শিরোনাম
◈ এবার পুতিনকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলেন জেলেনস্কি! ◈ ভিজিটর ভিসা নিয়ে বাংলাদেশিদের সতর্কবার্তা দিল মার্কিন দূতাবাস ◈ বিদেশী শ্রমিক কমাচ্ছে মালয়েশিয়া, অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার! ◈ দখল-দূষণে মরছে ঢাকার খাল, দেড় বছর ধরে বন্ধ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ◈ দিলারা জামানের বাড়ি দখলের সত্যতা নেই! আসল ঘটনা জানালেন অভিনেত্রী নিজে ◈ কক্সবাজারে ৪ হোটেলে ২৮০ অনলাইন ‘জুয়া-প্রতারণার ল্যাব’! ◈ দুই লাখ টাকা ঋণের কিস্তি দিতে দেরি হলে বাড়িতে নোটিশ- মামলা, বড় ঋণ খেলাপিরা কেন শাস্তি পায় না? ◈ শেষ পর্যন্ত হে‌রেই গে‌লো রিয়াল মা‌দ্রিদ ◈ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের বিকল্প খুঁজছে সরকার, ভরসা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ◈ আর্থিক বিশ্বের নতুন শক্তি হংকং, পেছনে ফেলতে পারে নিউইয়র্ক-লন্ডনকে

প্রকাশিত : ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫১ দুপুর
আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:০২ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বিদেশী শ্রমিক কমাচ্ছে মালয়েশিয়া, অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার!

বিদেশী শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে মালয়েশিয়া। আগামী পাঁচ বছরের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ‘থার্টিন্থ মালয়েশিয়া প্ল্যান (১৩এমপি), ২০২৬-৩০’ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট কর্মশক্তিতে বিদেশী শ্রমিকের অংশ ১০ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি। এরই মধ্যে দেশটিতে বৈধ বিদেশী কর্মীর সংখ্যাও কমতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ১৩ শতাংশ কমেছে। উৎপাদন, নির্মাণ, সেবা, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশী শ্রমিক নিয়োগ সীমিত করার পাশাপাশি অটোমেশন, স্থানীয়দের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে মালয়েশিয়া সরকার। সূত্র: বণিক বার্তা প্রতিবেদন

মালয়েশিয়া সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদেশী শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর ফলে স্থানীয়দের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং দেশীয় কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এ উদ্যোগ শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছে সরকার। এটি দেশটির বৃহত্তর শ্রমবাজার সংস্কার কর্মসূচির অংশ, যার লক্ষ্য আরো গতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই কর্মসংস্থান ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি জনগণের আয় বাড়ানো। এ নীতির ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়ায় বৈধ বিদেশী কর্মীর সংখ্যাও কমছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে বৈধ বিদেশী কর্মী ছিল ২৪ লাখ ৫২ হাজার ১০ জন। ২০২৫ সালে তা ১৩ শতাংশ কমে ২১ লাখ ৩২ হাজার ৫৭৮ জনে নেমেছে। উৎপাদন, নির্মাণ, সেবাসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে পর্যায়ক্রমে বিদেশী কর্মীর সংখ্যা কমিয়ে আনা হচ্ছে।

মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য সানের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে সবচেয়ে বেশি বিদেশী কর্মী রয়েছেন উৎপাদন খাতে, ৬ লাখ ২২ হাজার ৩৮৮ জন। এরপর নির্মাণ খাতে ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৪ জন এবং সেবা খাতে ৩ লাখ ৯০ হাজার ৬০৭ জন বিদেশী কর্মী কাজ করছেন। এছাড়া প্লান্টেশন বা বাগান খাতে ২ লাখ ৬৩ হাজার ১৩১ জন, কৃষি খাতে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬২৮ জন, গৃহকর্মী হিসেবে ১ লাখ ৭ হাজার ৩৭৫ জন এবং খনি খাতে ৭৬৫ জন বৈধ বিদেশী কর্মী রয়েছেন। তবে বৈধ কর্মীদের বাইরে দেশটিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অনিয়মিত বিদেশী নাগরিকও রয়েছেন। বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক ও নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠায় মালয়েশিয়া সরকার।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বিদেশী কর্মীর উৎস দেশ হিসেবে বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশটির মোট বিদেশী শ্রমশক্তির প্রায় ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশী। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য স্টার জানিয়েছে, বর্তমানে সেখানে বৈধ ওয়ার্ক পারমিটধারী বাংলাদেশী কর্মীর সংখ্যা ৮ লাখ ৩ হাজার ৩৩২। উৎপাদন ও সেবাসহ বিভিন্ন খাতে কম দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশী কর্মীর প্রধান উৎস দেশও এখন বাংলাদেশ। এর বাইরে অবৈধভাবে আরো কয়েক লাখ বাংলাদেশী সেখানে বসবাস করছেন বলে ধারণা করা হয়।

২০২৪ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার বাজারটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিলেও তাতে অগ্রগতি আসেনি। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া। এ সফর ঘিরে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রত্যাশা তৈরি হলেও সরাসরি কোনো ঘোষণা আসেনি। পরবর্তী সময়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে এ বিষয়ে নানা বক্তব্য এলেও কবে থেকে এবং কী পরিমাণ কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়া হয়নি।

তবে গত ২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার বাংলাদেশী কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে বা ‘জিরো কস্টে’ নেয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ। এর দুই দিন পর, ৩০ আগস্ট স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়ার বিষয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রায় দুই লাখ শ্রমিক তারা নেবে। এর মধ্যে ১০ হাজার শ্রমিক তারা ফ্রিতে নেবে। বাংলাদেশ থেকে যে জনশক্তি রফতানি হবে, সেটি সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে পর্যায়ক্রমে শুরু হবে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শেষ হবে।’

তবে মীর শাহে আলমের এ দাবিকে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয় বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র ও যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল। গত বুধবার দেশটির প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

ফ্রি মালয়েশিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে বিদেশী শ্রমিক নিয়োগের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট শিল্প ও খাতের প্রকৃত জনবল চাহিদার ভিত্তিতে নেয়া হবে। একই সঙ্গে নিয়োগের সংখ্যা থার্টিন্থ মালয়েশিয়া প্ল্যানের আওতায় অর্থনীতি মন্ত্রণালয় নির্ধারিত সীমার মধ্যেই রাখতে হবে বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী আর রামানান।

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই লাখ কর্মী নেয়ার বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ সংখ্যা বর্তমান বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’ তার ভাষ্য, ছয় মাসে দুই লাখ কর্মী নিতে হলে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি বাংলাদেশীকে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে হবে, যা বাস্তবসম্মত নয়।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে আসা বক্তব্যের সঙ্গে মালয়েশিয়ার জাতীয় পরিকল্পনা এবং সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির সরকারের অবস্থানের মিল নেই। ফলে বাংলাদেশ থেকে নতুন করে কর্মী নেয়া হবে কিনা, হলে কতসংখ্যক এবং কবে থেকে নেয়া হবে—এসব বিষয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দেশটির সংসদেও স্পষ্ট করেছেন, বিদেশী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা ধীরে চলো নীতিতে এগোবেন। তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো মালয়েশিয়ায় এরই মধ্যে অবস্থান করছেন কিন্তু কাজ পাননি—এমন বিদেশী কর্মীদের সমস্যার সমাধান করা। দেশটির এ নীতিগত অবস্থান আমাদের নীতিনির্ধারকদের অজানা থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশী রয়েছেন, যারা নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন না কিংবা নথিপত্রসংক্রান্ত জটিলতায় আছেন। মালয়েশিয়া সরকার যদি নতুন কর্মী নেয়া বন্ধ রাখার পাশাপাশি অনিয়মিত বা কাগজপত্রহীন কর্মীদের ফেরত পাঠাতে শুরু করে, তাহলে বাংলাদেশ দ্বিমুখী সংকটে পড়বে।’ তার মতে, মালয়েশিয়া সরকারের নীতিগত বাস্তবতা আমলে নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। একক কোনো শ্রমবাজারের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে এখন টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকে এগোতে হবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার বিষয়ে সত্যিকার অর্থে আমার কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী বা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) প্রতিমন্ত্রী কোন সোর্স থেকে বলছেন সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।’

  • সর্বশেষ