ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব সুলাওয়েসি প্রদেশের অন্যতম বড় দ্বীপ ‘মুনা’। এই দ্বীপে চুনাপাথরের গুহার দেয়ালে মানুষের হাতের বিবর্ণ ছাপ পাওয়া গেছে। গবেষকরা বলছেন, ছাপটির বয়স অন্তত ৬৭ হাজার ৮০০ বছর। প্রত্নতত্ত্ববিদদের ভাষ্য, এটিই হয়তো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন শিলাচিত্র।
হাতের ছাপের কারণে মুনা দ্বীপের চুনাপাথরের গুহা বর্তমানে পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গুহার দেয়ালে থাকা তুলনামূলক নতুন প্রাণী ও অন্যান্য চিত্রের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে এটি নজরের বাইরে ছিল। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু গুহাচিত্রের একটি ন্যূনতম বয়স নির্ধারণই করে না, বরং অস্ট্রেলিয়ায় মানুষের প্রথম বসতি স্থাপন নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ করে দেয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই হাতের ছাপ আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের পূর্বপুরুষদের তৈরি। কুইন্সল্যান্ডের গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ম্যাক্সিম অবার্ট বলেন, ‘পৃথিবীতে অসংখ্য শিলাচিত্র রয়েছে। কিন্তু সেগুলো সৃষ্টির সঠিক তারিখ নির্ধারণ করা খুব কঠিন।’
অবার্ট ও তাঁর সহকর্মী অধ্যাপক অ্যাডাম ব্রুমের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় সুলাওয়েসির বিভিন্ন গুহায় সমৃদ্ধ শিলাচিত্রের ইতিহাস উঠে এসেছে। একটি গুহায় তিনটি মানবসদৃশ অবয়ব ও একটি বন্য শূকরের দৃশ্য আঁকা রয়েছে, যার বয়স কমপক্ষে ৫১ হাজার ২০০ বছর বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ আবিষ্কৃত হাতের ছাপটি পাওয়া যায় লিয়াং মেটানদুনো নামের একটি গুহায়। যদিও এটি কিছুটা মলিন এবং পরবর্তী সময়ের চিত্র দ্বারা আংশিকভাবে ঢাকা। তবু এর ওপর জমে থাকা সূক্ষ্ম ক্যালসাইট স্তর বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এর বয়স নির্ধারণ করতে সক্ষম হন। গবেষকদের মতে, মানুষ অন্তত ৩৫ হাজার বছর ধরে এই গুহায় নিয়মিত ছবি এঁকেছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাচীন স্থলভাগ সুন্দা অঞ্চল (বর্তমান বোর্নিও, সুমাত্রা ও জাভা) থেকে মানুষ কীভাবে সাহুল অঞ্চলে (অস্ট্রেলিয়া, নিউগিনি ও তাসমানিয়া) পৌঁছেছিল, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এই শিলাচিত্র ইঙ্গিত দেয়, মানুষ সম্ভবত সুলাওয়েসি অতিক্রম করে একটি উত্তর দিকের পথ ব্যবহার করেছিল। সেই সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কম থাকায় কিছু দ্বীপের মধ্যে স্থল সেতু তৈরি হয়। কিন্তু মানুষকে দ্বীপ থেকে দ্বীপে যাতায়াত করেই এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে হয়। ব্রুমের মতে, এই প্রমাণগুলো দেখায়, উত্তর অস্ট্রেলিয়ায় মানুষ অন্তত ৬৫ হাজার বছর আগে বসতি স্থাপন করেছিল।
হাতের চিত্রগুলো তৈরি করা হয়েছিল গুহার দেয়ালে হাত চেপে ধরে, তার ওপর মুখ দিয়ে গেরুয়া রং ও পানি মিশিয়ে ছিটিয়ে। লিয়াং মেটানদুনোর স্টেনসিলটির আঙুলগুলো সরু ও সূচালো, যা গবেষকদের মতে ইচ্ছাকৃতভাবেই পরিবর্তন করা হয়েছিল। ব্রুম বলেন, ‘এগুলো পশুর নখর কিংবা কল্পনায় গড়া কোনো মানব-প্রাণী সত্তার মতো মনে হতে পারে। আসলে এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো প্রতীকী অর্থ রয়েছে।’
নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে লেখকরা দাবি করেছেন, হাতের ছাপে এই ধরনের পরিবর্তন একে জটিল শিল্পকর্মে পরিণত করেছে, যা সম্ভবত হোমো স্যাপিয়েন্সদের সৃষ্টি। তবে অন্য প্রাচীন মানব প্রজাতির সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
স্পেনের গুহাচিত্র নিয়ে কাজ করেছেন ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল পেটিট। তিনি বলেন, ‘সুলাওয়েসির সূচালো আঙুলের ছাপগুলো ইচ্ছাকৃত ছিল নাকি ছবি আঁকার সময় আঙুল নড়ে যাওয়ার ফল, তা নিশ্চিত নয়। এটিকে অতিরিক্ত জটিল বলে ব্যাখ্যা করা হয়তো বাড়াবাড়ি।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান