শিরোনাম
◈ চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি চুক্তি: বাংলাদেশের লাভ কতটা, ঝুঁকি কোথায়? ◈ কোনো দেশের মুখাপেক্ষী নয়, সমমর্যাদার অংশীদার হতে চায় বাংলাদেশ : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ◈ দিল্লিতে সিজেপি নেতাদের আটক, আগেই আন্দোলনের পরবর্তী নেতৃত্ব ঠিক করে রেখেছিলেন প্রতিষ্ঠাতা ◈ মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় যৌথ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের হিরা ◈ শেখ হাসিনার সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা হয়, তিনি দেশে ফিরতে চান: জি এম কাদের (ভিডিও) ◈ মানববর্জ্য ও কৃষিজ বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন, গবেষকদের পাশে থাকার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর ◈ ‘ভোট চুরির প্রমাণ চেয়েছেন রাষ্ট্রপতি, আমাদের কাছে তা আছে’: রাহুল গান্ধী ◈ খুলনার চার থানায় বিশেষ অভিযান, পুলিশ সদস্যদের একা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ◈ দিল্লিতে ধর্না থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আটক, কারণ জানাল পুলিশ ◈ ২০২৭ সালের হজ মিশন ভিসা পেতে ২৭০ এজেন্সিকে জরুরি নির্দেশ, তথ্য জমার শেষ সময় রোববার

প্রকাশিত : ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৪৭ রাত
আপডেট : ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৫৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মানসিক চাপে বিপর্যস্ত শিশুরা, বাড়ছে ট্রমার ঝুঁকি

রাজধানীর আহমেদ বাওয়ানী একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফা (ছদ্মনাম), বয়স ১১। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর গত তিন বছর ধরে নানা-নানির কাছে থেকেই পড়াশোনা করেছেন। কেবল স্কুল আসা যাওয়াতেই সীমাবদ্ধ তার জীবন। নানা-নানি ছাড়া তেমন কারও সঙ্গে কথা বলেন না। খেলাধুলা কিংবা ঘোরাঘুরি কোন কিছুতেই তার মন নেই। ক্লাসেও তেমন বন্ধুবান্ধব নেই। এমনকি ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত করতে চায় না। সারাক্ষণ মন খারাপ করে উদাসীন হয়ে থাকেন।

আলিফার নানা সোবহান চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর থেকে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছে মেয়েটা। ওর মাকে ওর বাবা প্রায়ই মারধর করতো। শেষ পর্যন্ত সংসারটা আর টেকেনি। ওদের তালাক হয়ে যায়। সেই থেকেই মেয়েটা মন খারাপ করে থাকে। দু’বার কাউন্সিলিং করানো হয়েছে। কিন্তু বাবা-মায়ের বিষয়টা নিয়ে এমনভাবে ট্রমাটাইজড হয়েছে তিন বছরেও স্বাভাবিক হতে পারলো না।’ 

আলিফার মতো এমন অসংখ্য শিশু বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর কিংবা ভয়াবহ ঘটনার সম্মুখীন হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ট্রমায় পড়ে যায়। যা তাদের মনের উপর গভীর প্রভাব ফেলে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। এ থেকে সঠিকভাবে কাউন্সিলিংয়ের অভাবে অনেকেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হন। 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ‘বাংলাদেশ তথ্যচিত্র: ২০২৬’-এর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু-কিশোর বিভিন্নভাবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এরমধ্যে ৫ দশমিক ১ শতাংশ শিশু-কিশোর নিউরোডেভলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত, ৪ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু-কিশোর উদ্বেগজনিত রোগে (অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার) আক্রান্ত এবং ১ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু-কিশোর কনডাক্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত।

Advertisement

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনও সহিংস পরিস্থিতি, রাজনৈতিক বা পারিবারিক সহিংসতা শিশুদের মানসিক চাপে ফেলে ট্রমা সৃষ্টি করে। শারীরিক বা মানসিক আঘাত, যা দীর্ঘদিন শিশুর স্মৃতিতে থাকে এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা না গেলে তা সারাজীবন শিশুকে তাড়া করে, এতে তার জীবনে নানা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, এমনি জীবনকেও হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। এর থেকে বেরিয়ে আসতে বাবা-মা এবং নিকটাত্মীয়ের আদর-যত্ন জরুরি।

শিশুদের মানসিক চাপ ও ট্রমায় পড়ার উল্লেখযোগ্য কারণ

শিশুদের মানসিক ট্রমার মধ্যে পড়ার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। বিশেষ করে পারিবারিক পরিবেশ, স্কুল ও পড়াশোনা ও সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন সহিংসতার কারণে শিশুদের মানসিক চাপ এবং ট্রমার সৃষ্টি হয়। 

শিশুদের ট্রমা সৃষ্টির পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাবা-মায়ের মধ্যে কলহ, পারিবারিক অশান্তি কিংবা বিবাহবিচ্ছেদ শিশুদের মাঝে গভীরভাবে চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়াও পরীক্ষার পড়া কিংবা স্কুলের প্রতিযোগিতা, বন্ধুদের সঙ্গে মনোমালিন্য এবং বুলিং মানসিক চাপের অন্যতম কারণ। এমনকি বাবা-মায়ের অতিরিক্ত শাসন এবং টেলিভিশনে রাজনৈতিক সহিংসতার দৃশ্যও মানসিক ট্রমা সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

নিজের বাচ্চার মানসিক ট্রমা সৃষ্টির পেছনের কারণ বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা রাজিব আহসান। তার ছেলে সজিব (১৩) ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটা বেশ স্বাস্থ্যবান। এর কারণে ওর বন্ধুবান্ধব অনেকভাবে বুলিং করেছে। বিষয়টি আমি প্রথমে অবগত ছিলাম না। সে স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করতো। পরে একদিন কী সমস্যা জিজ্ঞাসা করতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরে আমি স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের বিষয়টি জানানোর পর অন্যরা বুলিং করা বন্ধ করেছে।’ 

ঢাকা গভর্নমেন্ট মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহেদ (১৩)। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে পুরান ঢাকায় সহিংস পরিস্থিতি দেখে দীর্ঘদিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তার বাবা মিল্লাত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টেলিভিশনে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার দৃশ্য দেখে আমার ছেলেটা ঘাবড়ে যায়। একবার প্রাইভেট পড়ে আসার পথে পুলিশের অনবরত গুলি ছোঁড়া দেখে সে ভীষণ ভয় পায়। মাস দুয়েকের মতো সে অস্বাভাবিক আচরণ করেছে। পরবর্তী সময়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েছি। এখন আলহামদুলিল্লাহ ঠিক আছে, তবে ওইসব স্মৃতি এখনও ভুলতে পারেনি।’ 

পড়াশোনার চাপে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ট্রমায় যাচ্ছে শিশুরা

শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবা (১৪)। পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপে গত বছর ঢাকার সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে অষ্টম শ্রেণি পাস করেই স্কুল পরিবর্তন করেন তিনি। 

সাবার মা নাজিয়া বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাবা ছোটবেলায় সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করতো। ক্লাসের পড়া ঠিকমতো বলতে না পারলে কিংবা পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে শিক্ষকদের কাছ থেকে তাকে অনেক অপমানজনক কথা শুনতে হতো। প্রায়ই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে একধরনের ভয় ও আতঙ্ক তৈরি হতে থাকে। সাবা যত বড় হতে থাকে, এই ভয়ও তত বাড়তে থাকে।’ 

তিনি বলেন, ‘একপর্যায়ে বাসায় কেউ জোরে কথা বললে কিংবা বাইরে থেকে হঠাৎ জোরে কোনও শব্দ এলেও সে ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়তো। কিন্তু বাবা-মা হিসেবে প্রথম দিকে আমরা বিষয়টিকে সেভাবে বুঝতে পারিনি। আমাদের মনে হতো, হয়তো পড়াশোনা না করার অজুহাত দিচ্ছে, কিংবা সবই তার অভিনয়। ছোটবেলা থেকে জমতে থাকা এই ভয় ও মানসিক চাপ একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একদিন বাসার শিক্ষকের কাছে পড়া না পারায় বকা খেয়ে তার প্রথমবারের মতো প্যানিক অ্যাটাক হয়। তখন তার হাত-পা শক্ত হয়ে গিয়েছিল, আর মুখ দিয়ে লালা বের হচ্ছিলো। এছাড়াও অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছিলো। আমরা খুব ভয় পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই। চিকিৎসক পরবর্তীকালে আমাদের আমাদের বোঝান যে, অতিরিক্ত মানসিক চাপ থেকেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’ 

শিশুদের মানসিক চাপ থেকে সৃষ্ট রোগের বিষয়ে নাজিয়া বেগম বলেন, ‘আসলে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের ধারণা খুব একটা পরিষ্কার ছিল না। আমরা ভাবতাম, বাচ্চারা পড়াশোনা করবে, খাবে, খেলবে— তাদের জীবনে আবার এত চাপ কীসের! তারা কী নিয়ে চিন্তা করে, কীভাবে মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যায়, কিংবা ছোট ছোট ঘটনা তাদের মনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, সেগুলো বাবা-মা হিসেবে আমরা খুব একটা ভাবতাম না।‌ সাবার এই অবস্থা নিজের চোখে না দেখলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না। একটা শিশুর মনের ভেতর কতটা ভয় আর চাপ জমে থাকতে পারে। এখন বুঝি, শিশুরা সবসময় তাদের কষ্ট মুখে প্রকাশ করতে পারে না। তাদের আচরণের পরিবর্তনের পেছনেও অনেক সময় গভীর মানসিক যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকে। এসব বোঝার পরপরই ওর স্কুল পরিবর্তন করে দিয়েছি। ওকে বলেছি মা তুই তোর ইচ্ছেমত পড়াশোনা কর, মন না চাইলে করিস না।’

শিশুদের মানসিক চাপের শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ

শিশুরা মানসিকভাবে চাপে পড়লে‌ শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশকিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ইউনিসেফের তথ্যমতে, শিশুদের মাঝে মানসিক চাপের বিভিন্ন লক্ষণ ও উপসর্গ আছে। এর ব্যাখ্যা দিয়ে সংস্থাটি বলে, যখন শরীর চাপের মধ্যে থাকে তখন এটি অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো হরমোন তৈরি করে, যা আমাদেরকে জরুরি পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত করে, এটি ‘ফাইট বা ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া হিসেবেও পরিচিত। এটি একটি শিশুর মন ও শরীরের ওপর অনেক প্রভাব ফেলতে পারে।

শারীরিক প্রভাব: দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, ঘাম ও হার্টবিট বেড়ে যাওয়া, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা ও ঘুমাতে অসুবিধা, বমি বমি ভাব, বদহজম বা হজমের সমস্যা, খুব বেশি বা খুব কম খাওয়ার ফলে ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস, অস্বস্তি ও ব্যথা এবং প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়া।

আবেগীয় ও মানসিক প্রভাব: বিরক্তি ও রাগ, মেজাজ বিগড়ে যাওয়া বা পরিবার ও বন্ধুদের থেকে সরে যাওয়া। দায়িত্বে অবহেলা করা, কার্য সমাধানে কম দক্ষতা বা মনোযোগ দিতে অসুবিধা হওয়া। ক্রমাগত দুঃখ বোধ করা বা অশ্রুসিক্ত হওয়ার মতো মানসিক যন্ত্রণা। 

এই লক্ষণগুলো প্রায়ই আরও মানসিক চাপের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আপনার সন্তানকে এ ধরনের মানসিক অবস্থা সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করতে সাহায্য করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা এমনটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা মোকাবেলা করতে পারে।

মানসিক ট্রমার ফলে যে প্রভাবগুলো শিশুদের ওপর পড়তে পারে

মানসিক অতিরিক্ত চাপ বা ট্রমার ফলে শিশুদের মধ্যে ভয় এবং আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। তারা সবসময় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকে এবং আশঙ্কায় থাকে, যেন কিছু একটা খারাপ ঘটতে যাচ্ছে। অনেক শিশু এই ধরনের ঘটনার পর অবসাদগ্রস্ত এবং বেশ দুঃখী হয়ে পড়ে। তারা সহজে হাসি-খুশি হতে পারে না এবং কোনও কিছুতেই মনোযোগী হতে পারে না। কিছু শিশু এই ধরনের ঘটনার পর খুব রেগে যায় এবং ছোটখাটো বিষয়েও বিরক্ত হয়।

এছাড়া ট্রমাগ্রস্ত শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে কষ্ট হয়। তারা স্কুলে মনোযোগ দিতে এবং বন্ধুদের সঙ্গে ঠিকমতো মিশতে পারে না। এমনকি সাধারণ কার্যকলাপেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। শিশুর আশেপাশের ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর কারণে সমগ্র সামাজিক নৈতিক ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে শুরু করবে। তার অবিশ্বাস, সন্দেহ ও ক্ষোভ  বেড়ে যাবে। শিশু বিভ্রান্ত হতে পারে, তার পাঠ্যপুস্তক, তার গোটা জীবন ও অস্তিত্ব যেখানে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে তা তাদের মনোজগতে বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শিশুদের মানসিক চাপ বা ট্রমা থেকে উত্তরণের উপায়

শিশুদের মানসিক চাপ বা ট্রমা থেকে উত্তরণের জন্য বাবা-মা এবং নিকটাত্মীয়দের বেশি বেশি সময় দেওয়া এবং শিশুদের কথা শোনা ও তাদের অনুভূতিকে মূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিশুর কথা শুনতে হবে, শিশুকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। তারা কী অনুভব করছে, তাদের কষ্টগুলো কী, তা শোনার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে পেশাদার মনোবিজ্ঞানীর সহায়তা নিতে হবে। তারা শিশুদের ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করবেন।’ 

এই চিকিৎসক বলেন, ‘শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থ রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে বাবা-মাকে। তাদের বুঝতে হবে, প্রত্যেক প্রজন্মের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আমরা আমাদের শৈশবে যেভাবে বেড়ে উঠেছি, আমাদের সন্তানদেরও ঠিক সেভাবে বেড়ে উঠতে হবে কিংবা তারা আমাদের মতোই আচরণ করবে— এমন প্রত্যাশা করা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। যুগ, সময় ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের লালন-পালনের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। অন্য শিশুর সঙ্গে নিজের সন্তানের তুলনা না করে, তার ছোট ছোট অর্জনগুলোর প্রশংসা করা এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো করার জন্য তাকে উৎসাহিত করা জরুরি।’ 

অভিভাবকের উদ্দেশে এই চিকিৎসক বলেন, ‘তোমার সঙ্গে এই বাচ্চাটা পেরেছে, তুমি কেন পারবে না?’— এই একটি বাক্যই অসংখ্য শিশুর মনে গভীর মানসিক ক্ষত তৈরি করতে পারে। এমন কিছু কোনোভাবেই অভিভাবকদের করা উচিত নয়। বড় বড় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রায়ই এমন অনেক মর্মান্তিক ঘটনার খবর দেখতে হয়, যেখানে বাবা-মায়ের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার হতাশা থেকে সন্তান আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্ত নেয়। একটি পরীক্ষার ফলাফল কখনোই একটি শিশুর জীবনের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না। অথচ অনেক অভিভাবক শিশুদের সেই বার্তা দেয়। যার ফলে শিশুদের কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘শিশুর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে তার সঙ্গে সুস্থ আলোচনা ও আন্তরিক কথোপকথনের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। তার আচরণে কোনও পরিবর্তন দেখা দিলে রাগ করা, বকাঝকা করা কিংবা শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে সেই পরিবর্তনের কারণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কঠোর ভাষার পরিবর্তে কোমল ও সহানুভূতিশীল কথার মাধ্যমে তাকে বোঝানো জরুরি। অনেক সময় শিশু কোনও সমস্যা নিয়ে বাবা-মায়ের কাছে আসে, কিন্তু তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে নিছক অজুহাত বলে উড়িয়ে দেন। অথচ যে সমস্যাটি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছে তুচ্ছ মনে হতে পারে, সেটিই একটি শিশুর কাছে গভীর মানসিক কষ্টের কারণ হতে পারে। তাই সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাকে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া প্রয়োজন, যেখানে সে নির্ভয়ে নিজের কষ্ট, ভয় ও সমস্যার কথা বলতে পারে।’ 

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন 

  • সর্বশেষ