আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়া ও প্রতারকচক্রের ২৮০ সদস্য কক্সবাজারে ঘাঁটি গেড়ে গত মার্চ মাস থেকে বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া থেকে শুরু করে নানা ধরনের প্রতারণার কাজ করে আসছিল। তারা কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ এলাকার ৪টি হোটেল ভাড়া নিয়ে রীতিমতো ল্যাব বানিয়ে প্রতারণা ও অনলাইন জুয়া ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। এ চক্রের ৬ সদস্যকে (চীনা নাগরিক) গ্রেপ্তার করেছে কক্সবাজার জেলা পুলিশ।
তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, প্রায় ৪০টি ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, স্টারলিংক ডিভাইসসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ করেছে পুলিশ। এদিকে ৬ সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রতারকচক্রের অন্য সদস্যরা গা-ঢাকা দিয়েছে। তারা যাতে বাংলাদেশ থেকে পালাতে না পারে এজন্য সকল ইমিগ্রেশন পুলিশের চেকপয়েন্টে ২৮০ জনের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া তাদের পাসপোর্ট ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতারকচক্রের বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। ২৮০ জনের মধ্যে শুধু চীনা নয়, তাইওয়ানের নাগরিকও রয়েছে। অন অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে তারা বাংলাদেশে এসে অনলাইন জুয়া, অনলাইন শেয়ারবাজার, বিভিন্ন কারেন্সি-সংক্রান্ত প্রতারণা করে আসছিল। ঢাকায় বসে তারা এই প্রতারণা কাজ করলে গ্রেপ্তার হতে পারেন এই আশঙ্কায় তারা স্টারলিংক ডিভাইসের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে কক্সবাজারের ৪টি হোটেলে বসে অপরাধ করছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মো. অহিদুর রহমান গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, প্রতারকচক্র যে ৪টি হোটেল ভাড়া নিয়ে অপরাধ করে আসছিল সেখানে বাংলাদেশিরা ঢুকতে পারত না বলে তারা তদন্তে জেনেছেন। তিনি বলেন, গোয়েন্দা নজরদারি ও দীর্ঘ তদন্তের পর বৃহস্পতিবার রাতে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথমে তারা বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করার কথা বলে পুলিশকে বিভ্রান্ত করে আসছিল। পরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে ঢাকাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষায়িত তদন্ত দল বিষয়টি খতিয়ে দেখে। চীনা দূতাবাসের টিম এসে জানায় এরা সবাই প্রতারক। এরপরই বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৬ চীনা প্রতারককে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ৪টি হোটেলের বিভিন্ন রুমে তারা রীতিমতো কম্পিউটার ল্যাব বানিয়ে অনলাইন জুয়া ও প্রতারণা করে আসছিল। এই ল্যাবগুলো সাউন্ড প্রুফ বানিয়েছিল। যাতে রুমের ভেতর থেকে কোনো শব্দ বাইরে না যায়। ৬ জনকে গ্রেপ্তারের পর ল্যাবের রুম পুলিশের পক্ষ থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতারকচক্রটি নিজস্ব কুক, ইলেকট্রিশিয়ানসহ চীন ও তাইওয়ান থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এখন জব্দকৃত ডিভাইসগুলো পুলিশের বিশেষজ্ঞ টিম দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে। ইতোমধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে রামু থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
যে ৬ চীনা নাগরিককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে তাদের একটি দল গত ২৬ আগস্ট হোটেল সি-প্যালেসে ওঠেন। হোটেল সি-প্যালেস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৬ আগস্ট চীনা নাগরিকদের একটি দল হোটেলটিতে ওঠে। বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশের অভিযানের সময় তাদের কয়েকজনকে আটক করা হয়। তবে তারা কী উদ্দেশ্যে কক্সবাজারে এসেছিলেন কিংবা হোটেলে অবস্থান করে কী ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিলেন, হোটেল কর্তৃপক্ষ কোনো কিছু জানাতে পারেনি।
এদিকে কক্সবাজারে পুলিশের অভিযানে আটক আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারকচক্রের সঙ্গে জড়িত চীনের ৬ নাগরিককে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল শুক্রবার বিকালে রামু থানার পুলিশ সংশ্লিষ্ট মামলায় আটক ৬ জনকে কক্সবাজার আদালতে হাজির করে। কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল আদালতের বিচারক আসাদ উদ্দিন মো. আসাদ স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ওদিকে এত বিপুলসংখ্যক আইফোন মাত্র ছয়জন ব্যক্তির কাছে কেন- এটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এগুলো কি একসঙ্গে কোনো দেশে থেকে আনা হয়েছিল? নাকি বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা হয়? ফোনগুলোতে কি আলাদা আলাদা সিম, ই-সিম বা অনলাইন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হতো? নাকি এগুলোকে এক ধরনের ‘ডিভাইস ফার্ম’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল? এ জন্য পুলিশ ফোনগুলো ডিজিটাল ফরেনসিক করবে।
এ ছাড়া প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ব্রডব্যান্ডের পরিবর্তে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট স্টারলিংক ডিভাইস প্রতারকচক্র কীভাবে সংগ্রহ করল, জব্দ করা স্টারলিংক টার্মিনাল বাংলাদেশে কীভাবে প্রবেশ করল, বাংলাদেশে বৈধভাবে আমদানি করা হয় নাকি চোরাপথে আনা হয়েছিল, কোন অ্যাকাউন্টে স্টার লিংক টার্মিনাল নিবন্ধন করা হয়, কে এর বিল পরিশোধ করছিল, স্টারলিংক ডিভাইস প্রতারকচক্র কবে নিয়ে আসে বাংলাদেশে, দেশে আসার পর কোথায় প্রথম সক্রিয় হয় এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন পুলিশের তদন্তকারীরা। সূত্র: দৈনিক আমাদেরসময়