শিরোনাম
◈ মিয়ানমারে সহিংসতা-নির্যাতনে বিপর্যস্ত মানুষ, রোহিঙ্গাদের অবস্থা আরও ভয়াবহ: জাতিসংঘ ◈ ‘উপহার’ হিসেবে বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী নেবে মালয়েশিয়া: প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ◈ রংপুরে চার হত্যা: ‘ধর্ষণের আলামত’ নিয়ে ডোম-চিকিৎসকের বক্তব্যে ভিন্নতা ◈ বিড়ালের আঁচড়ের পর শিশুর ‘মিউ মিউ’ শব্দ, জানুন আসল ঘটনা ◈ মহানবীর আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই: রাষ্ট্রপতি ◈ জামায়াতের মতাদর্শের বিষয়ে সতর্ক করলেন কওমি আলেমরা ◈ বিদিশা এরশাদ গ্রেপ্তার: প্রতারণা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, গুলশান থেকে আটক ◈ কারখানা থেকে ক্লাসরুম, রোবট বিপ্লবে বদলে যাচ্ছে চীন ◈ গুম হওয়া ২৫০ জনের সন্ধান মেলেনি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অপহরণের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে: চিফ প্রসিকিউটর ◈ দুই ডিআইজিসহ পুলিশের ১৭ কর্মকর্তা বদলি

প্রকাশিত : ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ১২:১৫ রাত
আপডেট : ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ০১:৩৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বিড়ালের আঁচড়ের পর শিশুর ‘মিউ মিউ’ শব্দ, জানুন আসল ঘটনা

অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস টুডে’ গত ২০ আগস্ট তাদের ফেসবুক পেজে ‘পোষা বিড়ালের আঁচড় খেয়ে অস্বাভাবিক আচরণ বালিকার’ শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। ভিডিওটিতে এক শিশুকে বিড়ালের মতো ‘মিউ মিউ’ শব্দ করতে দেখা যায়। তবে ভিডিওটির ক্যাপশন বা বিবরণে ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তির কণ্ঠে শোনা যায়, ‘এটি দেখে জলাতঙ্ক মনে হচ্ছে। এর চিকিৎসা কুষ্টিয়ায় নেই। রাজশাহীতে নিতে হবে।’

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুর পর্যন্ত ভিডিওটি প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ বার দেখা হয়েছে। ‘টাইমস টুডে’র পাশাপাশি চ্যানেল আই, এশিয়া পোস্ট, ভোরের কাগজসহ আরও কয়েকটি গণমাধ্যমও ঘটনার বিস্তারিত তথ্য না জানিয়েই ভিডিওটি প্রচার করে।

এরপর এসব পোস্টের মন্তব্যের ঘরে শিশুটিকে ঘিরে নানা ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়। কেউ কেউ ঘটনাটিকে শিশুটির ‘নাটক’ বলে দাবি করেন। আবার অনেকে প্রশ্ন তোলেন, বিড়ালের আঁচড়ের কারণে শিশুর এমন আচরণ করার আদৌ কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা।

রিউমর স্ক্যানারের ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন টিম বিষয়টি যাচাই করে দেখেছে। জানা গেছে, শিশুটিকে গত ১৭ আগস্ট কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শে পরে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করা হয়। শিশুটির প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে। বর্তমানে সেই অনুযায়ীই তার চিকিৎসা চলছে।

অনুসন্ধানে গত ১৭ ও ১৮ আগস্ট কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের দুই কর্মকর্তার ফেসবুক পোস্ট (১, ২) সূত্রে জানা যায়, আগেরদিন অর্থাৎ, ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় শিশুটির মা-বাবা শিশুটিকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসে। মেয়েটি বিড়ালের মতো আচরণ করছিল সে সময়। পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়, পাঁচ বছর বয়সী শিশুটি বাসার পোষা বিড়ালের আঁচড়ে (র‍্যাবিস/জলাতঙ্ক) আক্রান্ত। পাঁচ মাস আগে তাকে র‍্যাবিস ভ্যাকসিনও দেওয়া হয়েছিল।

অর্থাৎ, ১৭ আগস্টের ঘটনা ২০ আগস্টের পর ভাইরাল হয়েছে গণমাধ্যমের মাধ্যমে। 

গণমাধ্যমের পোস্টগুলোতে যেমন বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক চলছিল তেমনি পরবর্তী কয়েকদিনে বিড়াল বা এ জাতীয় পোষা প্রাণীদের চিকিৎসকরাও সরব হয়ে উঠেন বিষয়টি নিয়ে। ফারহান হাসান নামে এক চিকিৎসক লিখেছেন, ‘এই ভিডিও পুরাই নাটক। জলাতঙ্ক হলে কখনো কেও এমন আচরণ করে না। এগুলো হয়তো ভিউ পাওয়ার জন্য স্ক্রিপটেড। আর না হয় মেয়েটি মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

আনিসুর রহমান নামে আরেক চিকিৎসক বলছেন, বিড়ালের আঁচড় থেকে কোনোদিনও আচরণ কখনো সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সূত্রগুলোও একই বার্তা দিচ্ছে। শিশুরা স্বাভাবিকভাবে বিড়ালের আঁচড়ের কারণে বিড়ালের মতো ‘মিউ মিউ’ শব্দ করে না। বিড়ালের আঁচড় থেকে ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ (Bartonella henselae নামক ব্যাকটেরিয়া) বা শারীরিক ব্যথা ও ভয় থেকে শিশু কান্নাকাটি করা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, কিংবা আতঙ্কিত আচরণ করতে পারে, কিন্তু এটি তাদের ডাক বা কণ্ঠে কোনো পরিবর্তন আনে না। 

রিউমর স্ক্যানার খবর নিয়ে জানতে পারে, শিশুটির নাম মুস্তারীন আদ্রিতা। সে ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর এলাকার ব্যাংকার সাব্বিরের মেয়ে। 

কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ইকবাল হোসেন ২২ আগস্ট সাংবাদিকদের জানান, বিড়ালের আঁচড়ের পর শিশুটিকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও র‍্যাবিসের টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে শিশুটির মধ্যে জলাতঙ্কের কোনো লক্ষণ নেই।

শিশুটির বর্তমান আচরণ প্রসঙ্গে ডা. ইকবাল বলেন, ‘মিউ মিউ’ শব্দ করা বা অস্বাভাবিক আচরণ জলাতঙ্কের কারণে হয়েছে— এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ভয় বা মানসিক চাপের কারণেও শিশুর এমন আচরণ হতে পারে। 

অর্থাৎ, কুষ্টিয়ার চিকিৎসকরা শিশুটির এমন আচরণের কারণ জানতে পারেননি।

২২ আগস্ট সন্ধ্যায় শিশুটির মামা মো. আলিফ রহমান এক ফেসবুক পোস্টে জানান, শিশুটি আগের থেকে অনেকটা সুস্থ এখন। পোস্টে সংযুক্ত ভিডিওতে শিশুটিকে স্বাভাবিকভাবে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে হেঁটে বেড়াতে দেখা যায়।

আলিফ তার পোস্টে জানান, ‘যারা এই ভিডিওটা নিয়ে লেখালেখি করছেন বা হাসাহাসি করছেন এগুলো আসলে আমাদের জন্য অনেক কষ্টকর আপনারা না জেনে শুনে আজেবাজে কমেন্ট করবেন না পোস্টে।’ 

গতকাল শিশুটির মায়ের একটি বক্তব্য পাওয়া গেছে। তিনি জানান, ‘কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল থেকে আমাদের ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়। এখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, এটি জলাতঙ্ক নয়, মেয়ের প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে। বর্তমানে সেই অনুযায়ীই তার চিকিৎসা চলছে। তবে তার কাশি কিছুটা বেশি।’

আদ্রিতার মা বলেন, ‘আমার মেয়ে গত দুই বছর ধরে ঠান্ডা ও অ্যাজমার সমস্যায় ভুগছে। কুষ্টিয়ায় একজন চিকিৎসকের অধীনে দীর্ঘদিন ধরে তার চিকিৎসা চলছে। ঠান্ডাজনিত সমস্যার কারণে মাঝেমধ্যেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের বাসায় দুটি পোষা বিড়াল ছিল। সেগুলো হঠাৎ করে চলে যাওয়ার পর মেয়ের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। পরবর্তীতে তার প্যানিক অ্যাটাক হয় বলে আমরা মনে করছি।’

শিশুটি এখনও হাসপাতালেই রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মেয়ের বুকের এক্স-রে পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকেরা রিপোর্ট দেখে সবকিছু ভালো থাকলে এক-দুই দিনের মধ্যে তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিতে পারেন।’

প্যানিক অ্যাটাকের কারণে শিশুটির এমন আচরণের সম্ভাবনাটি সমর্থন করে আন্তর্জাতিক উৎসগুলোও। ইউনিসেফ বলছে, তীব্র ভয়ের মুহূর্তে শিশু দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার ফলে গলার মাংসপেশি সংকুচিত হয়ে এবং শ্বাসনালীর তীব্র টানাপোড়েনে কান্না বা গোঙানির মতো স্বাভাবিক স্বর বদলে যেতে পারে। এমএসডি ম্যানুয়ালস এর এক লেখায়ও এসেছে, অতিরিক্ত প্যানিক অ্যাটাকের শারীরিক লক্ষণ হিসেবে শিশুদের মধ্যে হাঁপানো বা অদ্ভুত শব্দের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়। ২০১৭ সালের এক গবেষণায়ও বলা হয়েছে, কোনো ভীতিজনক ঘটনার মুখোমুখি হয়ে শিশু যদি মানসিকভাবে চরম আঘাত পায়, তবে সে ‘ডিসোসিয়েশন’ (Dissociation) বা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো অবস্থায় চলে যেতে পারে এবং অবচেতনভাবে বিড়ালের ডাকের অনুকরণ কিংবা অন্যান্য অস্বাভাবিক আচরণ প্রদর্শন করতে পারে। 

আলোচিত এই ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি যেমন শিশুটির আচরণ নিয়ে নানা ধরনের অনুমান ও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে, তেমনি কোনো যাচাই ছাড়াই একাধিক গণমাধ্যমে ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়ায় সেই বিভ্রান্তি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশুটির পরিচয়, ঘটনার স্থান, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ কিংবা তার আচরণের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে কোনো তথ্য না থাকায় দর্শকদের একটি বড় অংশ নিজস্ব ধারণা থেকে মন্তব্য করেছেন। কেউ ঘটনাটিকে ‘নাটক’ বলেছেন, কেউ আবার সরাসরি জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার দাবি করেছেন।

তবে পরবর্তী অনুসন্ধান ও চিকিৎসকদের বক্তব্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে, শিশুটির জলাতঙ্ক হয়নি। ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা তার আচরণকে প্যানিক অ্যাটাক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ফলে প্রাথমিকভাবে ভিডিও দেখে শিশুটির রোগ নির্ণয় করা বা তাকে নিয়ে উপহাস-বিদ্রূপ করা দুটিই ছিল অযাচিত। এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি শিশুর অসুস্থতা বা অস্বাভাবিক আচরণকে কেন্দ্র করে যাচাইহীন তথ্য প্রচার কতটা দ্রুত জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে এমন সংবেদনশীল ভিডিও প্রকাশের আগে ঘটনার স্থান, সময়, রোগীর পরিচয় ও চিকিৎসকদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে না গিয়ে দায়িত্বশীল আচরণের প্রতি মনোযোগ দিতে বলছেন শিশু বিশেষজ্ঞরা।

  • সর্বশেষ