দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এই শিল্পে কর্মরত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের জীবিকা যেমন এর ওপর নির্ভরশীল, তেমনি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও খাতটির অবদান অপরিসীম। তবে দীর্ঘদিন ধরে মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন এই শিল্পের শ্রমিকরা। তাদের অভিযোগ, বর্তমান মজুরি দিয়ে ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও ক্রয়াদেশের চাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন পোশাক কারখানার মালিকেরা। এমন পরিস্থিতিতে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন পোশাকশিল্প এলাকা।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, সাভারসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এরই মধ্যে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমানে গার্মেন্টসকর্মীরা কত টাকা বেতন পান, তাদের গ্রেডভিত্তিক মজুরি কত এবং ৩০ হাজার টাকার দাবির পেছনে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের যুক্তিগুলো কী?
গার্মেন্টস শ্রমিকরা বর্তমানে কত টাকা বেতন পান?
দীর্ঘদিনের শ্রমিক আন্দোলন ও মজুরি বৃদ্ধির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। ওই বছরের ১২ নভেম্বর সরকার নতুন মজুরি কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত কাঠামোয় ৪টি গ্রেড নির্ধারণ করা হয়। নতুন মজুরি ১ ডিসেম্বর ২০২৩ থেকে কার্যকর হয় এবং শ্রমিকেরা ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন কাঠামোয় বেতন পান।
বর্তমান কাঠামোয় সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তবে এটি মূল বেতন নয়; বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও খাদ্য ভাতাসহ মোট মাসিক মজুরি।
২০২৩ সালের মজুরি কাঠামো অনুযায়ী গ্রেডভিত্তিক সর্বনিম্ন মজুরির চিত্র হলো-
| গ্রেড | মূল বেতন | মোট মাসিক মজুরি |
| গ্রেড-১ | ৮,৩৯০ টাকা | ১৫,০৩৫ টাকা |
| গ্রেড-২ | ৭,৮৮২ টাকা | ১৪,২৭৩ টাকা |
| গ্রেড-৩ | ৭,৪০০ টাকা | ১৩,৫৫০ টাকা |
| গ্রেড-৪ | ৬,৭০০ টাকা | ১২,৫০০ টাকা |
সর্বনিম্ন গ্রেডের ১২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে মূল বেতন ৬ হাজার ৭০০ টাকা, বাড়িভাড়া ৩ হাজার ৩৫০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৭৫০ টাকা, যাতায়াত ভাতা ৪৫০ টাকা এবং খাদ্য ভাতা ১ হাজার ২৫০ টাকা।
এ ছাড়া শিক্ষানবিশ শ্রমিকদের জন্য তিন মাসের শিক্ষানবিশকাল নির্ধারিত রয়েছে। এ সময়ে তাদের মোট মাসিক মজুরি ৯ হাজার ৮৭৫ টাকা।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের মজুরি কাঠামোয় মূল বেতনের ওপর বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের বিধান রয়েছে। তবে শ্রমিকের পদ, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, কর্মঘণ্টা ও অতিরিক্ত কাজের ওপর নির্ভর করে প্রকৃত মাসিক আয় ভিন্ন হতে পারে।
কেন আবারও আন্দোলনে নেমেছেন শ্রমিকরা?
২০২৩ সালে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হওয়ার পরও শ্রমিকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, বর্তমান বাজারদরের তুলনায় তাদের আয় যথেষ্ট নয়। চাল, ডাল, তেল, সবজি, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
শ্রমিকদের একটি অংশের দাবি, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় তাদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি বাড়িয়ে অন্তত ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। পাশাপাশি বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ, নিয়মিত বেতন প্রদান, শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, চাকরির নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের হয়রানি ও কালো তালিকাভুক্ত করার মতো চর্চা বন্ধের দাবিও সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, সব শ্রমিক সংগঠনের দাবির পরিমাণ এক নয়। বিভিন্ন সময়ে ১৬ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিও সামনে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক আন্দোলনে ৩০ হাজার টাকার দাবিই বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে কী ঘটছে?
২০২৬ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ঢাকার উত্তরা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে তা সাভারের আশুলিয়া, গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
৩১ অক্টোবর শ্রমিকেরা ঢাকা, গাজীপুর ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেন। এ সময় আশুলিয়ার অন্তত ৩০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে, শ্রমিক সংগঠনের একজন নেতার দাবি, বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছিল।
১ নভেম্বরও আন্দোলন অব্যাহত থাকে। রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বরে সকাল থেকে শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করেন। এতে মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরিস্থিতির কারণে মিরপুর-১০ মেট্রোরেলের প্রবেশপথও বন্ধ রাখা হয়।
একই দিন গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা অবস্থান নেন। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়। কিছু এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। সংঘাতের মধ্যে কয়েকটি কারখানা বন্ধ রাখতে হয়।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিনের পরিস্থিতিতে গাজীপুরে ২৫ থেকে ৩০টি কারখানা বন্ধ করা হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়।
১ নভেম্বর নতুন মজুরি বোর্ড গঠন
শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে রোববার (১ নভেম্বর) পোশাক শ্রমিকদের জন্য নতুন ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বোর্ড গঠনের বিষয়টি জানান।
বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।
মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২০২৬ সালের সংশোধিত বিধান অনুযায়ী এই বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের দায়িত্ব হলো মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে পোশাকশ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করা।
এর আগে ৩১ অক্টোবর শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর শ্রমমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বানও জানানো হয়। তবে ১ নভেম্বরও বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল।
নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে মালিকপক্ষের উদ্বেগ
পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ক্রয়াদেশের ওঠানামা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক কারখানা আর্থিক চাপে রয়েছে।
মালিকপক্ষের মতে, শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। তবে একই সঙ্গে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা এবং ব্যবসার আর্থিক বাস্তবতাও দেখতে হবে।
তাদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে মজুরি বাড়ানো হলে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো বেশি চাপে পড়তে পারে। এতে কারখানা বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য, মালিকপক্ষের ব্যবসায়িক সক্ষমতার পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়কেও গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ বহন করতে গিয়ে শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। তাই দ্রুত নতুন মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবির পাশাপাশি পোশাকশিল্পের ভেতর থেকেই কিছু ভিন্নমত সামনে এসেছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক পোশাকশ্রমিক বলেন, বর্তমানে ১২ হাজার ৫০০ টাকা মোট মাসিক মজুরির একজন শ্রমিক ওভারটাইম, হাজিরা বোনাস ও টিফিন সুবিধাসহ মাসে প্রায় ১৭ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। তার মতে, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলে অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হয়ে একজন শ্রমিকের মোট আয় আরও অনেক বেড়ে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, একজন নতুন হেলপারকে নিয়োগ দেওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস কাজ শেখাতে হয়। অনেকের আগে থেকে কোনো কাজের অভিজ্ঞতা থাকে না। তাদের মেশিন চালানো, উৎপাদন প্রক্রিয়া বোঝা এবং কারখানার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণ দিতে হয়। এ সময়ে তাদের উৎপাদনক্ষমতা অভিজ্ঞ শ্রমিকদের মতো থাকে না। তাই নতুন শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা উচিত।
তার প্রশ্ন, দেশের সব পোশাক কারখানার কি একযোগে এত বেশি মজুরি দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে? বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর পক্ষে এই ব্যয় বহন করা কতটা সম্ভব, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ওই শ্রমিকের আশঙ্কা, নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলে শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তিনি অন্তত ১০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেন। তবে এই সংখ্যার পক্ষে কোনো স্বাধীন পরিসংখ্যান বা যাচাইকৃত প্রক্ষেপণ পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও মজুরির দাবিকে সমর্থন করার আগে শিল্পের বাস্তব সক্ষমতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। যারা শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন, তাদের নিজেদের বাসায় কর্মরত গৃহকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং চাকরি শেষে আর্থিক সুবিধার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
তার মতে, শুধু কেউ দরিদ্র বা নিম্নআয়ের মানুষ হলেই তার প্রতিটি দাবিকে যাচাই-বাছাই ছাড়া সমর্থন করা উচিত নয়। হকার, অটোরিকশাচালক কিংবা পোশাকশ্রমিক- সবার দাবির ক্ষেত্রেই ন্যায্যতা, বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।
যদিও তিনি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেননি। তার বক্তব্য, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি শিল্পের টিকে থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্প টিকে থাকলে কর্মসংস্থান থাকবে, আর কর্মসংস্থান থাকলেই শ্রমিকদের জীবিকা নিশ্চিত হবে।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি বনাম শিল্পের সক্ষমতা
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এই খাত থেকে। পাশাপাশি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ শিল্পের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ।
ফলে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি শুধু একটি শিল্পের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
একদিকে শ্রমিকদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে, কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় ও আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার নেতিবাচক প্রভাব কর্মসংস্থানের ওপরও পড়তে পারে।
এ অবস্থায় নতুন মজুরি বোর্ডের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার বাস্তব ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতা, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা এবং কারখানাগুলোর আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমন্বয় তৈরি করা।
শ্রমিক, মালিক ও সরকারের আলোচনার ভিত্তিতে এমন একটি মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হয়, আবার শিল্পের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে না পড়ে। শেষ পর্যন্ত দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতের স্থিতিশীলতা এবং লাখো শ্রমিকের জীবিকা নিশ্চিত করতে একটি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সূত্র: কালবেলা