শিরোনাম
◈ রাজধানীতে ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪০২ ◈ আরামদায়ক ট্রেনভ্রমণে ছিনতাই-ডাকাতির আতঙ্ক ◈ সাত দেশনির্ভর বৈদেশিক কর্মসংস্থান, নতুন শ্রমবাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ ◈ ২৬ ফেব্রুয়া‌রি বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব শুরু হচ্ছে, অংশ নিচ্ছে ১০ দল ◈ গেইল-আ‌ফ্রিদি‌দের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ লিজেন্ড ক্রিকেট ৩ অ‌ক্টোবর শুরু ◈ শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে কঠোর নিরাপত্তায় রূপপুরের পথে ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহর ◈ ইন্টারন্যাশনাল টি-২০'র নিলামে দল পেলেন না বাংলাদেশের কো‌নো ক্রিকেটার ◈ রূপপুরের প্রথম ইউনিটের নতুন ইউরেনিয়াম দেশে পৌঁছেছে ◈ এল নিনোর প্রভাবে ফুলে ফুলে সেজেছে আতাকামা মরুভূমি (ভিডিও) ◈ ইরানে নতুন হামলার প্রস্তুতি, মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি

প্রকাশিত : ০৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:১৫ সকাল
আপডেট : ০৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

২০ বছরের অপেক্ষা শেষে উত্তোলনের পথে খালাশপীরের কয়লা

প্রায় ২০ বছর ধরে খালাশপীর কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনে অপেক্ষার প্রহর গুনছে হোসাফ ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম। খনিটির উপর সমীক্ষা করে ২০০৬ সালের আগষ্টে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় কনসোর্টিয়াম।

২০০৮ সালে পীরগঞ্জে এক নির্বাচনী জনসভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়লা উত্তোলনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর আর আওয়ামী লীগ সরকার কয়লা উত্তোলনে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বর্তমানে তারেক রহমানের বিএনপি সরকারের আমলে সেই অপেক্ষার পালা শেষ হতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। কয়লা উত্তোলন হলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি হবে কর্মসংস্থান।

কয়লাখনি প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, প্রায় একশ বছর পূর্বে ভূ-বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বড় আকারের কয়লার মজুত থাকার সম্ভাবনা অনুসন্ধান শুরু করেন। এরই পরম্পরায় ১৯৮৯ সালে পীরগঞ্জের খালাশপীর বেসিনের কয়লার আবিষ্কার হয়।

কয়লাক্ষেত্রটি রংপুর জেলা সদর থেকে ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পীরগঞ্জ সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার পশ্চিমে মদনখালী ইউনিয়নের মাগুরা গ্রামে অবস্থিত। প্রায় সোয়া ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই খনিটিতে কয়লার ৮টি স্তর ২২২ মিটার থেকে ৬০৭ মিটার গভীরতায় অবস্থিত। গড়ে ২৬৫ মিটার থেকে ৩৮৭ মিটার গভীরতায় কয়লা বিদ্যমান। এখানে মোট ৪৫২ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রমাণিত মজুদ ২৭৭ মিলিয়ন টন এবং অতিরিক্ত আরও ১৭৫ মিলিয়ন টন মজুদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

advertisement

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পদ্ধতিতে বছরে ৩ থেকে ৫ মিলিয়ন টন করে ৫০ বছর পর্যন্ত কয়লা তোলা যাবে। খনি এলাকায় স্বল্প গভীরতায় ভেদ করে দুটি খাড়া স্যাফট (Shaft) নির্মাণ করে ৬০ ভাগের বেশি কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব। এতে স্থানীয় বাড়িঘরের কোন ক্ষতিও হবে না। উত্তোলিত কয়লা দিয়ে ৬০০ থেকে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অতিরিক্ত যে কয়লা থাকবে তা দেশের কয়লাচালিত বড় বড় বিদ্যুৎ প্লান্টেও দেওয়া যাবে। পাশাপাশি অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ (জিএসবি) বিভাগ ১৯৮৯-১৯৯০ সালে খালাশপীর এলাকায় ৪টি কূপ ( জিডিএইচ-৪৫, জিডিএইচ-৪৬, জিডিএইচ-৪৭ এবং জিডিএইচ-৪৮) খনন করে। এরমধ্যে প্রথম তিনটি কূপে কয়লা পাওয়া যায়। এরই উপর নির্ভর করে জিএসবি’র রিপোর্টে খালাশপীর বেসিনের কয়লা উচ্চ শ্রেণির বিটুমিনাস গোত্রের এবং উত্তোলনযোগ্য বলে সুপারিশ করা হয়।

২০০৪ সালে বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অব মিনারেল ডেভেলপমেন্ট থেকে হোসাফ কনসার্টিয়ামকে খালাশপীরে ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় কয়লা খনিতে সমীক্ষার জন্য লাইসেন্স দেয়।

হোসাফ কনসোর্টিয়াম বিভিন্ন সার্ভের মাধ্যমে ১২.২৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় প্রথমে টপোগ্রাফিক্যাল সার্ভের মাধ্যমে কয়লা বেসিনের উপরিভাগের অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ, সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা, উঁচু-নিচু, গ্রাম ও শহরের অবস্থান, বিভিন্ন স্থাপনার অবস্থান ইত্যাদি নির্ণয় করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে দ্বি-মাত্রিক ও ত্রি-মাত্রিক হাই রেজুলেশন সিসমিক জরিপ করা হয়। এই জরিপের মাধ্যমে কয়লা বেসিনটির কয়লা স্তরগুলোর পুরুত্ব, গভীরতা, চ্যুতি এবং বেসিন ও কয়লার বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা ও তথ্য পাওয়া যায়। তৃতীয় পর্যায়ে হোসাফ কনসোর্টিয়াম খনি এলাকায় ১৫টি জিটিবি সিরিজের অনুসন্ধান কূপ খনন করে। এ পদ্ধতিতে উত্তোলিত কয়লা ও শিলার নমুনা দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়।

খালাশপীর কয়লা খনিতে বিটুমিনাস নামে উচ্চ জ্বালানি ক্ষমতা সম্পন্ন কয়লা রয়েছে। প্রতি পাউন্ড কয়লার জ্বালানি ক্ষমতা ১০ হাজার ৫০০ ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (বিটিইউ)। এতে ক্ষতিকর সালফারের উপস্থিতি মাত্র এক ভাগেরও কম। খনির এক স্তরে ধাতু গলানোর কাজে ব্যবহৃত কোকিংকোল ও চুনাপাথর এবং কাঁচ বালি রয়েছে, এগুলো অনেক খনিতেই পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক বাজারে এসবের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

এসব সমীক্ষার প্রতিবেদন মূল্যায়নের জন্য ২০০৬ সালের আগস্টে হোসাফ কনসোর্টিয়াম সরকারের ব্যুরো অব মিনারেল ডেভেলপমেন্টে প্রদান করে। তত্ববধায়ক সরকারের সময় খনিজ উন্নয়ন অধিদপ্তরকে সমীক্ষা প্রতিবেদনটি মূল্যায়নের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে পেট্রোবাংলার হাইড্রোকার্বন ইউনিটের মাধ্যমে আইএমসিএল নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয় হোসাফের জমা দেওয়া স্টাডি রিপোর্টটি মূল্যায়ন করার জন্য। আইএমসিএল এটির মুল্যায়ন কাজ শেষ করে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে জমা দেয়। এতে হোসাফের জমা দেওয়া ফেসিবিলিটি রিপোর্ট যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে আরও কিছু কাজ করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

জানা গেছে, ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জাতীয় কয়লানীতি প্রণয়ন কমিটির ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল খালাশপীর কয়লাখনি পরিদর্শন করেছিল। খনির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে সন্তোষ প্রকাশ করে উত্তোলন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাসও দিয়েছিল।

তারপর ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে হোসাফ কনসোর্টিয়াম এর চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন খনি এলাকা পরিদর্শন করেন। ওই সময় কয়লাখনির পরিদর্শন এলাকায় হাজারো মানুষ একত্রিত হয়ে কয়লা উত্তোলনের দাবি জানিয়েছিলেন।

সেদিন পরিদর্শনে আসা হোসাফ গ্রপের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছিলেন, পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না। আমরা খনি সমীক্ষার প্রতিবেদন ২০০৬ সালে সরকারের কাছে জমা দিয়েছি। সরকার কয়লানীতি চূড়ান্ত করলে এ খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

সম্ভাবনাময় এই কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনে বিগত তত্বাবধায়ক সরকার ও  আওয়ামী লীগ সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছে কয়লা উত্তোলনের জন্য কনসোর্টিয়াম আবেদন করে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে বলে জানা গেছে। এ সরকারের আমলে কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেন।

বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুতের সমস্যা অত্যন্ত প্রকট। দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বিদ্যুতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্যাস প্রধান জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ সমস্যাকে মোকাবেলা করার জন্য কয়লাকে অন্যতম প্রধান জ্বালানি হিসাবে নেওয়া ছাড়া ভিন্ন উপায় নেই।

কয়লাখনির গুরুত্ব তুলে ধরে হোসাফ ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়ামের ভূ-তত্ত্ববিদ জিএম (জেনারেল ম্যানেজার) অনুপ কুমার রায় বলেন, “নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত দেশীয় প্রাকৃতিক কয়লা ছাড়া আপাতত শক্তি জেনারেট করার জন্য অন্য কোন প্রাকৃতিক সম্পদ বা জ্বালানি হাতের কাছে দেখা যাচ্ছে না। সে জন্য প্রাপ্ত কয়লাক্ষেত্রগুলো থেকে অতিদ্রুত কয়লা উত্তোলন করা অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

এদিকে, রংপুর অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে ওই কয়লাখনি বড় ধরনের একটি সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। খনি থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু হলে তা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়বে। সব মিলিয়ে এই খনির উত্তোলন কাজ শুরু হলে এ অঞ্চলের হাজারো বেকার জনগোষ্ঠীর মাঝে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে বদলে যাবে এখানকার মানুষের ভাগ্য।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, “খালাশপীর কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা হলে দেশের অর্থনীতির চেহারাও পাল্টে যাবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি ও মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্প ছাড়া উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য খনিজ সম্পদ উত্তোলনে কোনো উদ্যোগ ও কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি। এখন এই খনির কয়লা উত্তোলন করা হলে বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবিলার পাশাপাশি নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। এটি হলে এই অঞ্চলে শিল্পায়নে তা সহায়ক হবে।”

তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত হবে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি না করে এই কয়লা উত্তোলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা। প্রয়োজনে কয়লা উত্তোলনে সর্বাধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে।

সূত্র: ঢাকা পোস্ট 

  • সর্বশেষ