সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগের রাতে সরবরাহের পাশাপাশি পরীক্ষার্থীকে চান্স পাইয়ে (ভর্তির সুযোগ) দেওয়ারও প্রতিশ্রুতিতে মোটা অঙ্কের টাকা হাতানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে জাতীয় ছাত্রশক্তির এক নেতার বিরুদ্ধে। তার এ-সংক্রান্ত ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। ওই কলরেকর্ডে পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্নপত্র দেওয়ার বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করতে শোনা যায় জাতীয় ছাত্রশক্তির রংপুর জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারওয়ার হাবিব খোকনকে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়কদের একটি অংশের উদ্যোগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয় বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ (বাগছাস)। আট মাসের মাথায় নাম পাল্টে সংগঠনটির নতুন নাম হয় জাতীয় ছাত্রশক্তি। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি।
জানা গেছে, ফাঁস হওয়া কল রেকর্ডটি গত ১১ ডিসেম্বর সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর ভর্তি পরীক্ষার আগের রাতের। সারওয়ার হাবিব খোকন রেভিটা বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠনের রংপুর বিভাগীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ মুনতাসির আহমেদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলছিলেন। মুনতাসির অন্য আরেকটি মোবাইল ফোন দিয়ে পুরো কথোপকথনের অডিও ও ভিডিও চিত্র রেকর্ড করেন। পরে সেই কল রেকর্ড কালবেলার হাতে আসে।
ফাঁস হওয়া কল রেকর্ডে সারওয়ার হাবিব খোকনকে মোবাইল ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে বলতে শোনা যায়, ‘কোশ্চেন (প্রশ্ন) দেবে রাত ২টা থেকে ২টা পাঁচ মিনিটের মধ্যে। এখন তুই ১০ লাখ টাকা ওদের দিবি, কথা বুঝছিস? যে তোমরা কয়জন মিলি এটা নেও। কখনো যদি এটা ফ্লাশ হইছে, তাহলে ওদের দুজনকে মাইর।’ তখন মুনতাসিরকে বলতে শোনা যায়, ‘আচ্ছা আচ্ছা।’
এরপর সারওয়ার বলেন, ‘কথা বুঝ, আচ্ছা আচ্ছা না। এখন তুই যাকে দিচ্ছিস তাকে কি ভরসা পাওয়া যায় যে, একে দিলে (প্রশ্নপত্র) এ দিবে (টাকা)। তাহলে দে, হুদাই আউল-ফাউল আলাপ করিস না। তোক মুই দায়িত্ব দিম, তোর কাছ থেকে বুঝি (টাকা) নিম।’
তখন মুনতাসির তাকে একজন প্রার্থী থাকার কথা ইঙ্গিত করে বলেন, ‘হোস্টেলে যখন ছিলাম তখন খুব ক্লোজ ছিল। এখন একটু আলাদা জায়গায় থাকে। এখন রাতে প্রয়োজনে দেখা করে কথা বলি, তাহলে ভালো হয়।’
তখন সারওয়ার বলেন, ‘আগে কোনো টাকা-পয়সা নেওয়া হবে না, পরীক্ষার পরেই সব। ধর তোকে ১০০টা কোশ্চেন দেবে, ১০০টার মধ্যে যদি ১০০টা কমন পড়ে; কিন্তু তুই যদি না পারিস সেটা তোর ব্যর্থতা। যদি পারিস তাহলে বল, চান্স পাওয়ার দায়িত্ব আমার।’
তখন মুনতাসির বলেন, ‘দাঁড়াও আমি একটু পরে বের হয়ে দেখা করে কথা বলছি।’
এই কথোপকথনের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রশক্তি নেতা সারওয়ার হাবিব খোকন দাবি করেন, চাকরিতে ঢোকানো নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত এক সেনাসদস্য সেনাবাহিনীর মেজর পরিচয় দিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে তার কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত ওই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে এ-সংক্রান্ত প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মুনতাসিরের সঙ্গে তিনি মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সরবরাহ নিয়ে কথা বলেন; কিন্তু মুনতাসির দুজনের কথপোকথন রেকর্ড করে তাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন।
যদিও মুনতাসিরের অভিযোগ, ছাত্রশক্তি নেতা সারওয়ার হাবিব খোকন প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত। মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার আগের রাতে তার মোবাইল ফোনে কল করে পরীক্ষার্থী খুঁজতে বলেছিলেন। এর সঙ্গে আরও অনেকেই জড়িত।
সারওয়ার হাবিব খোকনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে জাতীয় ছাত্রশক্তির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আরশাদ হুসাইন বলেন, ‘সংগঠনের কারও বিরুদ্ধে যদি এমন অভিযোগ (প্রশ্ন ফাঁস) ওঠে, তাহলে তদন্তসাপেক্ষে আইনি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষা ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে ফেসবুকে পোস্ট দেন ছাত্রশক্তির রংপুর মহানগর কমিটির সংগঠক নাহিদ হাসান খন্দকার। এই ফেসবুক পোস্টের জেরে গত মঙ্গলবার রাতে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
সূত্র: কালবেলা