দুই মাসেই (জুলাই-আগস্ট) ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। বছরের আরও ১০ মাস নিয়ে চিন্তায় রয়েছে পেট্রোবাংলা।
এদিকে ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। যুদ্ধের আগে এক কার্গো এলএনজি কিনতে ৫০০ কোটি টাকার মতো খরচ হতো, এখন সেই কার্গো সর্বোচ্চ ১২০০ কোটি টাকায় কিনতে হয়েছে। প্রতি ইউনিট গ্যাস কমবেশি ১০ ডলারে পাওয়া গেলেও এখন ২২ থেকে ২৮ ডলারে কিনতে হচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসে পরিকল্পিত ১০ কার্গো এলএনজির মধ্যে চূড়ান্ত হওয়া ৮ কার্গোর গড় আমদানি খরচ পড়েছে ২৩.৯৭ ডলার। আবার ৮ সেপ্টেম্বরের জন্য তিন দফায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েও কোনো দরদাতা পাওয়া যায়নি।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস (জুন-মার্চ) গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য পড়েছে ২৭.৬৪ টাকা। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর (এপ্রিল-জুন ২০২৬) গড় ক্রয়মূল্য উঠেছে ৪৫.৭৯ টাকায়। অন্যদিকে গড় বিক্রয়মূল্য ২৩.৬৩ টাকায় বিক্রি করায় প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি হয়েছে ২১.৮২ টাকা। এতে করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার ঘাটতি হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গ্যাসের ঘনমিটার প্রতি গড় মূল্য ৬.০৭ টাকা, আর ৩০ শতাংশ আমদানির পর দাঁড়াচ্ছে ৩১.৬৫ টাকা থেকে ৪৫.৭৯ টাকা। ৩০ শতাংশ আমদানিতে ভর্তুতি সামাল দেওয়া কঠিন হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে ৭০ শতাংশ আমদানির প্রাক্কলনে কি দাঁড়াবে সহজেই অনুমেয়। তারপরও বিগত সরকারগুলো আমদানির দিকেই ঝুঁকেছে। দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় যখন অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি ছিল। তখন আমদানি পথে পা বাড়ানোর কারণে আজকের মহাসংকট বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এলএনজির নির্ভরযোগ্য উৎস ছিল কাতার এবং ওমান থেকে জিটুজি ভিত্তিতে আমদানি। হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে স্পর্ট মার্কেট থেকে দ্বিগুণ দামে কিনতে হচ্ছে। আগস্টে ডিপিএম পদ্ধতিকে ৪ কার্গো এলএনজি আমদানির আদেশ দেওয়া হয়। যেগুলো কোনটাই দেশে আসেনি, যে কারণে মারাত্মক গ্যাস সংকট চলছে। এতে করে শিল্প থেকে শুরু করে, আবাসিক, সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভয়াবহ ঘাটতি বিরাজ করছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৮টি গ্রাহক শ্রেণিতে অনুমোদিত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৫ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট (দৈনিক)। মতান্তরে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে (৪ সেপ্টেম্বর) ২ হাজার ৩৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১ হাজার ৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ৭১২ মিলিয়ন ঘনফুট মিলে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং শুরু হয়েছে। ঘোষিত চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বাইরে এক তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে ৩৭৯টি শিল্পের বিপরীতে প্রতিশ্রুত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। যারা কোটি কোটি টাকা জামানত দিয়ে জুতার তলা ক্ষয় করছেন।
২১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে চলছে ভয়াবহ গ্যাস সংকট। সংকট কাটিয়ে সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। কার্গো না পাওয়ায় প্রচেষ্টায় বড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যেই সরবরাহ খানিকটা কমিয়ে রাখা হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দেওয়া হলেও শুক্রবার দেওয়া হয়েছে ৭১২ মিলিয়ন। যাতে করে হঠাৎ করে পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়।
এক সময়ে দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২৮০০ মিলিয়নের মতো গ্যাস উৎপাদিত হলেও এখন ১৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
মজুত কমে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত কমে আসছে উৎপাদন। বেশি উদ্বেগের বিষয় বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদন কমে যাওয়া। ফিল্ডটি থেকে এখনও সাড়ে ৪৫ শতাংশের মতো গ্যাস যোগান আসছে। আর কনডেনসেট পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৬৮ শতাংশ। এক সময়ে ১৩৫০ মিলিয়নের মতো উৎপাদন দিতো, ৩ সেপ্টেম্বর ৭৩১ মিলিয়নে নেমে গেছে। মজুত কমে আসায় দ্রুতই কমে যাচ্ছে উৎপাদন।
চাহিদা যখন বাড়ন্ত তখন প্রতিদিনেই কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন। চাইলেও সহসা আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই। আমদানি বাড়াতে হলে নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে, যা খুবই সময় সাপেক্ষ। যে কারণে আসছে ২০২৭ ও ২০২৮ সালে গ্যাস সংকট আরও প্রকট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদনে ব্যাপক ধসের কারণে এ শঙ্কা আরও বাড়ছে।