মো. কামরুল ইসলাম, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় চলতি মৌসুমে সরিষা ও ধনিয়া চাষকে কেন্দ্র করে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে মৌচাষ কার্যক্রম। সরিষা ও ধনিয়া ফুলের নির্যাস থেকে উৎপাদিত হচ্ছে উন্নতমানের প্রাকৃতিক মধু, যার বাজার মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় এক কোটি টাকা। কৃষি ও মৌচাষ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে নবীনগর উপজেলায় তৈরি হচ্ছে সম্ভাবনাময় একটি লাভজনক খাত।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে নবীনগর উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ১০৫ হেক্টর জমিতে সরিষা এবং ৫২৫ হেক্টর জমিতে ধনিয়ার আবাদ হয়েছে। এসব ফসলের ফুলে পর্যাপ্ত পরাগ ও নির্যাস থাকায় মৌচাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে স্থাপন করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০৫টি মৌবক্স। এসব মৌবক্স থেকে চলতি মৌসুমে কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা।
মৌচাষ শুধু মধু উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ফসল উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়ন বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন ফসলের ফলন ও গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরিষা, লিচু, তিল, সূর্যমুখী, ধনিয়া, শাকসবজি ও ফলজাতীয় ফসলে মৌমাছির উপস্থিতি পরাগায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এতে ফুল ঝরে পড়ার হার কমে, ফল ধারণ বৃদ্ধি পায় এবং বীজের আকার ও ওজন উন্নত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, যেসব এলাকায় পরিকল্পিতভাবে মৌবক্স স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে সরিষা, ধনিয়া ও সবজি ফসলে ফলন তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সরিষার মাঠে মৌমাছির উপস্থিতিতে গড়ে বিঘা প্রতি ৪০ থেকে ৫০ কেজি সরিষা উৎপাদন বেশি হয়। মৌমাছি প্রাকৃতিকভাবে মধু সংগ্রহ করার সময় পরাগায়ন করে ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে মৌচাষ ও ফসল উৎপাদনের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কৃষকের দ্বিমুখী আয় নিশ্চিত করছে। স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ ভেজালমুক্ত মধু প্রাপ্তিতে সহজলভ্য হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রছুল্লাবাদ, সাতমোড়া, শ্রীরামপুর, জিনদপুর, শ্যামগ্রাম ও রতনপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ সরিষা এবং ধনিয়ার মাঠে সারিবদ্ধভাবে মৌবক্স বসানো হয়েছে। হলুদ রঙের সরিষা ক্ষেতে শত শত মৌমাছির গুঞ্জনে এক মনোরম দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে। সরিষা ও অন্যান্য ফসলের ফুল থেকে নির্যাস সংগ্রহ করে মৌমাছিগুলো মৌবক্সে ফিরে আসছে, যা মধু উৎপাদন করছে।
মৌচাষ উদ্যোক্তা আনিস জানান, তিনি গত দুই দশক ধরে নিয়মিত মৌচাষ করে আসছেন। এই সময়ে তিনি নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন, তেমনি অনেক তরুণ ও আগ্রহী কৃষককে মৌচাষে প্রশিক্ষণ দিয়ে এই পেশায় যুক্ত করেছেন। তার মতে, মৌচাষ কম খরচে অধিক লাভজনক একটি উদ্যোগ, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
কালঘড়া গ্রামের কৃষক ফয়সাল আব্বাস জানান, চলতি বছর উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় তিনি প্রথমবারের মতো মৌচাষ শুরু করেন। সরকারি প্রণোদনার অংশ হিসেবে তিনি ৫টি অত্যাধুনিক মানের মৌবক্স ও মৌকলোনি পেয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি প্রায় ৫০ কেজি মিশ্র মধু সংগ্রহ করেছেন এবং তা বাজারে বিক্রিও করেছেন। এতে তিনি আশাবাদী যে ভবিষ্যতে মৌচাষের পরিধি আরও বাড়াতে পারবেন।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, মৌমাছি শুধু ফুলের নির্যাস থেকে মধু সংগ্রহই করে না, একই সঙ্গে পরাগায়নের মাধ্যমে সরিষাসহ অন্যান্য ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। ফলে একদিকে কৃষকের ফসল উৎপাদন বাড়ে, অন্যদিকে মধু উৎপাদনের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য তৈরি হয় অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ। তিনি আরও বলেন, কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে মৌচাষ সম্প্রসারণে প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও প্রণোদনা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডঃ মোস্তফা এমরান হোসেন বলেন, পরিকল্পিতভাবে মৌচাষ সম্প্রসারণ করা গেলে নবীনগর উপজেলায় মধু উৎপাদন একটি টেকসই ও রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত হতে পারে। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।