সব প্রাণীকেই একদিন না একদিন মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়। আর এটিই চিরন্তন সত্য। তবে মৃত্যুর পর কার শেষকৃত্য কিভাবে সম্পন্ন হবে, তা নির্ভর করে পরিবার ও সংস্কৃতির ওপর। কোথাও মৃতদেহ দাহ করা হয়, আবার কোথাও মাটিতে সমাহিত করা হয়।
ফিলিপিন্সের প্রত্যন্ত গ্রাম সাগাদায় রয়েছে এক ব্যতিক্রমী প্রথা। সেখানকার এক উপজাতি পাহাড়ের খাড়াইয়ে কফিন ঝুলিয়ে রাখে। এর আগে আমরা ইন্দোনেশিয়ার তোরাজা উপজাতির কথা জেনেছি, যারা একসময় নবজাতক শিশুদের জীবিত গাছের ভেতরে কবর দিত। সেই উপজাতির লোকেরা আবার অর্থ জোগাড় না হওয়া পর্যন্ত মৃতদেহ সংরক্ষণ করে রাখত।
মাদাগাস্কারের মালাগাসি জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে আরো অদ্ভুত এক রীতি। তারা প্রতি ৫-৭ বছর অন্তর মৃতদেহ কবর থেকে তুলে এনে নাচগান করে পূর্বপুরুষদের সম্মান জানায়। তাদের বিশ্বাস, মৃতদের আত্মা আত্মিক জগতে বাস করে।
একইভাবে, ফিলিপিন্সের একটি দ্বীপে পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা কফিনগুলোও মৃত আত্মাদের পূর্বপুরুষের আত্মার সঙ্গে সংযুক্ত রাখে বলে বিশ্বাস করা হয়।
কেন ফিলিপিন্সের এই উপজাতি পাহাড়ে কফিন ঝুলিয়ে রাখে?
সাগাদা গ্রামটি ফিলিপিন্সের সবচেয়ে বড় ও জনবহুল দ্বীপ লুজনের উত্তরে কর্ডিলেরা সেন্ট্রাল পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত। রাজধানী ম্যানিলা থেকে সেখানে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টার পথ। এই গ্রামে বসবাস করেন ইগোরোট উপজাতির মানুষ।
বিশ্বাস করা হয়, পাহাড়ের গায়ে কফিন ঝুলিয়ে রাখার এই প্রথা প্রায় ২ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। কফিনগুলো হাতে খোদাই করা হয় এবং মাটির অনেক ওপরে পাহাড়ের গায়ে পেরেক দিয়ে আটকানো থাকে।
এই অদ্ভুত ‘মাধ্যাকর্ষণ অমান্য করা কবরস্থান’-ই বহু পর্যটককে দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে সাগাদায় টেনে আনে।
পাহাড়ে কফিন ঝোলানোর পেছনের বিশ্বাস
ইগোরোটদের বিশ্বাস, পাহাড়ের গায়ে কফিন ঝুলিয়ে রাখলে মৃত ব্যক্তি পূর্বপুরুষের আত্মার আরো কাছাকাছি থাকতে পারেন। কফিন যত উঁচুতে থাকে, ততই মৃত আত্মা তার পূর্বপুরুষদের নিকটবর্তী হয়—এমনটাই তাদের ধারণা।
এই প্রথার আরেকটি কারণ ছিল বাস্তবসম্মত। ইগোরোটদের প্রবীণদের বিশ্বাস ছিল, মাটিতে কবর দিলে একসময় পানি ঢুকে দেহ পচে যাবে। তারা চাইতেন, মৃত্যুর পরও তাদের দেহ নিরাপদ থাকুক। পাহাড়ের গায়ে ঝুলিয়ে রাখা কফিন মৃতদেহকে শুধু বন্যা থেকেই নয়, মাটির ওপর থাকা পশুপাখির হাত থেকেও রক্ষা করে।
ফিলিপাইনের পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া ও চীনের কিছু অঞ্চলেও এই ধরনের প্রথার প্রচলন রয়েছে।
মৃতদেহ সমাহিত করার এক অনন্য রীতি
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইগোরোট সমাজে আগে মৃত ব্যক্তিদের মাত্র এক মিটার লম্বা কফিনে রাখা হতো। প্রত্যেক সদস্যের জন্য থাকত একটি ‘ডেথ চেয়ার’। মৃতদেহের হাড় ভেঙে ভ্রূণাকৃতির ভঙ্গিতে বসিয়ে তবেই কফিনে রাখা হতো।
তাদের বিশ্বাস ছিল, মানুষ যেভাবে এই পৃথিবীতে আসে, সেভাবেই তার বিদায় নেওয়া উচিত। পাহাড়ের গায়ে ঝুলন্ত কফিনের পাশে যে কাঠের চেয়ার দেখা যায়, সেগুলোই মৃত ব্যক্তিদের ডেথ চেয়ার। যদিও বর্তমানে কফিনের আকার কিছুটা বড়—কমপক্ষে দুই মিটার লম্বা।
মৃতদেহ প্রথমে বেতপাতা ও লতাগুল্মে মোড়ানো হয়, তার ওপর দেওয়া হয় একটি কম্বল। এরপর ডেথ চেয়ারে বসিয়ে বাড়ির মূল দরজার দিকে মুখ করে রাখা হয়, যাতে আত্মীয়স্বজন শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। দেহ পচন কিছুটা দেরিতে শুরু করা এবং দুর্গন্ধ আড়াল করার জন্য একটি মোমবাতি জ্বালানো হয়।
কয়েক দিন ধরে মৃতদেহের পাশে পাহারা দেওয়ার পর, সেটিকে চেয়ার থেকে নামিয়ে কফিনে স্থানান্তর করা হয়। আবারও হাড় ভেঙে দেহটিকে ভ্রূণাকৃতিতে রেখে বেতপাতা ও কম্বলে মুড়ে কফিন বন্ধ করা হয়।
মৃত্যু মানেই উৎসব ও আচার
ইগোরোট সমাজে কারো মৃত্যু হলে উৎসবের আয়োজন করা হয়। মুরগি ও শূকর জবাই করা হয়। যদি কোনো প্রবীণ মারা যান, তবে তিনটি শূকর ও দুটি মুরগি বলি দেওয়া হয়। কফিন পাহাড়ের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া লোকজন কফিন ছোঁয়ার চেষ্টা করেন। কারণ, তাদের বিশ্বাস, এতে সৌভাগ্য আসে।
শোভাযাত্রা পাহাড়ে পৌঁছালে তরুণরা খাড়া পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠে ফাঁপা কফিনে মৃতদেহ স্থাপন করেন। কফিনে ঠিকমতো ঢোকানোর জন্য আবারও হাড় ভাঙা হয় এবং পরে লতা দিয়ে কফিন সিল করে দেওয়া হয়।
ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই প্রথা
বর্তমানে এই প্রথা ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। সাগাদা গ্রামের প্রবীণরাই মূলত এখনো এই রীতি অনুসরণ করেন। খ্রিস্টান বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত তরুণ প্রজন্ম এখন সাধারণ কবরস্থানে মৃতদেহ সমাহিত করতেই বেশি আগ্রহী।
সূত্র : এনডিটিভি