ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকার লাউতলা খাল থেকে শুরু হয়েছে রাজধানীর অন্যতম বড় রামচন্দ্রপুর খাল। সেখান থেকে মোহাম্মদিয়া হাউজিং ও শেখেরটেকের পেছন দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খালটি তুরাগ নদে গিয়ে মিশেছে। একসময়ের প্রশস্ত এ খাল এখন দখল ও দূষণে অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে। ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সিএস) খতিয়ান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খালটির প্রায় অর্ধেক অংশই বর্তমানে দখলদারদের দখলে। সূত্র: বণিক বার্তা প্রতিবেদন
অন্যদিকে মিরপুরে ডিএনসিসির ৩ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত আরেকটি বড় জলাধার বাইশটেকী খাল। সাংবাদিক কলোনি, ভাসানটেক ও বাইশটেকী এলাকার পানি নিষ্কাশন এ খালের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব এলাকার সুয়ারেজের পানিও এ খাল দিয়েই নিষ্কাশিত হয়। এক দশক আগেও খালটির প্রস্থ ছিল ২০-২৫ ফুট। বর্তমানে কোথাও তা পাঁচ-সাত ফুটে, আবার কোথাও দুই-তিন ফুটে নেমে এসেছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ডিএনসিসি ৪০ ফুট প্রশস্ত একটি রাস্তা নির্মাণ করতে গিয়ে খালটি আরো সংকুচিত করে ফেলে।
এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দিয়াবাড়ি, ইব্রাহিমপুর, কল্যাণপুর, বাউনিয়া ও দ্বিগুন এলাকার খালগুলোও দখল-দূষণে বিপর্যস্ত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন খালগুলোর অবস্থাও একই। কুতুবখালী, শ্যামপুর, রায়েরবাজার ও কামরাঙ্গীরচরের বিভিন্ন খালে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নেই; পানির বদলে প্রবাহিত হচ্ছে কালো ও দূষিত বর্জ্য।
২০২১ সালে ঢাকা ওয়াসা থেকে খালগুলোর দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে তাতে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও খাল পুনরুদ্ধার ও দখলমুক্ত করার কাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং প্রায় দেড় বছর ধরে দুই সিটি করপোরেশনের নিয়মিত খাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায়। এবারের ভারি বর্ষণে বারবার জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে পড়েছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল পুনরুদ্ধারে দুই সিটি করপোরেশনের এ নিষ্ক্রিয়তা অব্যাহত থাকলে সামনে রাজধানীর পরিবেশগত সংকট আরো তীব্র হতে পারে।
দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেড় বছর ধরে খাল ঘিরে তাদের নিয়মিত কার্যক্রম অনেকটাই বন্ধ রয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদলে নগরসেবার বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খাল ব্যবস্থাপনাতেও। ফলে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং দখল উচ্ছেদ কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, জলাবদ্ধতাসহ নানা সংকটে জর্জরিত ঢাকার খাল পুনরুদ্ধার সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় শুরুতেই থাকা উচিত ছিল। কিন্তু গত ছয় মাসে এ বিষয়ে দুই সিটি করপোরেশনের দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার খাল খননের কথা বলে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। এ প্রেক্ষাপটে সারা দেশেই খাল খনন কর্মসূচি চলছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো ঢাকার খাল পুনরুদ্ধারে সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। অথচ আমাদের প্রত্যাশা ছিল, ঢাকার খাল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমেই সারা দেশের খাল পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু হবে।’
খাল পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ার পাশাপাশি দখলদারদের চিহ্নিত করতেও উদ্যোগ নেয়া হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঢাকার খাল পুনরুদ্ধারে সরকারের এ নীরবতা আমাদের মনে সন্দেহ তৈরি করেছে—সরকার দখলদারদের ভয় পায় কিনা। অথবা দখলদাররা মুখোশ পাল্টে সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছে কিনা, সেটিও আমাদের প্রশ্ন। তা না হলে এ সরকারের প্রথম কাজই তো হওয়া উচিত ছিল, বিগত সময়ে খাল ও জলাশয় দখল করে যারা ঢাকার বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে, তাদের বিস্তারিত তালিকা তৈরি করা। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো সরকার সেটিও করেনি।’
বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশন খাল নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা না করলেও ডিএসসিসির একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় মান্ডা, জিরানি, শ্যামপুর ও কালুনগর খাল পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। প্রকল্পটি সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের সময়ে অনুমোদন পেয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের পরিধি কাটছাঁট করে খাল পুনরুদ্ধারের কাজও সংকুচিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ডিএসসিসির আওতাধীন চারটি খালের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও খালপাড়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকল্পটি ২০২৪ সালে অনুমোদন পায়। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকল্পটি দ্বিতীয়বার সংশোধন করা হয়। আগের পরিকল্পনায় ৫৮ পর্বে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সংশোধিত প্রকল্পে তা প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে ৩০টি করা হয়।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক পরিকল্পনায় সিএস ম্যাপ অনুসারে চারটি খালের সীমানা নির্ধারণ এবং পানি আইন অনুযায়ী দুই পাড়ের ১০ মিটার পর্যন্ত জায়গা খালের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা ছিল। একই সঙ্গে খালগুলো নান্দনিক করতে বিভিন্ন অংশে পার্ক, গণপরিসর ও হাঁটার জায়গা রাখার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু সংশোধিত পরিকল্পনায় এসব বাদ দেয়া হয়েছে এবং খালের নির্ধারিত পরিধিও আরো সংকুচিত করা হচ্ছে বলে সূত্রটির অভিযোগ।
কাজের পরিধি কমিয়ে আনার বিষয়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘খালের মূল কাজ পানিপ্রবাহ সচল রাখা। খাল কিছুটা সরু করা হলেও পানি চলাচলে সমস্যা হবে না। একই সঙ্গে পানি আইন পুরোপুরি অনুসরণ করতে গেলে উচ্ছেদসংক্রান্ত জটিলতা বাড়তে পারে। এ কারণেই সে পথে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’
তবে ডিএসসিসির এ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত নন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খালকে শুধু পানিপ্রবাহের নালা হিসেবে বিবেচনা করলে এর জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পান্থপথ, শাহবাগ ও মতিঝিলের খালগুলোকেও সরকার শুধু পানিপ্রবাহের লাইন হিসেবে দেখেছে। তাই এসব খালের ওপর বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে খালগুলোর জীববৈচিত্র্য পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ডিএসসিসি যদি এখনো মনে করে, শ্যামপুরসহ অন্য খালগুলো দিয়ে শুধু পানি প্রবাহিত হলেই হবে এবং সে জন্য খাল যতটা সম্ভব সরু করেও উন্নয়ন করা যাবে, তাহলে সেই চিন্তাই ভুল। খাল শুধু পানিপ্রবাহের নালা নয়; এটি জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং নগরের তাপ শোষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’
ডিএসসিসির চলমান খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে শ্যামপুর খালকে ঘিরে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের আওতাধীন চারটি খালের মধ্যে দখল ও অবনতির দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে এ খাল। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে, অন্য খালগুলোয় পানিপ্রবাহ কম থাকলেও বড় ধরনের দখল নেই। বিপরীতে শ্যামপুর খালে দখলের মাত্রা বেশি এবং এর প্রাকৃতিক অস্তিত্বও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, শ্যামপুর খালের সিএস সীমানার ভেতরেই ডিএসসিসি সড়ক নির্মাণ করেছে। কোনো কোনো অংশে খালের প্রস্থের প্রায় অর্ধেক জায়গা দখল করে এ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। যদিও সংস্থাটির দাবি, সিএস ম্যাপ অনুসরণ করেই খাল পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। তবে সরজমিনে দেখা গেছে, খালের বড় অংশ দখল করে সড়ক, নিচু উচ্চতার সেতু ও বিভিন্ন ব্যক্তিগত স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবাদী সংগঠন ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সিএস ম্যাপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করে খালটি পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়ে এলেও বাস্তবায়নে তা গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিদ্যমান দখলের বড় অংশ অক্ষুণ্ন রেখেই খাল পুনরুদ্ধারের কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
এদিকে দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বড় পরিসরে খাল পুনরুদ্ধার কার্যক্রম না চললেও বর্তমানে তারা খালগুলোর সীমানা নির্ধারণে কাজ করছেন। এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের ২৯টি খাল রয়েছে। প্রথমে খালগুলোর সীমানা নির্ধারণের কাজ শেষ করব। এরপর পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হবে।’
সীমানা নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি জটিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের খালগুলো সিএস, আরএস ও বিএস—এই তিন মানচিত্রে তিন রকমভাবে দেখানো হয়েছে। ফলে কোন খাল কোথায় এবং কতটুকু, সেটি নির্ধারণ করা জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরই মধ্যে আমরা একটি মডেল তৈরি করেছি। এ নিয়ে একটি প্রেজেন্টেশনও রয়েছে। সব স্টেকহোল্ডার এক সিদ্ধান্তে আসতে পারলে সীমানা-সংক্রান্ত জটিলতা দূর করা সম্ভব হবে।’
একই ধরনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের চারটি খাল নিয়ে পৃথক একটি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এর বাইরে আরো ১৭টি খাল নিয়েও কাজ শুরু করেছি। প্রথমে এসব খালের সীমানা নির্ধারণ করা হবে। সীমানা নির্ধারণের কাজ শেষ হলে খালগুলো কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়, সে বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’