ভিডিওতে দেখা যায়, দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী সরকারপন্থী ইনফ্লুয়েন্সারদের সঙ্গে এক সমাবেশে বসেছেন, এবং সেখানে মাইক্রোফোনের সামনে মোবাইল ফোন ধরে রেখেছেন। ফোনটি স্পিকার মোডে ছিল। ওপাশে ছিলেন ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলচি রদ্রিগেস।
রদ্রিগেসকে সেখানে বলতে শোনা যায়, মার্কিন বাহিনী নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর তাঁকে (দেলচি) ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের মাত্র ১৫ মিনিট সময় দিয়েছিল। এ সময়ের মধ্যে মার্কিন বাহিনী তাঁদের সিদ্ধান্ত জানাতে বলেছিল বলে দাবি রদ্রিগেসের। কী সিদ্ধান্ত? হয় ওয়াশিংটনের কথা মতো চলতে হবে, নতুবা, রদ্রিগেসের ভাষায়, ‘ওরা আমাদের মেরে ফেলত।’
দেলচি রদ্রিগেস আগে, অর্থাৎ মাদুরোর সরকারে ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর তিনি ক্ষমতা নেন। কদিন আগে রদ্রিগেসের প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, রদ্রিগেস তাঁর সব দাবি মেনে চলছেন।
আরও পড়ুন
দেলচি রদ্রিগেস বলেন, ‘হুমকি আর ব্ল্যাকমেইল সব সময়ই ছিল’ বলে তিনি এসব করছেন। স্বীকার করেন, তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল যেকোনোভাবে ‘রাজনীতিবিদদের হাতে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা।’
এই মন্তব্যগুলো উঠে এসেছে প্রায় দুই ঘণ্টার একটি বৈঠকের ফাঁস হওয়া অডিও–ভিডিওতে। বৈঠকটি হয়েছে মাদুরোকে আটক করতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সাত দিন পর। স্থানীয় অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ‘লা ওরা দে বেনেসুয়েলা’ প্রথম ভিডিওটির খবর প্রকাশ করে।
এই ভিডিও একদিক থেকে ‘বিরল’ জানিয়ে দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, এটি ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট উগো চাভেসপন্থী শাসনব্যবস্থার ভেতরে কার্যক্রম কীভাবে চলে, চিন্তাভাবনা কীরকম হয়, সে সম্পর্কে সামান্য ধারণা দিয়ে যায়। ওয়াশিংটন মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পর দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসকরা কীভাবে দ্রুত বয়ান বা ন্যারেটিভ নির্মাণের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন, সেটাই এই ভিডিওতে বোঝা যায় বলে লিখেছে দ্য গার্ডিয়ান।
এই ভিডিওটা এমন সময়ে সামনে এল, যখন আগে থেকেই একটা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব চালু আছে যে, মাদুরোর ওপর হামলার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের দূতদের সঙ্গে রদ্রিগেসসহ মাদুরোর মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের যোগাযোগ হয়েছিল।
ফাঁস হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, মাদুরো-পরবর্তী প্রশাসনের অবশিষ্ট নেতারা আশঙ্কা করছিলেন, তাদের ‘দেশদ্রোহী’ বলা হতে পারে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের রাজনৈতিক আন্দোলন যেন ভেতর থেকে ভেঙে না পড়ে, সে চেষ্টাও করছিলেন। ইনফ্লুয়েন্সারদের উদ্দেশে ফোনে রদ্রিগেস বলেন, ‘আমি শুধু একটাই জিনিস চাই — ঐক্য।’
তাঁকে স্পিকারফোনে দেওয়ার আগে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী ফ্রেদি নানিয়েস চেষ্টা করেছিলেন রদ্রিগেসের পক্ষে কিছু বলার। তিনি বলেন, রদ্রিগেসকে নিয়ে ‘গুজব, কানাঘুষা, ষড়যন্ত্র আর বদনামের চেষ্টা’ বন্ধ করতে হবে। নানিয়েস দাবি করেন, রদ্রিগেসই একমাত্র ভরসা, যাঁর মাধ্যমে ‘প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব’—এবং একই সঙ্গে ‘নতুনভাবে আরও শক্তি জোগাড় করে শুরু করা যাবে।’
স্পিকারফোনে ছয় মিনিট কথা বলেন রদ্রিগেস। তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিতে হওয়াটা খুব কষ্টের ছিল।’ এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের কথা বলেন। রদ্রিগেসের ভাষায়, ‘ওরা যখন প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করল, তখন প্রথম মিনিট থেকেই হুমকি শুরু হয়। দিয়োসদাদো (কাবেইয়ো, মাদুরো প্রশাসনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী), হোর্খে (রদ্রিগেস, দেলচি রদ্রিগেসের ভাই ও কংগ্রেশনাল প্রেসিডেন্ট) আর আমাকে ১৫ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল, এর মধ্যেই জবাব দিতে বলল। নইলে আমাদের হত্যা করবে বলে জানিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, শুরুতে মার্কিন সেনারা জানিয়েছিল, মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ নয়, হত্যা করা হয়েছে। রদ্রিগেসের দাবি, তখন তিনি, তাঁর ভাই ও কাবেইয়ো উত্তর দেন—তাঁরাও একই পরিণতি মেনে নিতে প্রস্তুত।
রদ্রিগেস বলেন, ‘আজও আমরা সেই অবস্থানেই আছি। কারণ হুমকি আর ব্ল্যাকমেইল থামেনি। তাই আমাদের ধৈর্য ধরে, কৌশলগতভাবে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে।’ এ সময় তিনি তিনটি লক্ষ্য উল্লেখ করেন— শান্তি বজায় রাখা, জিম্মিদের উদ্ধার করা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখা।
ভিডিওটি সম্ভবত একটি ভিডিও কনফারেন্স প্ল্যাটফর্মে ধারণ করা হয়েছিল। বেশির ভাগ ইনফ্লুয়েন্সার ঘরে উপস্থিত ছিলেন, কেউ কেউ অনলাইনে যুক্ত হন। ভিডিওটি কীভাবে ফাঁস হলো, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
এ বিষয়ে ভেনেজুয়েলা বা যুক্তরাষ্ট্র—কোনো সরকারই মন্তব্য করতে রাজি হয়নি বলে জানাচ্ছে দ্য গার্ডিয়ান।
রদ্রিগেস এরপর আর যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে তাঁকে মৃত্যুর হুমকি দেওয়ার কথা কখনো বলেননি। বরং এই সপ্তাহে ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনি শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন। বুধবার রদ্রিগেস বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছি। কোনো ভয় ছাড়াই আমাদের মধ্যকার মতপার্থক্য ও ঝামেলাগুলোর মুখোমুখি হচ্ছি, এবং সেটা কূটনীতির মাধ্যমেই।’
দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, পূর্বসূরি মাদুরো আটক হওয়ার পর থেকে রদ্রিগেস খুব সতর্কভাবে ভারসাম্য রেখে চলছেন। দেশের ভেতরে তিনি কঠোর ভাষায় কথা বলছেন, আবার যুক্তরাষ্ট্রকে ইঙ্গিত দিচ্ছেন — ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করতে তিনি প্রস্তুত।
ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মার্গারিতা লোপেস মায়া বলেন, আদৌ কোনো মৃত্যুর হুমকি ছিল কি না — তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তাঁর মতে, ‘এটা হয়তো রদ্রিগেজের বানানো এক ধরনের বয়ান, যাতে সমর্থকদের একত্রিত রাখা যায়। কারণ সবাই জানে, ভেতরের সহযোগিতা ছাড়া মাদুরোকে এত সহজে সরানো সম্ভব হয়নি।’
বৈঠকে যোগাযোগমন্ত্রী নানিয়েস তথাকথিত ‘কট্টরপন্থীদের’ বিষয়ে ইনফ্লুয়েন্সারদের সতর্ক করেন। তিনি বলেন, এরা বলবে —দেশ বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে, বিপ্লব ধ্বংস করা হচ্ছে, ‘চাভিসমো’র সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে। নানিয়েস আরও দাবি করেন, আজ যা কিছু ঘটছে, ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণসহ তার সবটুকুই নাকি মাদুরোরই পরিকল্পনার অংশ ছিল! তিনি বলেন, ‘এটা কোনো ছাড়, উপহার দেওয়া বা পরাজয় মেনে নেওয়া নয়। যুক্তরাষ্ট্রকে তেল বিক্রি করা সব সময়ই আমাদের পরিকল্পনায় ছিল।’
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক ধরনের দ্বিমুখী ভাষা ব্যবহার করে চলেছে। একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিগ্রামে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী কড়া বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের সব দাবি মেনে নেওয়া হচ্ছে। মার্গারিতা লোপেস মায়ার ভাষায়, ‘সরকার আসলে দরকষাকষি করছে — নিজেদের কীভাবে বাঁচানো যায় তা নিয়ে।’
ভিডিও ফাঁস হওয়ার কয়েক দিন পরই মন্ত্রিসভা রদবদলে ফ্রেদি নানিয়েসকে পরিবেশমন্ত্রী করা হয়। তাঁর উত্তরসূরি, লেখক মিগেল আংখেল পেরেস পিরেলা দায়িত্ব নিয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন। এই অ্যাকাউন্টের উদ্দেশ্য বলা হয় — ‘ভুয়া খবরের বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার সত্য তুলে ধরা।’ অনেকেই এটিকে আরেকটি প্রমাণ হিসেবে দেখছেন যে, মাদুরো না থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও, ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থার চরিত্র বদলায়নি। এখনো দমন–পীড়ন চলছে, শত শত রাজনৈতিক বন্দী আছে, নতুন নির্বাচনের কোনো সময়সূচিও নেই।
লোপেস মায়া বলেন, ‘আমাদের সামনে দুটি পথ আছে। একটি হলো — দেশকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে নিয়ে যাওয়া। আরেকটি হলো — যেটা চাভেসপন্থীরা করে চলেছে: যুক্তরাষ্ট্রের কথা মেনে চলা, তার মাধ্যমে আরও সময়ক্ষেপণ করা, যাতে কিছু অর্থনৈতিক ছাড় দিয়ে হলেও কর্তৃত্ববাদী শাসন টিকিয়ে রাখা যায়।’ সূত্র: ইনডিপেনডেন্ট