শিরোনাম
◈ যুক্তরাষ্ট্রে নিঝুম মজুমদারকে হেনস্তা করে যুক্তরাষ্ট্র যুবদল, ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের সামনে (ভিডিও) ◈ প্রধানমন্ত্রীর দেখা না পেয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের ওপর ক্ষু'ব্ধ নেতাকর্মীরা, হেনস্তার চেষ্টা (ভিডিও) ◈ উপজেলা পরিষদের প্রশাসক হলেন ৮ ইউএনও ◈ কুমিল্লায় সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আটক ◈ বাংলাদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগকে আর রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ◈ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নির্দেশনা সারাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে ◈ মোহাম্মদপুরে কয়েকশ’ লোকের হামলা-ভাঙচুর, ১৫ লাখ টাকা ও জমির দলিল লুটের অভিযোগ ◈ টিকটক পরিচয়ে কুমিল্লায় দেখা করতে গিয়ে কিশোরী ধর্ষণের শিকার, অভিযুক্ত পলাতক ◈ গাইবান্ধায় যেভাবে কণ্ঠ নকল করে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার ফাঁদ পাতেন প্রতারক (ভিডিও) ◈ যুক্তরাজ্যে ঘুরে দাঁড়াল বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি, আগস্টে প্রবৃদ্ধি ১০.৫৩%

প্রকাশিত : ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৪৯ বিকাল
আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৩৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সীসার বিষে নীরবে পঙ্গু হচ্ছে শিশুর মেধা, বছরে ক্ষতি ১৬ বিলিয়ন ডলার

ঢাকা পোস্টার প্রতিবেদন : রইছ উদ্দিন আগে কাজ করতেন আমিনবাজারের একটি ইটভাটায়। ২০২৪ সালের জুনে মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকার একটি ব্যাটারি মেরামত ও রিসাইক্লিং কারখানায় শ্রমিক হিসেবে যোগ দেন তিনি। অস্থায়ী সেই কারখানার কাছেই খুপরি ঘর ভাড়া নিয়ে পরিবার নিয়ে থাকতে শুরু করেন। তবে, নতুন কারখানায় কাজ শুরুর পর তার জীবনে যেন অমাবশ্যার অন্ধকার নেমে আসে। সাত বছরের ছেলে আদিব ও চার বছরের শিশুকন্যা জাহানারাকে নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন তিনি।

মিরপুর ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের সামনে কথা হয় রইছ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘কারখানাটি বাইর থেকে বোঝার উপায় ছিল না। চারদিকে ছিল টিনের বেড়া আর কিছু গাছপালা। কাজ শুরুর পরেই সেখান থেকে তীব্র আর ঘন কালো ধোঁয়া বের হতে শুরু করে। যেখানে কোনো ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই সীসা-অ্যাসিডযুক্ত ব্যাটারি রিসাইক্লিং করা হতো।’

দেশে ৫ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৪ জন (৩৮.৩ শতাংশ) এবং গর্ভবতী নারীদের ৭.৫ শতাংশের রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সীসা রয়েছে। বিভাগীয় পরিসংখ্যানে ঢাকা শীর্ষে, যেখানে ৬৫.২ শতাংশ শিশু এবং ২২.৮ শতাংশ গর্ভবতী নারী সীসা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত। ঢাকার বস্তি এলাকার ৯৮ শতাংশ শিশুর দেহে সীসার উপস্থিতি শনাক্ত করেছে আইসিডিডিআর,বি
সেই বিষাক্ত ধোঁয়া খুব দ্রুতই আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। চারপাশের ভবন, টিনের চাল, দেওয়াল আর গাছপালাগুলো কালচে রঙ ধারণ করে। শিশুরা যে জায়গায় খেলাধুলা করত, শ্রমিকরা যেখানে বসত— সেই স্থানও কুচকুচে কালো হয়ে যায়। তবে, এর পেছনের ভয়াবহ কারণ বুঝতে রইছ উদ্দিনের লেগে যায় ছয় মাস; ততদিনে অসুস্থ হয়ে পড়ে তার প্রিয় দুই সন্তান।

দুই শিশুকে চিকিৎসার জন্য পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার প্রতিবেদনে ধরা পড়ে, দুই বাচ্চার শরীরেই সীসার মারাত্মক উপস্থিতি রয়েছে। খোলা চুলায় ব্যাটারি থেকে গলানো সীসার কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাস দূষিত করার কারণেই এমন বিপর্যয় ঘটেছে।

advertisement

রইছ উদ্দিন আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘মেধাবী চটপটে দেখেই খুব কষ্ট করে আদিবকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম। কিন্তু এখন ও কিচ্ছু মনে রাখতে পারে না। আর জাহানারার দুধের দাঁত ওঠার আগেই মাড়ি ক্ষয়ে গেছে, রক্ত পড়ে। রক্ত পরীক্ষা করিয়ে ডাক্তার জানান, মাড়ি দিয়ে রক্তক্ষরণ ও দাঁত ক্ষয়ে যাওয়ার মূল কারণ সীসার বিষক্রিয়া।’

শৈশবে সীসা দূষণের কারণে শিশুদের আইকিউ কমে যাওয়ায় কর্মজীবনে কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। ফলে দেশে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। কেবল ২০১৯ সালেই স্বাস্থ্য খাতে মোট ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৮.৬ বিলিয়ন ডলার, যা জাতীয় জিডিপির প্রায় ৬ থেকে ৯ শতাংশের সমতুল্য

চিকিৎসকরা যেসব পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে বলেছেন, তা কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও আমার নেই— আক্ষেপ করে বলেন রইছ উদ্দিন। 

আদিব বলে, ‘জায়গাটা খুব খারাপ ছিল। কালো ধোঁয়া বের হতো, শ্বাস নিতে কষ্ট হতো। পড়াশোনায় মন বসে না, ক্লাসে যেতেও ইচ্ছে করে না। সবকিছু ভুলে যাই।’

শুধু আদিব বা জাহানারা নয়, বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে সীসা বিষক্রিয়া ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’য় রূপ নিয়েছে। স্বাদহীন, গন্ধহীন ও খালি চোখে অদৃশ্য এই বিষাক্ত ভারী ধাতু নীরব ঘাতক হিসেবে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে। সীসা শরীরে জমা হলে তা হৃৎপিণ্ড, কিডনি ও মস্তিষ্কসহ বিভিন্ন অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি করে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়— শিশুর শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সময়েই সীসা তাদের আইকিউ পয়েন্ট কমিয়ে দিচ্ছে। অথচ অধিকাংশ অভিভাবকই সীসার বিষক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন নন।

গর্ভবতী নারী ও শিশুদের প্রাণঘাতী ঝুঁকি

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) শিশুদের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৩.৫ মাইক্রোগ্রাম সীসাকে উদ্বেগজনক মনে করলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্পষ্ট জানিয়েছে, রক্তে সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। সংস্থাটির মতে, রক্তে সীসার পরিমাণ প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

এমনকি বাড়িতে মা-বাবার দেওয়া সহজ নির্দেশ মনে রাখা বা তা মেনে চলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। শৈশবে আইকিউ পয়েন্ট হারানোর ফলে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ, দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা এবং আজীবন উপার্জনের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়।---ড. প্রিসিলা ওবিল, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ

ডব্লিউএইচও বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ক্ষেত্রে সীসার বিষক্রিয়া বহুগুণ বেশি বিপজ্জনক। কারণ, শৈশবে মস্তিষ্কসহ শরীরের নানা সংবেদনশীল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকশিত হতে থাকে। এই সময়ে দীর্ঘমেয়াদে অল্প অল্প করে সীসার সংস্পর্শে এলে শিশুর ওপর তা স্থায়ী ও মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলে, যার ক্ষতি অপূরণীয়। এর ফলে শিশুদের নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা হ্রাস পায়, স্নায়ুবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং আচরণে অস্বাভাবিক অস্থিরতা বা উগ্রতা দেখা দিতে পারে।

একই সঙ্গে গর্ভবতী নারী ও গর্ভস্থ শিশুর ওপর সীসা দূষণের প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক। কারণ, সীসা গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা ভেদ করে সরাসরি ভ্রূণের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে গর্ভপাত, গর্ভেই শিশুর মৃত্যু অথবা নির্ধারিত সময়ের আগেই অপরিণত শিশুর জন্ম হওয়ার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।

ঢাকার বস্তির ৯৮% শিশুর রক্তে সীসা

রাজধানী ঢাকার বস্তি এলাকার শিশুদের রক্তে সীসার মারাত্মক উপস্থিতি শনাক্ত করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এক গবেষণায় ২ থেকে ৪ বছর বয়সী ৫০০ শিশুর রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা যায়, ৯৮ শতাংশ শিশুর দেহেই সীসা রয়েছে। এসব শিশুর রক্তে সীসার গড় মাত্রা পাওয়া গেছে প্রতি ডেসিলিটারে ৬৭ মাইক্রোগ্রাম, যা অত্যন্ত ভয়াবহ।

সীসার বিষক্রিয়ায় বাংলাদেশে শিশুদের প্রতি বছর আনুমানিক ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) আইকিউ পয়েন্ট নষ্ট হচ্ছে; যার ফলে জীবনের প্রথম ৫ বছরেই প্রতিটি শিশু গড়ে ৬.৯ আইকিউ পয়েন্ট হারাচ্ছে। এর প্রভাবে শিশুদের স্নায়ুবিক বৃদ্ধি, বুদ্ধিমত্তা, স্মৃতিশক্তি ও সাধারণ শেখার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতি ১০ শিশুর ৪ জনই আক্রান্ত

সীসার বিষক্রিয়ায় বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক, তা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভেতে (এমআইসিএস ২০২৫)। ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১১ হাজারের বেশি শিশু এবং দুই হাজারের বেশি গর্ভবতী নারীর ওপর এই পরীক্ষা চালানো হয়। দেশে এটিই ছিল প্রথম কোনো বিস্তৃত সার্ভে, যেখানে সীসা ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছে।

প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৪ জনের (৩৮.৩ শতাংশ) রক্তেই উচ্চমাত্রার সীসা রয়েছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত নিরাপদ সীমার (প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম) চেয়ে অনেক বেশি। একই সঙ্গে ৭.৫ শতাংশ গর্ভবতী নারীর রক্তেও অতিরিক্ত সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। 

শুধু তা-ই নয়, রাজধানী ঢাকার সার্বিক চিত্রে দেখা যায়— ঢাকার ৬৫ শতাংশ শিশুর রক্তেই রয়েছে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি সীসা।

এই ফলাফলকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) জানিয়েছে, শিশুরা তাদের বেড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই মারাত্মক বিষের শিকার হচ্ছে। যখন তাদের কথা বলা ও শেখার বয়স, প্রাণ খুলে খেলাধুলা করা এবং চারপাশের জগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সময়, তখনই তারা প্রতিনিয়ত সীসার মতো ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শে আসছে। ফলে শিশুদের শেখার ক্ষমতা, আচরণ এবং তাদের পরিপূর্ণ মেধা ও সম্ভাবনার স্বাভাবিক বিকাশ গুরুতরভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়াই এই দূষণের প্রধান উৎস। এছাড়া গুঁড়া মসলায় ভেজাল, সীসাযুক্ত রঙ, অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র ও ই-বর্জ্যের মাধ্যমে এটি ছড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা অবৈধ ব্যাটারি কারখানা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং উৎসমুখী নজরদারির জোর তাগিদ দিয়েছেন

বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি ১৬ বিলিয়ন ডলার

মূলত তিনটি উপায়ে— নাক, মুখ ও ত্বকের মাধ্যমে শিশুসহ সব বয়সী মানুষের শরীরে ঢুকছে নীরব ঘাতক সীসা। গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্তে অতিরিক্ত সীসা থাকলে তা প্লাসেন্টা ভেদ করে অনাগত সন্তানের রক্তেও প্রবেশ করে। এই বিষক্রিয়ার কারণে জীবনের প্রথম পাঁচ বছরেই শিশুদের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা ‘পিওর আর্থ’-এর অর্থায়নে অর্থনীতিবিদ বিয়র্ন লারসেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সীসা দূষণ ও বিষক্রিয়ার কারণে বাংলাদেশে ছোট শিশুদের মধ্যে প্রতি বছর আনুমানিক ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) আইকিউ পয়েন্ট নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে জীবনের প্রথম ৫ বছরে প্রতিটি শিশু গড়ে ৬.৯ আইকিউ পয়েন্ট হারায়। এই গবেষণায় ২০১১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা ১৫ বছরের চিত্র ও অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ২০১৯ সালেই আইকিউ হ্রাসের প্রভাবে মানসম্পন্ন মানবসম্পদ গড়ে না ওঠাসহ বাংলাদেশে সীসা দূষণজনিত কারণে স্বাস্থ্য খাতের মোট ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮.৬ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৬ থেকে ৯ শতাংশের সমতুল্য। শৈশবে সীসা দূষণের কারণে বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ কমে যাওয়ায় কর্মজীবনে যে উৎপাদনশীলতা নষ্ট হয়, তার বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশি শিশুদের রক্তে সীসার উপস্থিতির চিকিৎসাগত তথ্য (ক্লিনিক্যাল ডেটা) বিশ্লেষণ করলে যেকোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একে ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করা যায়।

সরকার ইতোমধ্যে সব ধরনের রঙে ও জ্বালানি তেলে সীসার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। তবে, বাংলাদেশকে সীসা দূষণমুক্ত করতে হলে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। কঠোর আইন প্রয়োগ ও তদারকির মাধ্যমে সীসার অপব্যবহার বন্ধের কোনো বিকল্প নেই।---ডা. মো. মাহবুবুর রহমান, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্রকল্প সমন্বয়কারী, এনভায়রনমেন্টাল ইন্টারভেনশনস ইউনিট, আইসিডিডিআর,বি

বাংলাদেশে ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. প্রিসিলা ওবিল বলেন, ‘সীসা সরাসরি বিকাশমান মস্তিষ্কে আঘাত হানে এবং শিশুদের মানসিক সক্ষমতা বা বুদ্ধিমত্তা (cognitive capacity) স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আক্রান্ত শিশুরা শ্রেণীকক্ষে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে, নতুন পাঠ গ্রহণে সমস্যায় পড়ে এবং আগের দিনের পড়া ভুলে যায়। এমনকি বাড়িতে মা-বাবার দেওয়া সহজ নির্দেশ মনে রাখা বা তা মেনে চলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে।’

‘শৈশবে আইকিউ পয়েন্ট হারানোর ফলে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ, দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা এবং আজীবন উপার্জনের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়।’

চঞ্চল শিশু হারিয়ে ফেলছে স্মৃতিশক্তি

সীসার বিষক্রিয়ায় শিশুদের মানসিক বিকাশ কীভাবে থমকে যাচ্ছে, তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার আতাউর রহমানের ১১ বছর বয়সী কন্যা। মিটফোর্ড এলাকার একটি ওষুধের দোকানের এই কর্মচারী জানান, মেয়ের বয়স যখন ৯ বছর, তখন প্রথম বুঝতে পারেন যে মেয়ে যতটা চঞ্চল ছিল, ততটাই ভুলো মনের হয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে তার মনে রাখার ক্ষমতা কমে যেতে থাকে; এমনকি একপর্যায়ে আত্মীয়-স্বজনদের নামও ভুলে যেতে শুরু করে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করালেও পড়াশোনায় কোনো মন ছিল না তার।

আতাউর রহমান বলেন, প্রথমে মিটফোর্ড হাসপাতালেই ডাক্তার দেখাই। ডাক্তাররা ভিটামিন-সি জাতীয় খাবার বাড়াতে বলেন এবং মোবাইল ও টিভির স্কিনটাইম কমিয়ে মনোযোগ ধরে রাখার কিছু কৌশল বাতলে দেন। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছিল না। পরে আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি বিভাগে যাই। সেখানকার চিকিৎসকরাই প্রথম রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষার পরামর্শ দেন।

তিনি জানান, আইসিডিডিআর,বি-র জরিপ চলাকালেই পরীক্ষা করা হলে রক্তের প্রতিবেদনে উঠে আসে ঘাতক সীসার নাম; মেয়ের রক্তে সীসার মাত্রা ছিল ৫ ডেসিলিটার। এরপর চিকিৎসকদের পরামর্শে মেয়েকে বাঁচাতে মিটফোর্ডের বাসা ছেড়ে পল্টনে চলে আসেন তারা। তবে, বাসা বদলালেও মেয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থার উন্নতি এখনও আশাব্যঞ্জক নয়।

উচ্চমাত্রার সীসা মানুষের, বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক বিকাশ, আচরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব রোধ করতে ‘পিওর আর্থ বাংলাদেশ’ সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
মিতালী দাশ, বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর, পিওর আর্থ

প্রাপ্তবয়স্কদের রক্তেও বিপজ্জনক উপস্থিতি

সীসার ভয়াবহ প্রভাব শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এর উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলে বসবাসকারী ২৬ বছর বয়সী এক যুবকের শরীরে মিলেছে কল্পনাতীত মাত্রার সীসা, প্রায় ৬৫ µg/dL (মাইক্রোগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার)। আইসিডিডিআর,বি জানায়, এমন আশঙ্কাজনক অবস্থায় রোগীকে অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি করে ‘চিলেশন থেরাপি’-র মাধ্যমে শরীর থেকে ক্ষতিকর ভারী ধাতু বা সীসা বের করার জরুরি চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন।

যেভাবে ছড়াচ্ছে সীসার বিষ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সীসা দূষণবিরোধী বিশ্লেষকদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের প্রভাবে পরিবেশে ভারী ধাতুর উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর ফলে বাতাস, পানি, মাটি, খাদ্যদ্রব্য, খেলনা, গৃহস্থালির রঙ এবং রান্নার পাত্রের মাধ্যমে শিশুরা সহজেই এই বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসছে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নারী ও শিশুদের ওপর সীসা দূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এটি স্থায়ী স্নায়বিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘পিওর আর্থ’-এর গবেষণা এবং ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (এমআইসিএস) প্রতিবেদন দুটিতে সীসা দূষণের প্রধান প্রধান উৎস ও ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে উৎসমুখী নজরদারির তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন দুটির তথ্য অনুযায়ী, গৃহস্থালি পরিবেশের দূষণ শিশুদের সীসার সংস্পর্শে আসার অন্যতম বড় কারণ। এর প্রধানতম উৎস হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যাটারি রিসাইক্লিং (Informal Battery Recycling)। অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ উপায়ে ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ভাঙা এবং তা গলানোর কারখানার কাছাকাছি বসবাসকারী সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা সবচেয়ে বেশি সীসা বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছে।

এছাড়া, খাবার ও মসলায় সীসার ভেজাল মেশানো, সীসাযুক্ত রং ও বাতাসে ভেসে বেড়ানো ধূলিকণা, বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহৃত মানহীন ধাতব বা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল, সীসার প্রলেপযুক্ত প্লাস্টিকের খেলনা, অনিয়ন্ত্রিত ই-বর্জ্য এবং বাণিজ্যিক মৎস্য চাষে ব্যবহৃত মানহীন ফিডের মাধ্যমে এই নীরব ঘাতক সীসার বিষক্রিয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ওপর সীসার প্রভাব বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর এবং এই ক্ষতি চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়। তাই স্পষ্ট আইন এবং বিশেষ করে বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
রানা ফ্লাওয়ার্স, বাংলাদেশের সাবেক প্রতিনিধি, ইউনিসেফ
সীসা দূষণের প্রধান হটস্পট ঢাকা

মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস ২০২৫) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে সীসা বিষক্রিয়ার প্রধান হটস্পট হলো ঢাকা। ঢাকা বিভাগে দেশের সর্বোচ্চ ৬৫.২ শতাংশ শিশু সীসা বিষক্রিয়ার শিকার। এর পাশাপাশি ঢাকার ২২.৮ শতাংশ গর্ভবতী নারীর রক্তেও মিলছে সীসা, যা দেশের সব বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ।

অন্যান্য বিভাগের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সিলেট, যেখানে ৪৬.৭ শতাংশ শিশু ও ৩.৯ শতাংশ গর্ভবতী নারী আক্রান্ত। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ৪২.১ শতাংশ শিশু ও ২.২ শতাংশ গর্ভবতী নারী; ময়মনসিংহে ৩০.৬ শতাংশ শিশু ও ০.০ শতাংশ গর্ভবতী নারী; বরিশালে ২৯.০ শতাংশ শিশু ও ২.৫ শতাংশ গর্ভবতী নারী; রংপুরে ১৯.৬ শতাংশ শিশু ও ১.৫ শতাংশ গর্ভবতী নারী; খুলনায় ১৭.৮ শতাংশ শিশু ও ১.৯ শতাংশ গর্ভবতী নারী এবং রাজশাহী বিভাগে ১৫.৯ শতাংশ শিশু ও ৫.৫ শতাংশ গর্ভবতী নারী সীসা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত।

চাই কঠোর আইনি নজরদারি

সীসা দূষণ মোকাবিলায় আইসিডিডিআর,বি-র এনভায়রনমেন্টাল ইন্টারভেনশনস ইউনিটের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মাহবুবুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সরকার ইতোমধ্যে সব ধরনের রঙে ও জ্বালানি তেলে সীসার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। তবে, বাংলাদেশকে সীসা দূষণমুক্ত করতে হলে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। কঠোর আইন প্রয়োগ ও তদারকির মাধ্যমে সীসার অপব্যবহার বন্ধের কোনো বিকল্প নেই।’

ইউনিসেফ সীসা দূষণকে বাংলাদেশের জন্য একটি মারাত্মক ‘পরিবেশগত স্বাস্থ্য সংকট’ বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সীসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ। বর্তমানে দেশের সাড়ে ৩ কোটিরও বেশি শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সীসা রয়েছে। তবে আশার কথা হলো, এই দূষণ সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য; তাই সীসার সম্ভাব্য উৎসগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

এ বিষয়ে ইউনিসেফ, বাংলাদেশের সাবেক প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘বাল্যবিবাহ ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস প্রমাণ করে যে যৌথ প্রচেষ্টায় অগ্রগতি সম্ভব। তবে, সীসা দূষণ ও শিশুশ্রমের মতো সংকটগুলো লাখ লাখ শিশুকে তাদের মেধা ও সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ওপর সীসার প্রভাব বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর এবং এই ক্ষতি চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়। তাই স্পষ্ট আইন এবং বিশেষ করে বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

সীসা দূষণ প্রতিরোধে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে ‘পিওর আর্থ’। সংস্থাটির বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাশ ঢাকা পোস্টকে বলেন, সীসা দূষণ মাটি, পানি ও বায়ুকে মারাত্মকভাবে বিষাক্ত করছে। উচ্চমাত্রার সীসা মানুষের, বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক বিকাশ, আচরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব রোধ করতে ‘পিওর আর্থ বাংলাদেশ’ সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

  • সর্বশেষ