শিরোনাম
◈ আরামদায়ক ট্রেনভ্রমণে ছিনতাই-ডাকাতির আতঙ্ক ◈ সাত দেশনির্ভর বৈদেশিক কর্মসংস্থান, নতুন শ্রমবাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ ◈ ২৬ ফেব্রুয়া‌রি বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব শুরু হচ্ছে, অংশ নিচ্ছে ১০ দল ◈ গেইল-আ‌ফ্রিদি‌দের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ লিজেন্ড ক্রিকেট ৩ অ‌ক্টোবর শুরু ◈ শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে কঠোর নিরাপত্তায় রূপপুরের পথে ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহর ◈ ইন্টারন্যাশনাল টি-২০'র নিলামে দল পেলেন না বাংলাদেশের কো‌নো ক্রিকেটার ◈ রূপপুরের প্রথম ইউনিটের নতুন ইউরেনিয়াম দেশে পৌঁছেছে ◈ এল নিনোর প্রভাবে ফুলে ফুলে সেজেছে আতাকামা মরুভূমি (ভিডিও) ◈ ইরানে নতুন হামলার প্রস্তুতি, মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ◈ আখতারুজ্জামানকে অবিলম্বে মুক্তি দিন: জামায়াত আমির

প্রকাশিত : ০৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:০৭ সকাল
আপডেট : ০৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সাত দেশনির্ভর বৈদেশিক কর্মসংস্থান, নতুন শ্রমবাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ

দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই সংকোচনের মুখে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যসহ ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোতে নিয়োগ কমছে, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীর অভাবে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার নতুন উচ্চ-মজুরির বাজারে ঢুকতে পারছে না বাংলাদেশ। ফলে সংখ্যার দিক থেকে কর্মী গেলেও রেমিট্যান্স এবং টেকসই শ্রমবাজার সম্প্রসারণে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। তবে এসব কর্মীর ৪৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ কম দক্ষ, ৩৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ আধা-দক্ষ, ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ দক্ষ এবং মাত্র ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ পেশাজীবী। অর্থাৎ মোট কর্মীর প্রায় ৭৭ শতাংশই কম দক্ষ বা আধা-দক্ষ।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর প্রতিবেদনেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। সংস্থাটির হিসাবে, মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ কর্মী পেশাজীবী এবং ২০ থেকে ২২ শতাংশ দক্ষ।

এদিকে গত এক দশকে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া, ব্রুনাইসহ বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ রেখেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে লাওসও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ স্থগিত করেছে।

advertisement

তথ্য বলছে, মোট প্রবাসী কর্মীর ৯৪ শতাংশই যাচ্ছে মাত্র সাতটি দেশে, যার বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যে। ফলে ঐতিহ্যবাহী শ্রমবাজারগুলোতে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে।

কমছে কর্মী যাওয়া

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৮৯ জন কর্মী বিদেশে গেলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা ২১ শতাংশ কমে ৯৪ হাজার ১৮৯ জনে নেমে আসে। গত ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ৪ লাখ ৮৬ হাজার ২৫ জন কর্মী বিদেশে গেছেন বলে সংসদে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসেই গেছেন ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৪৫ জন।

চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বিদেশে কর্মী গমন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে।

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে সরকার একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এখনও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারগুলোয় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতে কমেছে কর্মী গমন।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাপানে লাখো কর্মী যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সে রকম কিছু বাস্তবায়নের লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।

তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও গত সাত মাসে প্রায় ৪ লাখ ৩৪ হাজার কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের শ্রমবাজার ধরে রাখার পাশাপাশি সামনে আরও ভালো ফলাফল পাওয়ার আশা করছে সরকার।

কেন সংকুচিত হচ্ছে শ্রমবাজার

সংশ্লিষ্টদের মতে, অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, আইন লঙ্ঘন এবং দক্ষ কর্মীর ঘাটতি বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমার অন্যতম কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিন্ডিকেট, উচ্চ অভিবাসন ব্যয় এবং কর্মীদের প্রতারিত হওয়ার ঘটনায় মালয়েশিয়ার মতো বড় বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিদেশগামী কর্মীদের অবশ্যই দক্ষ হয়ে বিদেশ যেতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি দক্ষ কর্মী পাঠাতে না পারি, তবে লাখ লাখ কর্মী পাঠিয়ে দেশের কোনও প্রকৃত লাভ হবে না। এ জন্য বিভিন্ন ইনস্টিটিউশনের মাধ্যমে ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স, ট্রেনিং এগুলোর ব্যবস্থা করছি। এখান থেকে গিয়ে যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকে।’

তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়ার বাইরে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন শ্রমবাজার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী মাস তিনেকের মধ্যে ভালো ফলাফল দেখা যাবে বলেও জানান তিনি। কখনও জনশক্তি রফতানি হয়নি এমন নতুন সেক্টর ও বাজার চিহ্নিত করে জনশক্তি রফতানির জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।

দক্ষ কর্মী পাঠানোই বড় চ্যালেঞ্জ

সরকার মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ডসহ নতুন শ্রমবাজার খোঁজার কথা বলছে। সংসদে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের কৌশলে শিক্ষিত ও দক্ষ যুবকদের বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো অন্যতম লক্ষ্য।

কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমস্যা হচ্ছে চাহিদা ও জোগানের অমিল। ইউরোপ ও উন্নত দেশগুলোতে এখন স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও বিশেষায়িত নির্মাণকাজে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বেশি। সেখানে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় মাত্রায় প্রবেশ করতে পারছে না। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ কর্মীর ঘাটতির কারণে সম্ভাবনাময় নতুন বাজারগুলো অধরাই থেকে যাচ্ছে।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের পর সে দেশের আনুষ্ঠানিক প্রত্যাখ্যানে বাজার চালুর সুযোগ নতুন করে ধাক্কা খেয়েছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কার্যকর দ্বিপক্ষীয় নেগোসিয়েশনের অভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বড় বাজারগুলোয় নতুন কর্মী নিয়োগ থমকে গেছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মূল দুর্বলতা হলো এখন পর্যন্ত কোনও শক্তিশালী অভিবাসনকেন্দ্রিক কূটনীতি গড়ে ওঠেনি। এছাড়া বাংলাদেশের অনিয়মে আক্রান্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কর্মীদের এক ধরনের ‘ঋণ দাসত্বে’ ঠেলে দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

লক্ষ্য বনাম বাস্তবতা

সরকারের পক্ষ থেকে একদিকে চলতি অর্থবছরে ১৪ লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। তবে পাঁচ বছরে এক কোটি দক্ষ কর্মী পাঠানোর প্রতিশ্রুতির কথাও আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার যখন সংকুচিত হচ্ছে, তখন শুধু সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নতুন বাজার, দক্ষ কর্মী এবং যে চাকরির কথা বলে কর্মী পাঠানো হচ্ছে, সেটি সত্যিই আছে কিনা তা নিশ্চিত করা।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল হক চৌধুরী জানান, সরকার আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বর্তমান ধারায় কাজ চললে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ বাংলাদেশের রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে বর্তমান প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করতে হবে। তাই বিদেশে কর্মী পাঠানোর সক্ষমতা বাড়াতে আরও জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে।

অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, এতদিন বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সাফল্য কত লাখ কর্মী বিদেশে গেলেন, সেই সংখ্যা দিয়ে মাপা হয়েছে। কিন্তু শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদায় এখন কর্মীর দক্ষতা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ভাষাজ্ঞান, সংশ্লিষ্ট পেশায় কাজের অভিজ্ঞতা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান জানান, আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি না গেলেও ৬০ থেকে ৭০ লাখ কর্মী পাঠানো সম্ভব। এটি অসম্ভব নয়। কিন্তু বিদেশে কত লোক গেল, সেটি সাফল্যের একমাত্র সূচক হতে পারে না। প্রকৃত সূচক হলো কত কম খরচে তারা যেতে পারলেন এবং খরচ করা টাকা তারা তুলতে পারছেন কিনা। একইসঙ্গে রেমিট্যান্স আসার হার বাড়ছে কিনা সেটিও দেখতে হবে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন 

  • সর্বশেষ