শিরোনাম
◈ নেতানিয়াহু ও আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মিলে বিমান ছিনতাইয়ের নাটক সাজিয়েছেন: প্রেস টিভি ◈ অনূর্ধ্ব-১৯ পা‌কিস্তান নারী দল‌কে হারা‌লো বাংলা‌দেশ ◈ বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলার মামলায় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গ্রেফতার ◈ শিক্ষার্থী আন্দোলনে উত্তাল ফ্রান্স, বন্ধ ৪ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ◈ বাস-সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ময়মনসিংহে নিহত ৭ ◈ বিমানবন্দরে তর্ক-বিতর্ক : মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা ◈ গয়না থেকে স্মার্টফোন-মহাকাশযান, খাবারেও ব্যবহার হয় সোনা—জেনে নিন স্বর্ণের যত ব্যবহার ◈ সরকারের অজানা শত্রু কারা: ক্ষমতা বদলের পর আমলাতান্ত্রিক অন্তর্ঘাতের ঝুঁকি, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ◈ ভিসা সহায়তা দিতে ঢাকায় আসছে রোমানিয়ার টিম  ◈ মক্কার পর এবার মদিনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে হুথি, দাবি সৌদির

প্রকাশিত : ০২ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:৫৩ রাত
আপডেট : ০২ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:৫৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ভয় দেখিয়ে চুপ করানো নয়, অটিজম শিশুর আচরণে দরকার সঠিক কৌশল

ঢাকা পোস্ট : শিশু কোনো ভালো কাজ করলে আমরা তার প্রশংসা করি বা পছন্দের কিছু উপহার দিই। আবার অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো আচরণ থামাতে চাইলে তার কোনো সুবিধা সাময়িকভাবে কমিয়ে দিই। সাধারণ কথায় এগুলোকে পুরস্কার বা শাস্তি বলা হলেও অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুকে শেখানোর ক্ষেত্রে কেবল বড়দের এই দেওয়া-নেওয়া দিয়ে সফলতা বিচার করা যায় না। মূল বিষয় হলো—আমাদের পদক্ষেপের ফলে শিশুটি ভবিষ্যতে কাজটি বেশি করছে, নাকি কম করছে। তাই শিশুর নিজস্ব পছন্দ, শেখার গতি এবং তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

আচরণ বিশ্লেষণ বা এবিএর ভাষায় 'রিইনফোর্সমেন্ট' হলো এমন ব্যবস্থা, যার ফলে শিশু ভবিষ্যতে কোনো কাজ বেশি করে। আর ‘পানিশমেন্ট’ হলো এমন পদক্ষেপ, যার ফলে ভবিষ্যতে কোনো আচরণ কমে আসে। এই দুটির সঙ্গে জুড়ে থাকে ‘পজিটিভ’ (নতুন কিছু যুক্ত করা) এবং ‘নেগেটিভ’ (কোনো কিছু সরিয়ে নেওয়া) শব্দ দুটি। এগুলো ভালো বা মন্দের কোনো সূচক নয়। তাই শব্দের পেছনে না ছুটে দেখতে হবে-—ব্যবস্থা নেওয়ার পর শিশুর আচরণে কী পরিবর্তন এলো।

একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। শিক্ষক মানহাকে একটি ছবি আঁকতে দিলেন। সে ছবিটি শেষ করে দেখালে শিক্ষক বললেন, “খুব সুন্দর হয়েছে।' এই প্রশংসার পর মানহা যদি নিজে থেকেই আরও ছবি আঁকতে উৎসাহিত হয়, তবে এটি ‘পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট’। তবে একই প্রশংসা সব শিশুকে সমানভাবে উৎসাহিত না-ও করতে পারে। একইভাবে রাফিয়া গল্প শুনতে খুব ভালোবাসে। ক্লাসের পড়া শেষ করার পর শিক্ষিকা তাকে গল্প পড়ে শোনালেন। এতে উৎসাহিত হয়ে রাফিয়া যদি পরবর্তী ক্লাসগুলোতেও পড়া শেষ করে, তবে গল্প শোনানোর সুযোগটি তার জন্য পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট হিসেবে কাজ করেছে বলা যায়। অর্থাৎ শিশুর কোনো কাজের পর প্রশংসা বা পছন্দের কিছু দেওয়ার ফলে কাজটি ভবিষ্যতে বাড়লে তাকে পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট বলা হয়। এটি হতে পারে তার প্রশংসা করা, বাড়তি পাঁচ মিনিট খেলার সুযোগ দেওয়া কিংবা পছন্দের বই পড়তে দেওয়া। 

তবে মনে রাখা দরকার, সাধারণ উপহার বা পুরস্কার আর রিইনফোর্সমেন্ট এক জিনিস নয়। শিশু কাজ না করলেও তাকে পছন্দের চকলেট দেওয়া হলে নির্দিষ্ট কাজটি সম্পন্ন করবে বা করতে আগ্রহী হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার আজ যে খেলনাটি তার প্রিয়, কয়েক দিন পর তা আর ভালো না-ও লাগতে পারে। তাই শিশুর পরিবর্তনশীল পছন্দের দিকে নজর রাখতে হবে। শিশুকে কিছু দেওয়ার পরও যদি প্রত্যাশিত কাজটি না বাড়ে, তাহলে শিশুর ওপর দোষ না চাপিয়ে আমাদের পদ্ধতি বদলাতে হবে।

advertisement

এবার আসি ‘নেগেটিভ রিইনফোর্সমেন্টে’। এখানেও কোনো কাজ বাড়ানোই মূল বিষয়, তবে তা ঘটে শিশুর অপছন্দের কিছু সরিয়ে দেওয়ার ফলে। যেমন, মানহা সাধারণত লিখতে চায় না বা লিখলেও ধীরগতিতে লেখে। তাকে একটি কবিতা লিখতে ও একটি অঙ্ক সমাধান করতে দেওয়া হলো। শিক্ষিকা বললেন, ২০ মিনিটের মধ্যে নিৰ্ভুলভাবে কবিতাটি লিখলে নির্ধারিত অঙ্কুটি আর করতে হবে না। মানহা সময়ের আগেই কবিতাটি লিখল এবং শিক্ষিকাও কথা রাখলেন—অঙ্কটি আর করতে হলো না। এরপর থেকে মানহা যদি নিয়মিত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বলা যায়। অর্থাৎ আগে থেকে নির্ধারিত একটি কাজ সরিয়ে দেওয়ার পর তার লেখার আগ্রহ ও গতি বেড়েছে।

অন্যদিকে, সাধারণ অর্থে 'পানিশমেন্ট' বলতে বকাঝকা বা মারধরের কথা মনে এলেও এবিএর ভাষায় এর অর্থ ভিন্ন। কোনো আচরণের পরে কিছু ঘটার ফলে ভবিষ্যতে সেই কাজ কমে এলে তবেই তাকে পানিশমেন্ট বলা হয়। এখানে বড়দের উদ্দেশ্যের পাশাপাশি শিশুর ওপর এর প্রভাবও বিবেচ্য। কোনো শিশু ভয় পেয়ে সাময়িক চুপ করলেই সমস্যা মিটে যায় না। নতুন কিছু শেখার সুযোগ সে পেল কি না, তার সম্মান ও নিরাপত্তা বজায় থাকল কি না, সেটাও দেখতে হবে।

“পজিটিভ পানিশমেন্টের’ ক্ষেত্রে আচরণের পর কিছু যোগ করা হয়। ধরুন, একটি শিশু স্কুলে বারবার সহপাঠীদের রংপেন্সিল মেঝেতে ছুড়ে ফেলে। তাকে পেন্সিলগুলো মেঝে থেকে কুড়িয়ে গুছিয়ে রাখতে বলা হলো। এই অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার পর যদি ভবিষ্যতে পেন্সিল ছোড়ার ঘটনা কমে আসে, তবে তা পজিটিভ পানিশমেন্টের উদাহরণ হতে পারে। তবে পেন্সিল গুছিয়ে রাখার নির্দেশ দিলেই তাকে পানিশমেন্ট বলা যায় না; পরে আচরণটি

কমেছে কি না, সেটাও দেখতে হবে। আর পজিটিভ পানিশমেন্ট মানে শিশুকে ধমক দেওয়া, অপমান করা বা আঘাত করা নয়।

“নেগেটিভ পানিশমেন্টে’ শিশুর পছন্দের কোনো সুযোগ সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়। ক্লাসে অন্য শিশুদের সঙ্গে লুডু খেলার সময় একজন বারবার পাশের সহপাঠীর গুটি সরিয়ে দিচ্ছে। শিক্ষক তাকে কিছুক্ষণের জন্য খেলা থেকে বিরতি দিলেন, তারপর নিয়ম বুঝিয়ে আবার খেলতে দিলেন। পরবর্তী দিনগুলোতে অন্যের গুটি সরানোর ঘটনা কমলে সাময়িক এই বিরতি নেগেটিভ পানিশমেন্টের উদাহরণ হতে পারে। একই সঙ্গে নিজের গুটি নিয়ে নিয়ম মেনে কীভাবে খেলতে হয়, সেটিও শিশুকে দেখাতে হবে। বিরতি যেন দীর্ঘ না হয় কিংবা শিশুকে অপমান করার উপলক্ষ হয়ে না ওঠে। এখানেও মূল বিষয় হলো, পছন্দের সুযোগটি সাময়িক সরিয়ে নেওয়ার পর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ সত্যিই কমল কি না।

কোন পদ্ধতিতে কী ফল মিলছে, তা বুঝতে জটিল হিসাবের প্রয়োজন নেই। শিক্ষক বা অভিভাবক একটি সাধারণ খাতায় লিখে রাখতে পারেন—কোন পদক্ষেপ নেওয়া হলো, শিশুর নির্দিষ্ট আচরণটি আগে কতবার হতো, আর লাগছে। তবে কোনো দিন শিশু অসুস্থ থাকতে পারে, কোনো দিন ক্লাসের পরিবেশ বদলে যেতে পারে। তাই মাত্র এক দিনের পরিবর্তন দেখে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বাড়িতে যা কাজে দেয়, স্কুলেও তা একইভাবে
কাজে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

সহজে বলতে গেলে বিষয়টি এমন: কিছু যোগ করার পর কোনো কাজ বাড়লে তা পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট। অপছন্দের কিছু সরানোর পর কাজ বাড়লে নেগেটিভ রিইনফোর্সমেন্ট। কিছু যোগ করার পর কোনো কাজ কমলে পজিটিভ পানিশমেন্ট, আর পছন্দের কোনো সুযোগ সরানোর পর কাজ কমলে নেগেটিভ পানিশমেন্ট। নামগুলো মুখস্থ করার চেয়ে কোন কাজটি পরে বাড়ল বা কমল, সেটি দেখলে বিষয়টি সহজ হয়। এক শিশুর জন্য যা কার্যকর, অন্য শিশুর জন্য তা নাও হতে পারে।

একজন বিহেবিয়র থেরাপিস্ট হিসেবে আমি মনে করি, শিশুকে শেখানোর সময় তার ভালো লাগা, চেষ্টা ও সম্মানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শিশু কেবল ভয় পেয়ে চুপ হয়ে গেল কিন্তু কোনো কিছু শিখল না—একে সফলতা বলা যায় না। চারটি কঠিন শব্দ মুখস্থ করার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—সে নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতে পারছে কি না, অন্যের সঙ্গে সহজে মিশতে পারছে কি না এবং আনন্দের সঙ্গে নতুন কিছু শিখতে
পারছে কি না।

রায়হান খান

বিহেভেরিয়াল থেরাপিস্ট, যুক্তরাষ্ট্র।

পিএইচডি শিক্ষার্থী, বিশেষ শিক্ষা বিভাগ, ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটি।

  • সর্বশেষ