শিরোনাম
◈ হা‌রিস রউফ পাকিস্তানের বিশ্বকাপ দলে না থাকায় বিস্মিত অ‌স্ট্রেলিয়ার ক্লার্ক ও ফিঞ্চ ◈ ভোটারদের মন জয় করতে প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা, বক্তব্যে উত্তাপ ◈ সাবেক ৩০ এমপির গাড়ি নিয়ে বিপাকে পড়ল এনবিআর ◈ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সরকারের মেয়াদ বাড়বে এমন তথ্য ভিত্তিহীন: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ◈ বয়কট গুঞ্জনে পাকিস্তানের ঘুম হারাম করে দিলো আইসল্যান্ড ◈ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তারেক রহমান, আ.লীগ ও ভারত প্রশ্নে যা বললেন ◈ যুক্তরাজ্যে লরিতে লুকিয়ে ২৩ বাংলাদেশিকে পাচারের চেষ্টা, আটক ৫ ◈ আ.লীগ থাকলে জামায়াত থাকবে, জামায়াত থাকলে আ.লীগ থাকবে : মাহফুজ ◈ এনসিটি বিদেশিদের দিতে চুক্তির বিরোধিতায় চট্টগ্রাম বন্দরে দুই দিনের ধর্মঘটের ডাক ◈ শিশির মনিরের নির্বাচনী প্রচার গাড়িতে হামলা, আহত ২

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৯:৫৫ সকাল
আপডেট : ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬, ১১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

রাঙামাটির আসামবস্তী-কাপ্তাই সড়ক: পাহাড় ও হ্রদের মিতালীতে ১৮ কিলোমিটারের এক স্বর্গীয় পথ

রাঙামাটির আসামবস্তী থেকে কাপ্তাই অভিমুখী বিকল্প ১৮ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা সংযোগ সড়কটি এখন স্বর্গীয় সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। এ সড়কে যে কেউ একবার ঘুরতে এলে সহজে ফিরে যেতে ইচ্ছে করবে না। একদিকে মেঘের লুকোচুরি খেলা, অন্যদিকে পাহাড়-হ্রদের মিতালি আর সবুজ অরণ্যের সমন্বয়ে প্রকৃতি এখানে একাকার হয়ে গেছে। যেন বিধাতার এক অপরূপ প্রাকৃতিক লীলাখেলা। এমন সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখন বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলে ওঠে, তারই ঠিক থাকে না।

প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য এমন মুগ্ধতা ছড়ায় যে, এখানেই থেকে যেতে ইচ্ছে করে। কোনো পর্যটক যদি রাঙামাটিতে এসে এই সড়কটি একবারও অবলোকন না করেন, তবে তার ভ্রমণ যেন অসম্পূর্ণই থেকে যায়।

এই অপরূপ দৃশ্য দেখলে মনে বারবার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত গানটি বেজে ওঠে—
“গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথ
আমার মন ভুলায় রে।
ওরে কার পানে মন হাত বাড়িয়ে
লুটিয়ে যায় ধুলায় রে।”

এই আঁকাবাঁকা সড়কটিতে কী নেই! পুরো ১৮ কিলোমিটারজুড়ে স্বর্গীয় সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি যেন ছড়িয়ে আছে।

বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় গুরু শ্রীমৎ সাধানানন্দ মহাস্থবীর বনভান্তের জন্মস্থান সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে জেলা সদরের বড়াদাম এলাকার মোরঘোনায় কাপ্তাই হ্রদে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে মূল সড়কের ওপর নির্মিত হয়েছে বনভান্তের স্মৃতিমন্দির। এটি বর্তমানে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন এখানে হাজারো ভক্তের ভিড় থাকে। ফলে আশপাশে গড়ে উঠেছে চা-স্টল ও ছোট ছোট হাটবাজার। পাহাড়ি নারীরা তাদের উৎপাদিত বিভিন্ন পাহাড়ি তরকারি নিয়ে এসব বাজারে হাজির হন। হ্রদে দেখা যায় পাহাড়ি নারীদের মাছ ধরা ও মাছ শিকার।

এলাকাটি এতটাই মনোমুগ্ধকর যে, মুহূর্তেই মনকে ভুলিয়ে দেয়। ক্লান্তি দূর করতে দাঁড়িয়ে এক কাপ চা পান করার পাশাপাশি উপভোগ করা যায় চারপাশের অপরূপ দৃশ্য।

এই সড়কের বড়াদাম এলাকায় দাঁড়ালে এক নজরেই দেখা যায় পুরো রাঙামাটি শহর। দূর থেকে শহরটিকে মনে হয় যেন অথই সাগরের মাঝে একটি দ্বীপ।

সারাদিন ঘোরাঘুরি শেষে ভুঁড়িভোজ সারতে পারেন এই সড়কের পাশে প্রকৃতির ছায়ায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন রেস্তোরাঁয়। এর মধ্যে ‘বার্গি লেক’, ‘বড় গাঙ’ ও ‘বেড়ান্নে রেস্টুরেন্ট’ উল্লেখযোগ্য। ব্যক্তিমালিকানাধীন এসব রেস্তোরাঁ অপরূপভাবে সাজানো হয়েছে। পাহাড়ি খাবার থেকে শুরু করে দেশীয় নানা পদ পাওয়া যায় স্বল্পমূল্যে। খাবারের পর কফির চুমুকে আড্ডাও জমে ওঠে। প্রকৃতি উপভোগের জন্য বসার সুব্যবস্থাও রয়েছে।

এছাড়া সাহসী পর্যটকদের জন্য রয়েছে প্যাডেল বোট ও কায়াকিংয়ের ব্যবস্থা। এসবের মাধ্যমে কাপ্তাই হ্রদ ভ্রমণের সুযোগও মিলবে।

বার্গি লেকের স্বত্বাধিকারী বাপ্পি তঞ্চঙ্গ্যা জানান, অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন পরিবেশে তারা পর্যটকদের জন্য খাবার প্রস্তুত করেন। স্বাদ ও সাধ্যের মধ্যে যে কেউ এখানে খাবার উপভোগ করতে পারেন। পাহাড়ি ও দেশীয়—উভয় ধরনের খাবারই এখানে পাওয়া যায়। এছাড়া বনভোজন বা যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ রয়েছে। আধুনিক মানের মোটেল ও কাপ্তাই হ্রদে রাতযাপনের জন্য হাউসবোটও রয়েছে। তবে এসব সুবিধা পেতে আগাম বুকিং দেওয়া ভালো।

জেলা সদরের মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো হাটবাজার হলো ‘বড়াদাম’। সঠিকভাবে কবে এটি গড়ে উঠেছে তা কেউ বলতে না পারলেও স্থানীয় পাহাড়ি প্রবীণদের ধারণা, ১৯৮৫ সালের দিকে এ হাটবাজারের সূচনা হয়। প্রতিদিনই এখানে হাট বসে। পাহাড়ি ফলমূল, শাকসবজি থেকে শুরু করে নানা পণ্য পাওয়া যায়। ভ্রমণ শেষে বাড়ির জন্য তাজা শাকসবজিও কেনা যায় এখান থেকে।

পার্শ্ববর্তী কাপ্তাই উপজেলায় যেতে হলে এই সড়ক দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। আর এই পথে এসে সৌন্দর্য অবলোকন না করে চলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই অনেক পর্যটক প্রশান্তির খোঁজে কিংবা সেলফিপ্রেমীরা ছবি তুলতে থেমে যান। স্থানীয়রাও অবসর সময়ে সড়কের ব্রিজে আড্ডায় মেতে ওঠেন।

তবে এই সড়কে কিছুটা সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। সন্ধ্যার পর চলাচলের সময় সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। কাপ্তাই উপজেলার প্রবেশমুখে সন্ধ্যার দিকে মাঝে মাঝে বন্য হাতির পাল নেমে আসে, যা বিপদের কারণ হতে পারে। তাই যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সন্ধ্যার আগেই এ সড়ক ত্যাগ করাই বুদ্ধিমানের।

ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক নুসরাত পপি বলেন, “এই সড়কে না এলে বুঝতামই না রাঙামাটি এত সুন্দর। সারাদিন ঘুরেছি, এখানকার রেস্তোরাঁয় খেয়েছি—খুব ভালো সময় কেটেছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে এখানে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হলে পর্যটনের আরও সম্ভাবনা তৈরি হবে।”

আরেক পর্যটক এহসান খান বলেন, “অপরূপ এই আঁকাবাঁকা সড়কটি সত্যিই অসাধারণ। পরিবারের সবাই খুব উপভোগ করেছে। মনে চায় আরও কয়েকদিন থেকে যাই।”

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সড়কে নিরাপত্তা জোরদার করে পরিকল্পিত ট্যুরিস্ট জোন গড়ে তোলা গেলে এটি রাঙামাটির আরেকটি অন্যতম পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে উঠবে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রাঙামাটির জেলা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৩ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে সড়কটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। পরবর্তীতে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি নতুন সেতুসহ সড়কটি দুই লেনে উন্নীত করা হয়।

রাঙামাটি এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আহামদ শফি জানান, রাঙামাটি থেকে কাপ্তাই যাওয়ার এটি একটি বিকল্প সড়ক। ফলে দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার কমে গেছে। বর্তমানে সড়কটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন স্পট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে বাসযোগে রাঙামাটি শহরে নেমে সেখান থেকে অটোরিকশা বা মাইক্রোবাস ভাড়া করে আসামবস্তী সড়ক পাড়ি দিয়ে এই বিকল্প পথে সহজেই যাতায়াত করা যায়। যারা নিজস্ব গাড়িতে আসবেন, তাদের জন্য তো আরও সুবিধাজনক।

সূত্র: ইত্তেফাক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়