শিরোনাম
◈ যুবশক্তিকে কাজে লাগাতে পারলেই দেশের সাফল্য সম্ভব: রাষ্ট্রপতি ◈ ৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার সম্প্রসারণ প্রকল্প বাদ, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক নিয়ে নতুন পরিকল্পনা ◈ ৪০০ ছক্কার বিশ্বরেকর্ড, ভারত ধরাছোঁয়ার বাইরে ◈ গার্মেন্টস শ্রমিকদের বর্তমান বেতন কত, ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবির যৌক্তিকতা কতটা, কতটা সক্ষম মালিকপক্ষ? ◈ শ্রমিক অসন্তোষে জরুরি তৎপরতা, মন্ত্রীদের বৈঠক ডাকলেন প্রধানমন্ত্রী; আমিরাত সফর বাতিল শ্রমমন্ত্রীর ◈ সুইজারল্যান্ডে রাইন নদীতে মিলল খণ্ডিত মরদেহ, বাংলাদেশি রুমমেট গ্রেপ্তার ◈ শ্রমিক আন্দোলনে নাশকতার অভিযোগে ছাত্রলীগ-যুবলীগের ১১ নেতাকর্মী আটক ◈ গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভের মাঝেই গাজীপুরে কারখানার ঝুট গুদামে আগুন, যানজটে বিপাকে ফায়ার সার্ভিস ◈ তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় বান্ধবী দিশা গ্রেফতার, দীপের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ ◈ আগামী গ্রীষ্মে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে লোডশেডিং কমানোর আশা বিদ্যুৎমন্ত্রীর

প্রকাশিত : ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০৬:৩৪ বিকাল
আপডেট : ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:৩২ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার সম্প্রসারণ প্রকল্প বাদ, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক নিয়ে নতুন পরিকল্পনা

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ২৩২ কিলোমিটার লেনকে বৈদেশিক ঋণ সহায়তায় ছয় লেনে সম্প্রসারণের ৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার পরিকল্পনা বাতিল করেছে সরকার। এর পরিবর্তে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) অধীনে একটি নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার-নিয়ন্ত্রিত (এক্সেস কন্ট্রোলড) সম্পূর্ণ বা আংশিক উড়াল সড়ক বা এলিভেটেড  এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।

দেশের প্রধান বাণিজ্য ও যোগাযোগের এই লাইফলাইন বর্তমানে ক্রমবর্ধমান যানজটে জর্জরিত। বর্ষায় বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ব্যাহত হয় স্বাভাবিক চলাচল। এসব সমস্যায় ব্যবসাবাণিজ্যর জন্য মালামাল পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি ও সরবরাহ শৃঙ্খল—সবেই ব্যাঘাত ঘটে। এমন প্রেক্ষাপটেই, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের নীতিগত অনুমোদনের পর গত ৮ অক্টোবর বৈদেশিক সহায়তা অনুসন্ধান কমিটি ৫৫,০৮০ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণনির্ভর ছয় লেনের প্রস্তাবটি ফেরত পাঠায়। সভার কার্যবিবরণীতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, একই রুটে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সংশোধিত পরিকল্পনার কারণেই মূলত এই প্রস্তাবটি ফেরত পাঠানো হয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) কর্মকর্তারা জানান, দেশের ব্যস্ততম এই মহাসড়কে যানবাহনের ব্যাপক চাপ এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য জোরালো বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে সরকার এখন মহাসড়কটি মাটির ওপর সম্প্রসারণ না করে— পিপিপি-ভিত্তিক এক্সপ্রেসওয়ে মডেলকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

Advertisement

সওজ বর্তমানে তিনটি কাঠামোগত রূপরেখা মূল্যায়ন করছে। এর মধ্যে একটি হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পুরো এলিভেটেড করা, আরেকটি হলো– করিডোরের এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে উড়াল সেতু বা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, অথবা কেবলমাত্র যানজটপ্রবণ এলাকাগুলোতে উড়াল অংশ সীমাবদ্ধ রাখা।

এসব বিকল্প তুলে ধরে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করার জন্য একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করছে সওজ। এক্সপ্রেসওয়ের চূড়ান্ত নকশা, পরিধি ও আর্থিক কাঠামোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন সরকারপ্রধান।

সওজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, "প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত যদি পিপিপি মডেলে আসে, তাহলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ইনভেস্ট বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। নাহলে নতুন করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করা হবে।"

নাম প্রকাশ না শর্তে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বাণিজ্যিকভাবে এই রুট থেকে আর্থিক রিটার্ন পাওয়া অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।

"বর্তমানে যে যাত্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে, এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে সেটি চার ঘণ্টার কাছাকাছি নামিয়ে আনা গেলে পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি খরচ এবং সময়—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সাশ্রয় হবে। এই অর্থনৈতিক সুবিধার একটি অংশ টোল হিসেবে আদায় করা সম্ভব। ফলে দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের এ প্রকল্পে আগ্রহী হিসেবে পাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।"

'শুধু মহাসড়ক প্রশস্ত করে সমস্যার সমাধান হবে না'

সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, বিদ্যমান সড়ক শুধু প্রশস্ত করলেই যানজটের মতো মূল সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক যুক্তি দেন যে, সমতল সড়কের প্রধান দুর্বলতা হলো সেখানে কোনো প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ থাকে না, এবং সড়কের পাশে হাটবাজার ও ধীরগতির স্থানীয় যানবাহনের অবাধ উপস্থিতি থাকে।

তিনি বলেন, "মহাসড়কটিকে মাটির ওপর ৬, ৮ বা এমনকি ১০ লেনে সম্প্রসারণ করলেই এই করিডোরের যানজট সমস্যার সমাধান হবে না। সাম্প্রতিক সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ ও বন্যার কারণে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৩০–৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট দেখা গেছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতির পাশাপাশি যাত্রীরা ফ্লাইট ধরতে পারেননি, এমনকি রোগী পরিবহনও ব্যাহত হয়েছে। ফলে শুধু লেন বাড়ানো নয়, এই করিডোরের সেবার মান, গতি ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করাই মূল বিষয় হওয়া উচিত।"

শামসুল হকের মতে, ঢাকা–চট্টগ্রাম করিডোরে পুরোপুরি এলিভেটেড ও এক্সেস-কন্ট্রোলড (প্রবেশাধিকার-নিয়ন্ত্রিত) এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা উচিত। ইন্টারচেঞ্জভিত্তিক এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করা হলে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা তুলনামূলকভাবে কমানো সম্ভব হবে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নও তুলনামূলক দ্রুত করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোর দিক থেকেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে মাটির ওপর থাকা সড়কে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়েছে। এলিভেটেড অবকাঠামো হলে এ ধরনের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় ও জটিলতা কমিয়ে বিদ্যমান রাইট অব ওয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

তার মতে, প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি মডেলে বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে যৌক্তিক হবে। কারণ, পিপিপি মডেলের আওতায় কাজ হলে দীর্ঘমেয়াদী তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের যে মান নিশ্চিত হয়—যা সরকারি অর্থায়নের প্রকল্পে প্রায়ই দেখা যায় না।

"পিপিপি চুক্তির অধীনে বেসরকারি অপারেটরদের পুরো কনসেশনের মেয়াদজুড়ে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বাধ্যবাধকতা থাকে। অন্যদিকে সরকার নির্মিত সড়কগুলো যথাযথ দেখভালের অভাবে কয়েক বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পিপিপি'তে দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামোর মান ধরে রাখার সুযোগ বেশি।"

ড. শামসুল হক বলেন, "সরকারের আর দ্বিতীয়বার ভাবার প্রয়োজন নেই। ঢাকা–চট্টগ্রাম করিডোরে পিপিপির আওতায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ দ্রুত শুরু করা উচিত। যত দেরী হবে, বিদ্যমান মহাসড়কের ওপর চাপ তত বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।"

মহাসড়কে বাড়ছে চাপ

ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ততম ধমনী, যা দেশের প্রধান বাণিজ্য ও যাত্রী চলাচলের করিডোর হিসেবেও কাজ করে। দৈনিক আনুমানিক ৩০ হাজার যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করে এবং গবেষণা অনুযায়ী ২০৩০ সালে এই সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার, ২০৪০ সালে দৈনিক ১ লাখ ১৯ হাজারেরও বেশি হতে পারে।

আবার দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি পরিবহন করা হয় এই মহাসড়ক দিয়ে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে একটি পূর্বাভাসযোগ্য ও দ্রুতগতির করিডোরের দাবি জানিয়ে আসছে—যাতে রাজধানী ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হয়। তারা ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলছেন, দেশের প্রধান এই বাণিজ্যিক করিডোরেও একই ধরনের হাই-স্পিড কানেক্টিভিটি বা যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

এক দশকের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্তহীনতা

সওজের কর্মকর্তারা স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০১৫ সালের দিকে বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা প্রথম ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সুপারিশ করেছিলেন। তবে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে টানাপোড়েন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উদ্যোগটি থমকে রয়েছে।

তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও দেরী হলে—এর নির্মাণব্যয়ও জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকবে। কারণ বিদ্যমান মহাসড়কের দুপাশে অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠার কারণে করিডোরের আশপাশের জমি দ্রুত হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে—যা অদূর ভবিষ্যতে এক্সপ্রেসওয়ের ইন্টারচেঞ্জ তৈরির জন্য জমি অধিগ্রহণকে আরও বেশি জটিল ও ব্যয়বহুল করে তুলবে।

সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 

  • সর্বশেষ