পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে অবশেষে বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে। আর তাতে চিলির রুক্ষ মরুভূমি আতাকামার বড় একটি অংশ বুনো ফুলে ছেয়ে গেছে। মেরু অঞ্চলের বাইরে এটি পৃথিবীর শুষ্কতম মরুভূমি হিসেবে পরিচিত।
এল নিনোর প্রভাবে চলতি বছরের শুরুতে সেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। অস্বাভাবিক মাত্রায় পানি পাওয়ার কারণে লাখ লাখ বীজ থেকে চারা গজিয়ে ফুল ফুটেছে। এগুলোর মধ্যে অনেক বীজই কয়েক দশক ধরে মাটির নিচে সুপ্ত অবস্থায় ছিল।
এ ঘটনাকে অনন্য বলে উল্লেখ করেছেন চিলির ন্যাশনাল ফরেস্ট করপোরেশনের (কোনাফ) সংরক্ষিত অঞ্চল বিভাগের প্রধান হোর্হে কারাবান্তেস। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) তিনি বলেন, সেখানে ২০০টিরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। পৃথিবীর অন্য কোথায় ফুল ফোটার তুলনায় এখানকার ঘটনাটি একেবারেই আলাদা। এটি অস্বাভাবিক ঘটনা।
আতাকামা মরুভূমি প্রশান্ত মহাসাগর ও আন্দিজ পর্বতমালার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। এটি চিলির উত্তর উপকূল বরাবর প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত।
চিলিতে বর্তমানে শীত শেষে বসন্তকাল চলছে। এ সময় প্রকৃতিতে ফুল ফোটা একটি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এ বছর শুষ্ক ওই মরুভূমির পাথুরে ও বাদামি রঙের বালিয়াড়িগুলো বুনো ফুলের জীবন্ত ও রঙিন গালিচায় পরিণত হয়েছে। মরুভূমির চিরায়ত দৃশ্যপট বদলে যাওয়ার ঐতিহাসিক এ ঘটনাকে ‘দেসিয়ার্তো ফ্লোরিদো’ বা ‘পুষ্পশোভিত মরুভূমি’ বলা হচ্ছে।
দেশটিতে জন্মগ্রহণ করলেও জীবনের প্রায় পুরো সময় অস্ট্রেলিয়ায় কাটিয়েছেন ৫১ বছর বয়সী ফেলিক্স বান্দা। সম্প্রতি তিনি প্রথমবারের মতো আতাকামা ঘুরে দেখেছেন। ফেলিক্স বলেন, ‘মরুভূমির কথা ভাবলে আমার কল্পনায় সব সময় বাদামি রঙের দৃশ্যপট ভেসে উঠতো। কিন্তু এখানকার বর্তমান দৃশ্যপট একেবারেই অবিশ্বাস্য।’
এল নিনো, বৃষ্টি ও বুনো ফুল
জুলাই থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে চিলির বেশ কয়েকটি অঞ্চলে রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে। ১৯৫০ সালের পর এত বৃষ্টিপাত দেখা যায়নি। এর কারণ ছিল ‘সুপার এল নিনো’। এটি এমন এক জলবায়ুগত পরিস্থিতি, যার কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
কোনাফের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিভাগের প্রধান সিজার পিজারো বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ১৬০, ১৮০ থেকে ১৯০ মিলিমিটার। ‘সুপার এল নিনোর’ প্রভাবে এমন ভারী বর্ষণ হয়েছে।
তীব্র ঝড়-বৃষ্টির কারণে চিলির কিছু অংশে বন্যা ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। একই সঙ্গে এটি উত্তরাঞ্চলের মরুভূমিতে ফুল ফুটিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, পুষ্পশোভিত ওই এলাকার আয়তন প্রায় ১৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার। এটি চিলির সবচেয়ে বড় ও জনবহুল মহানগর সান্তিয়াগোর সমান।
কোনাফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পর এবারের ‘দেসিয়ার্তো ফ্লোরিদো’ সবচেয়ে বেশি বিস্তীর্ণ ও দৃষ্টিনন্দন হতে চলেছে। পিজারো জানান, ভারী বৃষ্টিপাত মরুভূমির ‘জার্মপ্লাজম’ নামে পরিচিত জৈবিক উপাদানগুলোকে সক্রিয় করে তুলেছে। এই উপাদানের মধ্যে শুধু বীজ বা কন্দই নয়, বরং বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও সরীসৃপের ডিম আছে।
প্রায় ২০০টির বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ ও ফুলের রঙ, আকার ও ধরন বেশ বৈচিত্র্যময়। লাল-হলুদ নিয়ানিউকা, বেগুনি রক পার্সলেন, সাদা সুস্পিরো, কমলা তেরসিওপেলো এবং মরুভূমির পরিচিত প্রজাতি গ্যারা দে লিওন ফুলও ফুটেছে। এগুলো আতাকামার পাহাড়, সমতল প্রান্তর ও গিরিখাতের রূপ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
পিজারো বলেন, মরুভূমির জার্মপ্লাজম বহু বছর, এমনকি কয়েক দশক ধরেও সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। আতাকামার বর্তমান দৃশ্য সেটার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
পর্যটকের ভিড় বাড়ছে
চিলির স্থানীয় থেকে শুরু করে বিদেশি পর্যটকরা এখন আতাকামার দুর্গম এলাকাগুলোতে ছুটে যাচ্ছেন। পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগামী নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৩ লাখ পর্যটক সেখানে রাতযাপন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশটির সান্তা ক্রুজ শহর থেকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আতাকামা ভ্রমণ করেছেন ৩৭ বছর বয়সী শেফ ফ্রাঙ্কো মোয়া। তিনি বলেন, এমন শুষ্ক একটি জায়গায় ফুল ফুটতে দেখে সত্যিই বিস্মিত হয়েছেন। এটি চমকপ্রদ এক মুহূর্ত।