হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে দর-কষাকষিতে তাদের চারটি ‘কঠিন শর্তে’ সম্মতি দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ঢাকার প্রধান বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে আগামী ১৫ বছর অন্য কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দর বাণিজ্যিকভাবে চালু না করার শর্তেও রাজি হয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে দর-কষাকষি শেষে নভেম্বরের মাঝামাঝি চূড়ান্ত চুক্তি এবং ১৬ ডিসেম্বর সীমিত পরিসরে উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বেবিচক।
নির্মাণ শেষ, চালু নিয়ে দীর্ঘ জটিলতা : ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের কাজ ৯৯ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হওয়ার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে এর সীমিত পরিসরে উদ্বোধন করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা চুক্তি নিয়ে নতুন করে আরো জটিলতা তৈরি হয়।
এ নিয়ে বেবিচক দুই বছরে ২০টির বেশি বৈঠক করেও সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি। বিমান চলাচল খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা টার্মিনালটি চালু হতে বিলম্বের জন্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘ নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতাকে দায়ী করেছেন, যার ফলে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও দেশের একটি প্রধান অবকাঠামোগত সম্পদ অব্যবহৃত রয়ে গেছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানি পক্ষের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করার জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন, যা নতুন করে আলোচনার পথ প্রশস্ত করে। টার্মিনালটি চালুর জন্য পরিচালনা চুক্তি চূড়ান্ত করা, দায়িত্ব বণ্টন এবং অপারেশনাল রেডিনেস অ্যান্ড এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার (ওরাট) কার্যক্রমের প্রস্তুতি এগোতে থাকে।
এরপর চুক্তির অমীমাংসিত বিষয়গুলো সুরাহা হচ্ছে। দুই লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের নতুন এই টার্মিনালটি চালু হলে শাহজালাল বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রীসেবা সক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ থেকে বেড়ে দুই কোটিতে উন্নীত হবে।
তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পরিচালন চুক্তি স্বাক্ষরে এখন আর কোনো অনিশ্চয়তা নেই বলে জানিয়েছেন বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এবং চুক্তি মূল্যায়ন কমিটির সহসভাপতি এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান।
তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চুক্তিসংক্রান্ত নেগোসিয়েশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং বিষয়টি সমাধানের পথেই রয়েছে। নেগোসিয়েশন অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে শেষ হয়েছে এবং রাজস্ব আয় ভাগাভাগির ক্ষেত্রে বেবিচকের অংশ ২৭ শতাংশের কম হবে না। তবে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত করে বলা সম্ভব নয়।’
ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে বেসামরিক বিমানবন্দর তৈরি না করার শর্ত নিয়ে তিনি বলেন, ‘চুক্তির ফলে নতুন রানওয়ে পরিকল্পনা বা নির্মাণে কোনো আইনি বাধা নেই। মূল বিষয় হলো, নির্মিত নতুন রানওয়ে বা বিমানবন্দর আগামী ১৫ বছরের আগে কোনো বাণিজ্যিক পরিচালনায় (কমার্শিয়াল অপারেশন) যেতে পারবে না। একটি নতুন রানওয়ে তৈরিতেই পাঁচ থেকে আট বছর সময় লেগে যায়, তাই এই শর্ত বেবিচকের উন্নয়ন পরিকল্পনায় কোনো সমস্যা তৈরি করবে না।’
দর-কষাকষির সঙ্গে যুক্ত বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় চারটি ধারায় সম্মতি দিয়েছে। ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৫ বছর প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দর চালু না করার শর্তেও বেবিচক রাজি হয়েছে।’
চুক্তির যে চারটি কঠিন শর্ত : চুক্তির চারটি বিতর্কিত বিষয় হলো রাজস্ব ভাগাভাগি, বাংলাদেশের আইনে পরিবর্তন এলে তার প্রভাব, ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের দায়কাল এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তিগত সম্পর্ক। তবে এসব ধারার চূড়ান্ত ভাষা, আর্থিক হিসাব এবং সরকারের সম্মতির বিস্তারিত শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
১৫ বছর নতুন বিমানবন্দর চালুতে বাধা : চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি হলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে আগামী ১৫ বছর কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দর বাণিজ্যিকভাবে চালু করা যাবে না। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই শর্তের প্রভাব তৃতীয় টার্মিনালের সীমানার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিমান পরিবহন পরিকল্পনার ওপর পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরো জানান, এ অবস্থায় ঢাকার কাছে বিকল্প বিমানবন্দর বা অতিরিক্ত রানওয়ে গড়ে তোলার সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়লে দীর্ঘ মেয়াদে বিমান চলাচল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
রাজস্বের পুরো অংশ মিলবে না : চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাজস্ব ভাগাভাগি। বেবিচক সূত্র জানায়, প্রাসঙ্গিক রাজস্বের ২৭ শতাংশ বাংলাদেশ পাবে। তবে পরিচালনার প্রস্তুতি থেকে আংশিক কার্যক্রম এবং পরে পূর্ণ কার্যক্রমে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে এই হার কার্যকর হবে না। এর আগে বলা হয়েছিল, আট মাসের পরিচালনাগত প্রস্তুতির সময় কনসোর্টিয়াম ১৩.৫ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। তবে ওই হার চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম : চুক্তির আরেকটি বিতর্কিত বিষয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও উড়োজাহাজ পরিচালনার কার্যক্রমের চুক্তিগত সম্পর্ক।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস একদিকে যাত্রী পরিবহন করে, অন্যদিকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাও দেয়। বেবিচকের ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, জাপানি কনসোর্টিয়াম বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিছু অর্থ পরিশোধ সংক্রান্ত নিয়ম বিমানের নিজস্ব এয়ারলাইনস কার্যক্রমেও প্রয়োগ করতে চেয়েছিল।
বেবিচকের ওই কর্মকর্তা প্রশ্ন তোলেন, দুটি পৃথক বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগের যৌক্তিকতা কী? তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও বিমানের নিজস্ব উড়োজাহাজ পরিচালনা পৃথক বাণিজ্যিক কার্যক্রম। পরে জাপানি পক্ষ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করে এবং মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থান গ্রহণ করে বলে ওই কর্মকর্তা জানান। তবে চূড়ান্ত চুক্তিতে এসংক্রান্ত শর্ত কিভাবে লেখা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
আইন পরিবর্তন ও ত্রুটির দায়কাল : বাকি দুটি বিতর্কিত বিষয় বাংলাদেশের আইনে পরিবর্তন এলে তার প্রভাব এবং টার্মিনালের ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের দায়কাল নিয়ে।
আগের প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের আইন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশেষ সুরক্ষা এবং ত্রুটি শনাক্ত বা সংশোধনের সময়সীমা নিয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য ছিল। তবে চূড়ান্ত চুক্তিতে কী ধরনের আইনি সুরক্ষা রাখা হয়েছে এবং ত্রুটির দায় কত দিন কার্যকর থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এ ধরনের শর্ত দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো পরিচালনার চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভবিষ্যতে আইন পরিবর্তন, নির্মাণগত ত্রুটি বা পরিচালনাগত সমস্যা দেখা দিলে কোন পক্ষের কী দায়িত্ব থাকবে, তা এসব ধারার ওপর নির্ভর করতে পারে।
একক দর-কষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান : তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার আলোচনায় জাপানি কনসোর্টিয়াম একমাত্র দর-কষাকষির পক্ষ হওয়ায় বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান আগে বলেছিলেন, ‘বিকল্প কোনো শক্তিশালী পরিচালনাকারী না থাকলে দর-কষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হতে পারে।’ তাঁর মতে, একক সম্ভাব্য পরিচালনাকারীর ওপর নির্ভরতা চুক্তির শর্তে ওই পক্ষের প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে।
তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে জাপানের অর্থায়ন ও উন্নয়ন সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে জাপানের স্বার্থ এবং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থ এক নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বাংলাদেশের আর্থিক ও কৌশলগত স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে, তা প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা জরুরি বলে জানিয়েছেন এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
১৬ ডিসেম্বর উদ্বোধন : সরকার আগামী ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে টার্মিনালটির আংশিক কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। ঋণের কিস্তিও শুরু হয়েছে। উদ্বোধনের দিন কতটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে, তা নিয়েও একমত হতে পারেনি দুই পক্ষ। প্রথম দিন অন্তত ১০টি নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করতে চায় বেবিচক। অন্যদিকে জাপানি পক্ষের প্রস্তাব মাত্র চারটি।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে তৃতীয় টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছিলেন, ১৬ ডিসেম্বর আংশিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০টি ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পরে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা হবে।
সূত্র: কালেরকন্ঠ