নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে খোলা ব্যাংক হিসাবে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে, অথচ সেই হিসাবের প্রকৃত মালিকই জানেন না তার নামে কোনো ব্যাংক হিসাব রয়েছে। চট্টগ্রামে সাইবার অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে এমন একাধিক চাঞ্চল্যকর ঘটনার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষকে সহায়তার কথা বলে তাদের এনআইডি, ছবি ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে পরে গোপনে ব্যাংক হিসাব খোলা হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কেউ কেউ সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে নিজের ব্যাংক হিসাব অন্যের ব্যবহারের জন্য দিয়ে দিচ্ছেন। পরবর্তীতে ওই হিসাবে অপরাধ বা প্রতারণার টাকা লেনদেন হলে বড় ধরনের আইনি বিপাকে পড়ছেন নিবন্ধিত মালিক।
সম্প্রতি ৪২ লাখ ৭৩ হাজার ৮৪৬ টাকার একটি অনলাইন প্রতারণা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এমনই একটি রহস্যজনক ব্যাংক হিসাবের সন্ধান পায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সাইবার সাপোর্ট অ্যান্ড রেসপন্স সেন্টার।
তদন্তে দেখা যায়, সরকারি বাঙলা কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরান হাফিজের নামে সিটি ব্যাংকে একটি হিসাব খোলা হয়। ইমরানের দাবি, তিনি ওই ব্যাংকে কোনো হিসাব খোলেননি এবং কখনো কোনো শাখায় যাননি। অথচ তার এনআইডি ও ছবি ব্যবহার করে খোলা ওই হিসাবে মাত্র এক মাসে ২৪ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। ব্যাংকের নথিতে ইমরানকে ব্যবসায়ী হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে তিনি একজন শিক্ষার্থী।
হিসাব খোলার সময় 'ফাহাদ টেলিকম' নামে একটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের তথ্য ও ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি হিসাবধারীর মোবাইল নম্বর হিসেবে যেটি দেওয়া হয়েছিল, সেটি মাদারীপুরের এক স্কুলশিক্ষকের নামে নিবন্ধিত।
ভুক্তভোগী ইমরান হাফিজ বলেন, 'আমি জীবনে কখনো সিটি ব্যাংকের কোনো শাখায় যাইনি। আমার এনআইডি, ছবি ও স্বাক্ষর কীভাবে ব্যবহার করে হিসাবটি খোলা হয়েছে, তা-ও আমি জানি না। আমার উপস্থিতি ও অনুমতি ছাড়া কীভাবে ব্যাংক হিসাব খোলা হলো, সে বিষয়ে আমি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছি।' হিসাব খোলার আবেদনপত্র, পরিচয় যাচাই-সংক্রান্ত নথি এবং কেওয়াইসি প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে, তা তদন্তের আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তিনি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও নিজের নিরাপত্তার জন্য এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন তিনি।
প্রতারণার জালে ব্যাংক হিসাব
টাকা পাঠানোর পর প্রতারকেরা যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। পরে তদন্তে টাকা যাওয়া ব্যাংক হিসাবগুলোর তথ্য ও স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করে পুলিশ। সেই সূত্রেই ইমরান হাফিজের নামে খোলা হিসাবটির সন্ধান পাওয়া যায়।
পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, ইমরানের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে অন্যের হাতে গেল এবং তার অজান্তে কীভাবে ব্যাংক হিসাবটি খোলা হলো। একই সঙ্গে হিসাব খোলার সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ও এজেন্টের বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে। হিসাব খোলার সময় ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন নথিতে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
এসব অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ কয়েকটি সংঘবদ্ধ সাইবার অপরাধী চক্রের সন্ধান পেয়েছে। চক্রগুলোর সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্তের পাশাপাশি অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. শামীম হোসেন টিবিএসকে বলেন, 'অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাবে থাকা ব্যক্তি নিজেই জানেন না তার নামে খোলা হিসাবে বড় অংকের অর্থের লেনদেন হয়েছে। কখনো অসচ্ছল ব্যক্তিদের সহায়তার কথা বলে এনআইডি সংগ্রহ করে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। আবার কেউ কেউ নিজের ব্যাংক হিসাব অন্যের ব্যবহারের জন্য ভাড়া দিয়ে দেন। পরবর্তীতে ওই হিসাবে অবৈধ অর্থ লেনদেন হলেও মালিক পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নাও থাকতে পারেন।' তিনি জানান, এসব ক্ষেত্রে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য পেতে আদালতের অনুমতিসহ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়।
বদলাচ্ছে সাইবার অপরাধের ধরন
সিএমপির সাইবার সাপোর্ট অ্যান্ড রেসপন্স সেন্টারে আসা অভিযোগ বিশ্লেষণ করে পুলিশ বলছে, সাইবার অপরাধ এখন আর শুধু হ্যাকিং বা অনলাইন হয়রানিতে সীমাবদ্ধ নেই। সেন্টার চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২৯১টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৮৪টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক—যার মধ্যে হ্যাকিং, অপপ্রচার, মানহানি ও হুমকির অভিযোগ রয়েছে। ডিজিটাল লেনদেন ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এসেছে ৯৩টি। বাকি অভিযোগগুলো মোবাইল হারানো, নিখোঁজ ব্যক্তি ও অন্যান্য বিষয়ে।
ডিসি শামীম বলেন, 'সাইবার বুলিং বা মানহানিকর কনটেন্টের ক্ষেত্রে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। তবে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও লেনদেনের রেকর্ড প্রয়োজন হওয়ায় ভুক্তভোগীদের থানায় বা সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে বলা হয়।'
তদন্তে একই চক্রের একাধিক অপরাধে সংশ্লিষ্টতার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। ডিসি শামীম বলেন, 'কাস্টমসের সার্ভার হ্যাক করে পণ্য খালাসের চেষ্টার ঘটনায় গ্রেপ্তার একজনের সাথে জন্মনিবন্ধনের সার্ভার হ্যাক করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। একটি চক্রের সদস্যরা বারবার একই ধরনের সাইবার অপরাধে যুক্ত থাকার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।'
ভুয়া সিম ও ব্ল্যাকমেইল নিয়ে উদ্বেগ
সাইবার অপরাধ তদন্তে ভুয়া বা অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম এবং ব্যাংক হিসাব বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করছে। ডিসি শামীম বলেন, 'নম্বর খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় 'নো রেকর্ড' পাওয়া যায়। পরিপূর্ণভাবে যাচাই না করে হিসাব খোলা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।'
এছাড়া সেন্টারে আসা অভিযোগের বড় একটি অংশ নারীদের বুলিং, মানহানি এবং ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের। ডিসি শামীম বলেন, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে আগে ধারণ করা ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ বা অন্য সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর পাশাপাশি অনলাইন জুয়া, ব্যাংকিং অ্যাপ এবং বিকাশ-নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও আসছে।
বর্তমানে মাত্র দুইজন কর্মকর্তা দিয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলছে এই সাইবার সাপোর্ট সেন্টার। মহানগরের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ সহায়তার জন্য এখানে আসছেন।
বিশেষজ্ঞের অভিমত ও সতর্কবার্তা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন টিবিএসকে বলেন, 'সময় বদলের সঙ্গে অপরাধের ধরনও বদলেছে। এখন সাইবার ক্রাইম, অনলাইন ফ্রড, মানি লন্ডারিং ও হ্যাকিং বাড়ছে। তাই অপরাধীদের কৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অপরাধ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও আধুনিক করতে হবে। কাস্টমস, এনআইডি বা জন্মনিবন্ধনের মতো সরকারি সার্ভারে হামলা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এসব ক্ষেত্রে অফিসের অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে হবে।'
ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে দুর্বলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়ী না করে ব্যাংকেরও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অনিয়মের জন্য ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক হবে। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।'
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড